গ্রীষ্ম এসেছে কি না, তা টের পাওয়া যায়—রোদের তীব্রতা, শুষ্ক বাতাস বা ঘেমে নেয়ে ওঠা দেখে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের ছোট্ট শহর করডেলে গ্রীষ্মকে চেনার আলাদা এক উপায় আছে। সেখানে গরম মানেই রসালো মিষ্টি সব তরমুজ। যেন গরমকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণে, আটলান্টা শহর থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে অবস্থিত এই কর্ডেল। জনসংখ্যা খুব বেশি নয়—দশ হাজারেরও কম। কিন্তু এই ছোট শহরের চারপাশে যতদূর চোখ যায়, বিস্তৃত তরমুজের ক্ষেত। হাজার হাজার একর জমিতে চাষ হয় এই ফল, আর বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড তরমুজ উৎপাদন করে ক্রিস্প কাউন্টি। এমন একটি ছোট শহরের জন্য সংখ্যাটা শুধু বড়ই নয়, এক অর্থে অবিশ্বাস্য।
তবে করডেলের দাবি, শুধু উৎপাদনের পরিমাণে নয়, গুণগত মানেও তারা সেরা। এখানকার বালুময় মাটি আর দীর্ঘ, রৌদ্রোজ্জ্বল গ্রীষ্ম তরমুজকে দেয় এক আলাদা স্বাদ—আরও মিষ্টি ও রসালো।
এই তরমুজই করডেলের অর্থনীতির প্রাণ। শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার—সবকিছুতেই এর প্রভাব স্পষ্ট। এমনকি স্থানীয় ফাস্টফুড দোকানেও তরমুজের তৈরি বিশেষ পানীয় পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তরমুজ এই শহরের নিজস্ব পরিচয়।
এই পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘ওয়াটারমেলন ডেজ ফেস্টিভ্যালে’। ১৯৪৯ সাল থেকে চলে আসা এই উৎসব জর্জিয়ার প্রাচীনতম উৎসবগুলোর একটি। উৎসব মানেই প্যারেড, গান, নাচ, প্রতিযোগিতা। তরমুজ খাওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে মুখ থেকে বীজ ফেলার খেলাও। প্রতি বছর ‘ওয়াটারমেলন কুইন’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই আয়োজন পায় এক বিশেষ মাত্রা।
নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই শিল্পকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, উত্তরাধিকার হিসেবে দেখছে। ছবি: সংগৃহীতসেখানে তরমুজের এই প্রভাব এতটাই গভীর যে, তা টেলিভিশনের পর্দাতেও জায়গা করে নিয়েছে। কৃষি ও খাদ্যভিত্তিক জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান কর্ডেলকে নিয়ে আলাদা পর্ব তৈরি করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে তরমুজ চাষের বাস্তব চিত্র।
তবে দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, তরমুজ চাষ ততটা সহজ নয়। কৃষকদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। লতাপাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা তরমুজ খুঁজে বের করাও অনেকটা গুপ্তধন খোঁজার মতো। একেকটি গাছে একাধিক তরমুজ হয়, কিন্তু সব একসঙ্গে পাকে না। ফলে পুরো গ্রীষ্মজুড়ে ধাপে ধাপে ফসল তোলা হয়। জুন থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তরমুজ তোলা হয়, আর এর সবচেয়ে ভালো সময় জুলাই-আগস্ট।
এই কঠোর পরিশ্রমের পেছনে আছে মানুষের গল্পও। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই শিল্পকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, উত্তরাধিকার হিসেবে দেখছে। তাদের কাছে তরমুজ মানে শুধু জীবিকা নয়, ভালোবাসা।
কর্ডেলের আরও কিছু আকর্ষণ আছে—হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধের স্মৃতি বহন করা জাদুঘর, কিংবা কাছের লেকের শান্ত পরিবেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছুই গিয়ে মেলে এক জায়গায়—তরমুজে।
একসময় হোপ, হ্যামস্টেডের মতো অন্য শহরও ‘তরমুজের বিশ্ব রাজধানী’ হওয়ার দাবি তুলেছিল। কিন্তু করডেলের মানুষদের দাবি, স্বাদ আর গুণে তাদের তরমুজই সবার সেরা। তাই কর্ডেল আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে ‘তরমুজের রাজধানী’ হিসেবে।
কর্ডেলের গল্প শুধু একটি শহরের গল্প নয়। এটি দেখায়, কীভাবে একটি সাধারণ ফল একটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর পরিচয়কে গড়ে তুলতে পারে। আর গরমের দিনে যখন ঠান্ডা, মিষ্টি তরমুজের এক টুকরো মুখে দেওয়া হয়, তখন সেই স্বাদের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এই শহরের দীর্ঘ ইতিহাস, মাটির কাছাকাছি থাকা গল্প।
(টেস্টিং টেবিল ও হয়্যার দ্য ফুড কাম ফ্রম অবলম্বনে লিখেছেন মাহজাবিন নাফিসা)