ইরানের ভাইরাল ‘ট্রল ডিপ্লোম্যাসি’: ফুলের টবের নিচে হরমুজের চাবি

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের দামামা এখন কিছুটা শান্ত। যুদ্ধবিরতি হয়েছে। কিন্তু লড়াই সত্যিই থেমেছে? মাঠের লড়াই থামলেও কিছুদিন আগে শুরু হওয়া এক নতুন ধরণের যুদ্ধ এখনো সমানতালে চলছে কম্পিউটারের কি-বোর্ড আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। একে বলা হচ্ছে ‘ট্রল ডিপ্লোম্যাসি’ বা বিদ্রূপাত্মক কূটনীতি। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইরানের দূতাবাসগুলো গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ‘ডিজিটাল রোস্ট’ শুরু করেছে, তা নিয়ে ইন্টারনেটে রীতিমতো হাসির রোল পড়ে গেছে।

আচরণে ভাষায় সভ্যতার সব সীমা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে লাগাতার হুমকি দেওয়া আর অভব্য কথাবার্তায় তিনি যখন বেপরোয়া, তখনই শুরু হয় ইরানের ‘ডিজিটাল রোস্টিং’। ট্রাম্পের গালিগালাজ আর আগ্রাসী হুমকির মুখে ইরান পিছু হটা তো দূরের কথা, বরং কথার জবাব দিচ্ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল দিয়েও।

‘ট্রাম্প, দয়া করে কথা বলুন… আমরা তো বোর হয়ে যাচ্ছি।’ সংগৃহীত ছবি
‘ট্রাম্প, দয়া করে কথা বলুন… আমরা তো বোর হয়ে যাচ্ছি।’ সংগৃহীত ছবি

ট্রাম্প যখন ইরানের সভ্যতাকে এক রাতের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, ইরানের জনগন তখন নিজ দেশের পতাকা নিয়ে ভীড় করেছে সম্ভাব্য আক্রমণস্থলে—সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি শোধনাগারে। সেই ভয়হীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইরানিদের বিদ্রুপ। এই বিদ্রুপের ঝড়ে যুক্ত হয়েছে শুধু ব্যক্তি নাগরিক নয়, খোদ বিভিন্ন দেশে থাকা ইরানের দূতাবাসগুলোও।

‘চাবি হারিয়ে ফেলেছি’ থেকে ‘চাবি খুঁজে পেয়েছি’

গত ৫ এপ্রিল ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে জিম্বাবুয়েতে থাকা ইরানের দূতাবাস এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছিল, ‘ট্রাম্প, দয়া করে কথা বলুন… আমরা তো বোর হয়ে যাচ্ছি।’ এই পোস্টটি দ্রুতই ভাইরাল হয়।

তবে সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছে ‘হরমুজ প্রণালী’ নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র খুব স্পষ্ট ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেছিল, এই পথ যেন কোনোভাবেই বন্ধ না করা হয়।

জিম্বাবুয়েতে থাকা ইরানি দূতাবাস গত ৬ এপ্রিল এক্সে মজা করে তখন লেখে, ‘আমরা চাবি হারিয়ে ফেলেছি!’ অর্থাৎ, তারা সেই গেটের চাবিই খুঁজে পাচ্ছে না!

এই রসিকতায় যোগ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার ইরানি দূতাবাসও। তারা যেন এক বাড়ির দুই সদস্যের মতো খুনসুটি শুরু করল। জিম্বাবুয়ের পোস্টের নিচে তারা রিপ্লাই দিল, ‘আরে, চাবিটা তো ওই যে ফুলের টবের নিচে রাখা ছিল, অলস কোথাকার! এবার চটপট খুলে দাও।’

এরপর বুলগেরিয়ার ইরানি দূতাবাস এতে টিপ্পনী কেটে বলে, ‘বন্ধুদের জন্য দরজা সবসময় খোলাই আছে, তবে এপস্টাইনের বন্ধুদের চাবি লাগবে।’

এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধবিরতির পর আজ ৮ এপ্রিল জিম্বাবুয়েতে থাকা ইরানি দূতাবাস এক্সে লিখেছে, ‘আমরা চাবি খুঁজে পেয়েছি।’ দক্ষিণ আফ্রিকার ইরানি দূতাবাসও যথারীতি গত ৬ তারিখের মতোই সেই পোস্ট শেয়ার দিয়ে লিখেছে, ‘আমি বলেছিলাম, চাবিটা ফুলের টবের নিচে রাখা ছিল, অলস কোথাকার।’

‘পাগলের হাতে তলোয়ার দেওয়া বিপদজনক’

ইরানি দূতাবাসগুলোর প্রচারণার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের বয়স এবং তাঁর মানসিক অবস্থা নিয়ে বিদ্রুপ। দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস থেকে আমেরিকান কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেওয়া হয় যেন তারা সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী (প্রেসিডেন্টকে সরানোর নিয়ম) নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন।

তারা ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের একটি পোস্ট শেয়ার করে বলেন, ‘মানবতার জানা উচিত আমেরিকান জনগণকে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে।’

লন্ডনে থাকা ইরানি দূতাবাস আবার একটু সাহিত্যিক ঢঙে আক্রমণ করেছে। তারা রুমির কবিতা ব্যবহার করে বলেছে, ‘পাগলের হাতে তলোয়ার দেওয়া বিপদজনক’। সঙ্গে লেখক মার্ক টোয়েনের বিখ্যাত উক্তি যোগ করে দিয়েছে, ‘মুখ বন্ধ রেখে লোকে আপনাকে বোকা ভাবলে সেটা মেনে নেওয়া ভালো, কিন্তু মুখ খুলে নিজের বোকামির সবটুকু সন্দেহ দূর করে দেওয়া একদমই উচিত নয়।’

চীনের ‘বিড়াল ও ইগল’ যুদ্ধ

ইরানের এই ডিজিটাল লড়াইয়ে চীন সমর্থন দিয়েছে। চীনের সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অ্যানিমেশন ভিডিও প্রকাশ করেছিল। ভিডিওটি ইন্টারনেটে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

ভিডিওটিতে রূপক হিসেবে ‘পার্সিয়ান বিড়াল’ (ইরান) এবং ‘সাদা ইগল’ (আমেরিকা)-এর লড়াই দেখানো হয়েছে। গল্পের পটভূমি ‘গোল্ডেন ফ্লো ভ্যালি’ বা স্বর্ণালি উপত্যকা। এটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলের প্রতীক। এখানে ইগলকে অহংকারী ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যে জোর করে নিজের তৈরি ‘সোনালি টিকিট’ বা ডলারের বিনিময়ে মূল্যবান ‘কালো নির্যাস’ বা তেল দখল করতে চায়।

একপর্যায়ে ইগল বিড়ালদের নেতাকে হত্যা করলে শুরু হয় অসম যুদ্ধ। ভিডিওতে দেখা যায়, ইগলটি বিড়ালদের মারতে অত্যন্ত দামি ‘সোনালি সুঁই’ বা মিসাইল খরচ করছে। আর বিড়ালরা খুব সস্তা ‘কাঠের পাখি’ বা ড্রোন দিয়ে ইগলকে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।

এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতে ইরানের সস্তা ড্রোন প্রযুক্তির জয়কে ইঙ্গিত করে। বেইজিং এই ভিডিওতে জনপ্রিয় মার্শাল আর্ট বা ‘উশিয়া’ ঘরানার সাহায্য নিয়েছে এবং শেষে বার্তা দিয়েছে যে আসল বীরত্ব অস্ত্র চালনায় নয় বরং সহিংসতা থামানোতে।

ছোট্ট শিশুর আবদারে ইসরাইলে গোলাপি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান

গত সোমবার (৬ এপ্রিল) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি একটি গোলাপি রঙের মিসাইলের ছবি প্রকাশ করে। মিসাইলটির গায়ে ফারসি ভাষায় লেখা ছিল, ‘ছোট বিপ্লবী মেয়ের অনুরোধের জবাবে।’

এই ঘটনার সূত্র একটি ভাইরাল ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, এক ছোট ইরানি মেয়ে আবেগভরে অনুরোধ করছে, ইসরায়েলের দিকে যেন একটি ‘গোলাপি মিসাইল’ ছোড়া হয়। ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপর আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট চ্যানেল ও আইআরআইবি প্রতীকীভাবে সেই অনুরোধের ‘জবাব’ দেয় এই গোলাপি মিসাইলের ছবি প্রকাশ করে।

সম্পর্কিত