এখন তরমুজের মৌসুম। বাজার থেকে রাস্তাঘাট—সব জায়গায় শুধু তরমুজ আর তরমুজ। কিন্তু এই রসালো ফলটি ঠিক কোথা থেকে প্রথম আমাদের পাতে এল? এ নিয়ে খোদ বিজ্ঞানী মহলেই রয়েছে নানা বিতর্ক। তরমুজের জন্মভূমি কি নীল নদের তীরে, নাকি পশ্চিম আফ্রিকার দুর্গম প্রান্তরে?
অনেক বিজ্ঞানীর মতে, পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরালিওন অঞ্চলই হলো তরমুজের আদি নিবাস। নাইজেরিয়া, সেনেগাল বা আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলোও এই দাবিতে পিছিয়ে নেই। তাদের দাবি, ওই অঞ্চলের তরমুজের স্বাদ ও গুণমান পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
তবে এই দাবিতে বাগড়া দিয়েছেন ইসরায়েলি গবেষক হ্যারি প্যারিস। তিনি প্রাচীন মিসরের কৃষিকাজ ও শিল্পকলা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, সেখানে তরমুজের ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো। তুতেনখামেনের সমাধির গায়েও তরমুজের চিত্র খোদাই করা ছিল, যা প্রমাণ করে যে ফারাওদের যুগেও এটি বেশ জনপ্রিয় ছিল।
নানা জাতের তরমুজ। ছবি: সংগৃহীতআবার প্যালিওবোটানিস্ট বা উদ্ভিদ-প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া বা বতসোয়ানার মরু অঞ্চলে পাওয়া বুনো ‘সিট্রুলাস’ প্রজাতিই আজকের আধুনিক তরমুজের পূর্বপুরুষ। সেখানে আজও বুনো তরমুজের তিক্ত ও মিষ্টি—দুই ধরণের রূপই দেখা যায়। জেনেটিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিলে দক্ষিণ আফ্রিকাকেই তরমুজের সূতিকাগার বলা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
তরমুজের বৈচিত্র্য: লাল ছাড়িয়ে হলুদ
আমরা সাধারণত বাইরে সবুজ ডোরাকাটা আর ভেতরে টকটকে লাল তরমুজ দেখে অভ্যস্ত। তবে গত কয়েক বছরে বাজারে আসছে বৈচিত্র্যময় সব তরমুজ। এখন এমন তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে যা বাইরে হলুদ কিন্তু ভেতরে লাল। আবার তাইওয়ানের ‘আনমল’ নামের এক জাতের তরমুজ বাইরে সবুজ হলেও ভেতরে কুচকুচে হলুদ রঙের হয়।
এর পাশাপাশি ভারতের ‘৭০৭’ নামের এক কালো রঙের তরমুজ এবং ‘সাগর কিং’ জাতটিও ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাইওয়ানের ‘বিসুলা’ জাতের তরমুজের বিশেষত্ব হলো এর পাতলা খোসা। তরমুজের এই রঙিন জগত কেবল রঙেই নয়, স্বাদেও এনেছে ভিন্নতা।
হলুদ তরমুজ। ছবি: সংগৃহীতবাংলাদেশে একটা সময় তরমুজ মানেই ছিল এপ্রিল-মে মাসের ফল। কিন্তু এখন ছবিটা বদলে গেছে। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো জেলাগুলোতে শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তরমুজ চাষে ঝুঁকেছেন। শুধু দক্ষিণ অঞ্চল (খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল) নয়, চরাঞ্চলেও এখন তরমুজের বাম্পার ফলন হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সঠিকভাবে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টন তরমুজ পাওয়া সম্ভব। বাজারে এখন ‘ব্ল্যাক বেবি’, ‘ব্ল্যাক প্রিন্স’ বা ‘জেসমিন’—এমন সব জাত এসেছে যা বছরের যেকোনো সময় চাষ করা যায়। ফলে বারোমাসি তরমুজ এখন আর স্বপ্ন নয়।
সরকারি পোর্টাল ‘কৃষি বাতায়ন’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে টপইল্ড, গ্লোরি, সুগার বেবি, ভিক্টর সুপার এফওয়ান এবং গ্রিন ড্রাগনের মতো হাইব্রিড জাতগুলোর জয়জয়কার। এছাড়া সুপার এম্পেরর, ট্রপিক্যাল ড্রাগন, আনারকলি ও ব্ল্যাক ডায়মন্ডের নামও এখন চাষিদের মুখে মুখে।
আফ্রিকার ধুলোমাখা প্রান্তর থেকে নীল নদের তীর হয়ে তরমুজ আজ পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের চরাঞ্চলে। যে ফলটি একসময় তৃষ্ণা মেটানোর বুনো উৎস ছিল, তা আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থকরী ফসল।
তথ্যসূত্র: সিলভিয়া লাভগ্রেনের ‘মেলোন: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি’, নেচার স্টাডি সোসাইটি, বিবিসি বাংলা ও কৃষি বাতায়ন