হো চি মিন: ভিয়েতনামের আলোর বাহক

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ১৭: ২২
বাবুর্চি, ফটো এডিটিং, শিক্ষকতা থেকে দেশের স্বাধীনতার নায়ক—এক জীবনে সবই করেছেন হো চি মিন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

বাবুর্চি, ফটো এডিটিং, শিক্ষকতা থেকে দেশের স্বাধীনতার নায়ক—এক জীবনে সবই করেছেন হো চি মিন। ছোটবেলা থেকেই পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত হতে ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীব্যাপী। বৈচিত্র্যময় এক জীবন কাটানো এই বিপ্লবী নেতার জন্মদিন ১৯ মে।

হো চি মিন উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং মার্কিন সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক বিশ্বপ্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় টানা তিন যুগ তিনি ভিয়েতনামের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্যই তিনি ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের কাছে ‘আঙ্কেল হো’ নামে পরিচিত। আজকের ভিয়েতনামকে বুঝতে হলে, এমনকি আধুনিক বিশ্বের ছোট রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরোধ রাজনীতিকে বুঝতে গেলেও তাঁকে মনে করতে হয়।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

১৮৯০ সালের ১৯ মে, মধ্য ভিয়েতনামের নগে আন প্রদেশে তাঁর জন্ম হয়। এই প্রদেশটি তখন ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। তাঁর জন্মনাম ছিল নগুয়েন সিন কুং। পরে তিনি ‘হো চি মিন’ নাম গ্রহণ করেন। এর অর্থ ‘আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি’। তাঁর বাবা ছিলেন কনফুসীয় পণ্ডিত ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচক। ছোটবেলা থেকেই হো চি মিন দেখেছেন কীভাবে ফরাসি উপনিবেশবাদ ভিয়েতনামের মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিদেশযাত্রা ও রাজনৈতিক জীবন

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় দেশের বাইরে। জন্মের পর থেকেই পরাধীন থাকায় মুক্তির স্বাদ পেতে তিনি বেরিয়ে পরেন। ২১ বছর বয়সেই তিনি জাহাজের রান্নাঘরের সহকারী হিসেবে কাজ নেন। সেই জাহাজেই তিনি ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন বন্দর ঘুরেছেন। প্যারিসে অবস্থানকালে তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এসময় প্রথম তিনি বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভেতর উপনিবেশিত জনগণের প্রশ্নকে সামনে আনতে শুরু করেন। ১৯১৯ সালে ভার্সাই শান্তি সম্মেলনে তিনি ফরাসি শাসনের অধীনে থাকা ভিয়েতনামের মানুষের অধিকার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেন। এটি তেমন গুরুত্ব না পেলেও এই ঘটনাই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিপ্লবী সংগঠন গঠন ও নেতৃত্বের উত্থান

এরপর রুশ বিপ্লব ও ভ্লাদিমির লেনিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন তিনি। ১৯২০-এর দশকে হো চি মিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বুঝতে পারেন, শুধু বক্তৃতা নয়—সংগঠিত আন্দোলনই ভিয়েতনামের স্বাধীনতার পথ খুলতে পারে। ১৯২৪ সালে তিনি চীনের ক্যান্টনে গিয়ে ভিয়েতনামি তরুণ বিপ্লবীদের সংগঠিত করেন। পরে এই আন্দোলন থেকেই গড়ে ওঠে ‘ভিয়েত মিন'। ক্রমে এই ভিয়েতমিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল শক্তি হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ভিয়েতনাম দখল করলে হো চি মিন গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। একই সঙ্গে তিনি ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেও লড়াই চালান। তাঁর নেতৃত্বে ভিয়েত মিন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে পরিণত হয়।

স্বাধীন ভিয়েতনাম ঘোষণা

যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে হো চি মিন স্বাধীন ভিয়েতনাম রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মজার বিষয় হলো, সেই ঘোষণাপত্রে তিনি আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভাষাও উদ্ধৃত করেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামকে সমর্থন করবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে যায়। ফ্রান্স পুনরায় ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে যুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৫৪ সালে ‘দিয়েন বিয়েন ফু’ যুদ্ধে ফরাসিরা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধ শুধু ভিয়েতনামের নয়, পুরো উপনিবেশিক বিশ্বের ইতিহাস বদলে দেয়। একটি এশীয় কৃষিভিত্তিক দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিকে সামরিকভাবে হারিয়েছে—এটি তখন বিশ্বের বহু স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

ফরাসিদের পর ভিয়েতনামের রাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তরে হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন সরকার, আর দক্ষিণে মার্কিন-সমর্থিত শাসনব্যবস্থা।

এরপর শুরু হয় ভয়াবহ ভিয়েতনাম যুদ্ধ। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কং। আধুনিক অস্ত্র, বিমান হামলা ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরও যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি।

এই যুদ্ধেই হো চি মিন বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্র তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। আধুনিক বোমারু বিমান, রাসায়নিক অস্ত্র, বিপুল সেনা—সবই ব্যবহার করা হয়েছিল। তবু উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কং গেরিলারা হার মানেনি। শেষে পিছু হটতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী।

হো চি মিন নিজে যুদ্ধের পুরো সমাপ্তি দেখে যেতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ছয় বছরের মধ্যেই, ১৯৭৫ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে দেশটির বৃহত্তম এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রাক্তন রাজধানী ‘সাইগন’-এর নাম পরিবর্তন করে 'হো চি মিন সিটি' রাখা হয়।

হো চি মিনকে নিয়ে অনেক মজার তথ্যও রয়েছে। তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও প্রাসাদে না থেকে কাঠের ছোট বাড়িতে থাকতেন। সাধারণ পোশাক পরতেন, নিজে গাছ লাগাতেন, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। ভিয়েতনামে এখনো তাঁকে ‘আঙ্কেল হো’ নামে ডাকা হয়। তাঁর কারাগারে থাকাকালীন লেখা কবিতাগুলো এখনো বেশ জনপ্রিয়।

তাঁকে নিয়ে সমালোচনাও অবশ্য আছে। তাঁর শাসনব্যবস্থাকে অনেকে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী বলে মনে করেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু এসব বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—হো চি মিন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী উপনিবেশবিরোধী নেতা।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: যেখানে আজও প্রাসঙ্গিক হো চি মিন

বিশ্লেষকেরা প্রায়ই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কিছু মিল খুঁজে পান। দুই ক্ষেত্রেই একটি বড় সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে এমন রাষ্ট্র, যারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।

ভিয়েতনামের মতোই ইরানও দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকির মুখে রয়েছে। আবার দুই ক্ষেত্রেই ‘অসম যুদ্ধের’ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও একটি দেশ প্রতিরোধ গড়ে তোলে রাজনৈতিক আদর্শ, জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে।

অবশ্য এই দুই পরিস্থিতি পুরোপুরি এক নয়। ভিয়েতনাম ছিল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র, আর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখনো কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সীমিত সামরিক মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবু ইতিহাসবিদরা বলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে শিখিয়েছিল যে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

বর্তমানের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে হো চি মিনের জীবন আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যে ছোট রাষ্ট্রের ইতিহাসও বিশ্বরাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। এজন্য আজও তিনি ভিয়েতনামের স্বাধীনতার জনক এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী উপনিবেশবিরোধী নেতা হিসেবে স্মরণীয়।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত