লেখা:

ইরানের আবছায়া হলঘরগুলোতে শত শত মানুষ কালো পোশাক পরে সমস্বরে বুক চাপড়াচ্ছেন। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ধর্মীয় শোকগাথা। সেই গাথায় উঠে আসছে আত্মত্যাগ, শাহাদাত এবং যুদ্ধের সুর। লাল আলোয় ঘেরা এই শোকের দৃশ্যগুলো এখন ইরানের ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব পরিচিত। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে এই আবহাওয়া যেন ইরানের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই শোকগাথাগুলোকে বলা হয় ‘লাতমিয়া’। এর শিকড় ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগ।
সম্প্রতি মেহেদি রাসুলি, হোসেইন তাহেরি, সাইয়েদ রেজা নারিমানি ও হোসেইন সুতুদের মতো ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় গায়করা নতুন নতুন যুদ্ধের গান বা শোকগাথা প্রকাশ করেছেন। এই গানগুলোতে ইরানবিরোধী যুদ্ধকে কারবালার সেই চিরন্তন সংঘাতের প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সরকার সমর্থক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এই পারফরম্যান্সগুলোকে বেশ প্রশংসার চোখে দেখছেন। আর সমালোচকদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ধর্মীয় শোকের সঙ্গে রাজনৈতিক সংহতিকে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে।
দিন দিন এই শোকগাথাগুলোতে ইসলামের সুরক্ষার সঙ্গে পারস্যের জাতীয়তাবাদী সুরও জোরালো হচ্ছে। এখন যুদ্ধকে ধর্মের লড়াইয়ের পাশাপাশি ‘ইরান’-এর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই নতুন বয়ান ঘিরেই তৈরি হচ্ছে এক প্রশ্ন: ইরানের এই যুদ্ধকালীন শোকের ভাষার ভিত্তি কী? কারবালার প্রতীক, জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরোধের সংজ্ঞাকে নতুন করে নির্ধারণ করার ক্ষমতা আসলে কার?
প্রতিবছর কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে ইরানসহ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিয়া মুসলমান পালন করেন পবিত্র আশুরা। শোকগাথা, কবিতা পাঠ এবং ইরাকের কারবালায় তীর্থযাত্রার মধ্য দিয়ে এই দিনটি পালিত হয়। ইয়াজিদের কাছে আনুগত্য স্বীকার না করে ইমাম হোসেনের (রা.) বীরোচিত মৃত্যুবরণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি অমর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিরোধের গল্পটি সময়ের সঙ্গে ইরানের সামাজিক জীবনের গভীরে মিশে গেছে। ১৬শ শতাব্দীতে সাফাভী রাজবংশ শিয়া ইসলামকে ইরানের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকেই আশুরার আচার-অনুষ্ঠান দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে এমন এক কাঠামো যা বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর্যায় পার হয়ে বার বার ইরানের রাজনীতিকে নতুন রূপ দিয়েছে।
ইতিহাসের নানা সন্ধিক্ষণে এই শোকের আচার ইরানের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বিদেশি তামাক ব্যবসার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা তামাক বিরোধী আন্দোলনে (১৮৯১-৯২) আলেম ও ধর্মপ্রচারকরা মসজিদ ও বাজারের শোকসভাগুলোকে কাজে লাগিয়ে মির্জা হাসান শিরাযীর ফতোয়া প্রচার করেছিলেন।
সাংবিধানিক বিপ্লব (১৯০৫-১১)-এর সময়ে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রচারণায় আশুরার প্রতীকগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় মানুষের কণ্ঠে ছিল, ‘আমাদের আন্দোলন হোসেনী, আমাদের নেতা খোমেনি।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে তারা বিপ্লবের সংগ্রামের সাথে ইমাম হোসেনের (রা.) আত্মত্যাগের একটি সরাসরি মিল খুঁজে পেয়েছিল।
এই ঘটনাগুলোতে দেখা যায় শোকের আচারগুলো কেবল ধর্মীয় স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখেনি। বরং তা ধর্মপ্রচারক ও শোকগাথা গায়কদের মাধ্যমে এক গভীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করেছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রভাব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘কারবালা’ হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দানে জনমত তৈরির প্রধান ভাষা। এই প্রক্রিয়াটিই বর্তমান সময়ে ধর্মীয় সঙ্গীতশিল্পী বা ‘মাদাহ’দের সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের যুদ্ধকালীন জনমত বা সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টায় এই ধর্মীয় আচার ও কাঠামোর ভূমিকা এখনো কেন্দ্রীয়। ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে সরকার সমর্থিত শোকগাথা গায়ক বা ‘মাদাহ’রা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে কারবালার যুদ্ধেরই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে তুলে ধরছেন। তারা এই শোকের আবহের মাধ্যমে দেশের ভেতরের বর্তমান সংঘাতগুলোকে ত্যাগ করে প্রতিরোধকে আলিঙ্গন করতে বলছেন।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত এমনই একটি শোকগাথায়, গায়ক সুতুদে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন ‘পতাকাবাহী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এখানে টেনে এনেছেন কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের ভাই আব্বাস ইবনে আলীর স্মৃতিকে। তিনি কারবালায় পতাকাবহনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই ধরনের উপমা ইরানের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিফলন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর দুই সপ্তাহ আগে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ইমাম হোসেন যেমন ইয়াজিদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন, ঠিক তেমনি ইরান কখনোই ‘আমেরিকার ক্ষমতায় থাকা দুর্নীতিবাজদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করবে না।‘
বর্তমান যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের জুন মাসের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জনগণের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে অধিকাংশ ইরানিই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, প্রায় প্রতি রাতেই সরকার সমর্থিত র্যালিগুলোতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটছে। সেখানে শোকগাথা গায়করা পারফর্ম করে থাকেন।
আশুরার প্রতীকগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা একচেটিয়া নয়। ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়ে আলী খামেনিকে ইয়াজিদের সাথে তুলনা করেছিলেন। ২০২৩ সালের আশুরার সময় ইরানের বিভিন্ন শহরে শোকগাথা গায়করা একই কারবালার উপমা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন।
আশুরা আজও রাজনৈতিক বৈধতা জোগাতে পারে। তবে তা শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়।
২০২৫ সালের জুন মাসে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে, রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় গায়করা তাদের শোকগাথায় পারস্যের জাতীয়তাবাদী প্রতীকগুলোকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করছেন।
যুদ্ধের পরপরই আশুরার এক স্মরণসভায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বিশিষ্ট ধর্মীয় শোকগাথা গায়ক মাহমুদ কারিমিকে দেশাত্মবোধক গান ‘এ ইরান’ (ওহ ইরান)-এর একটি নতুন সংস্করণ গাওয়ার অনুরোধ জানান। কারিমি গানটির বেশ কয়েকটি চরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাতে ধর্মীয় বিষয়বস্তু যোগ করে ইরানকেই ‘কারবালার ভূমি’ হিসেবে নতুন রূপ দেন। এমনি করে ইরানের জাতীয় স্মৃতি কারবালার ভাষায় এক হয়ে যায়।
মাদাহ হোসেইন তাহেরির গাওয়া একটি শোকগাথায় ‘শাহনামা’-এর চিত্রকল্প ফুটে ওঠে। দশম শতাব্দীর কবি ফেরদৌসির লেখা এই মহাকাব্যটি মূলত প্রাচীন পারস্যের বীর ও পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে রচিত। তাহেরি তার শোকগাথায় শিয়া শোকের সঙ্গে পারস্যের এই মহাকাব্যের ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটান। সেই গানে তিনি ঘোষণা করেন, ইমাম হোসেন তার লড়াইয়ে ‘একা নন’, কারণ যারা সেখানে উপস্থিত আছেন তারা সবাই ‘রস্তম’-এর বংশধর। উল্লেখ্য, রস্তম ‘শাহনামা’-এর এক কিংবদন্তি বীর।
তবে সমালোচকদের মতে, ইরানি শাসকরা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা আরও সুদৃঢ় করতে এই পুরনো পারস্যের প্রতীকগুলোকে নতুন করে ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান প্রচণ্ডভাবে কমে যায়। জানুয়ারি মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একই ধরনের প্রতীকের ব্যবহার করা হয়েছে। বিক্ষোভের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানিরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘খামেনি যাহহাক, আমরা তোমাদের মাটির নিচে পুঁতে ফেলব।‘ এখানে তারা খামেনিকে ‘শাহনামা’-এর সেই পৌরাণিক অত্যাচারী চরিত্র ‘যাহহাক’-এর সাথে তুলনা করেছেন।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, জাতীয় প্রতীকের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে এক তীব্র লড়াই চলছে। সরকার নিজের বৈধতা প্রমাণে এগুলো ব্যবহার করছে। বিরোধী পক্ষও একইভাবে সেই একই প্রতীক ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।
ইরান দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় আদর্শকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেছিলেন: ‘ইসলামের জন্য লড়াই না করে আপনি ইরানকে রক্ষা করতে পারবেন না। আবার ইরানের পতাকা উড্ডীন না করে ইসলামের সীমানাও রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
গত বছর আশুরার অনুষ্ঠানে অনেক শোক পালনকারীর হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা দেখা গেছে। বোঝা যায় যে এই ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর আশুরা উপলক্ষে কয়েক হাজার বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শোকানুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। এই রীতিগুলো ইরানি সমাজের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে।
এই সামাজিক গভীরতাই ব্যাখ্যা করে, কেন যুদ্ধ বা সংকটের মুহূর্তে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য কারবালা একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তবে যুদ্ধকালীন জনমত গঠন আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বৈধতা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্র চাইলেই আশুরাকে ব্যবহার করতে পারে। একে নিজের মতো করে সাজাতে পারে। এমনকি জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে একে মিলিয়ে দিতে পারে। তবে এই বয়ানগুলো জনগণ কীভাবে গ্রহণ করছে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে নেই। এগুলোর কার্যকারিতা কেবল তেহরানের প্রচারণার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যেখানে দাঁড়িয়ে ইরানিরা এসব কথা শোনে।
(মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ)

ইরানের আবছায়া হলঘরগুলোতে শত শত মানুষ কালো পোশাক পরে সমস্বরে বুক চাপড়াচ্ছেন। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ধর্মীয় শোকগাথা। সেই গাথায় উঠে আসছে আত্মত্যাগ, শাহাদাত এবং যুদ্ধের সুর। লাল আলোয় ঘেরা এই শোকের দৃশ্যগুলো এখন ইরানের ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব পরিচিত। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে এই আবহাওয়া যেন ইরানের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই শোকগাথাগুলোকে বলা হয় ‘লাতমিয়া’। এর শিকড় ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগ।
সম্প্রতি মেহেদি রাসুলি, হোসেইন তাহেরি, সাইয়েদ রেজা নারিমানি ও হোসেইন সুতুদের মতো ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় গায়করা নতুন নতুন যুদ্ধের গান বা শোকগাথা প্রকাশ করেছেন। এই গানগুলোতে ইরানবিরোধী যুদ্ধকে কারবালার সেই চিরন্তন সংঘাতের প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সরকার সমর্থক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এই পারফরম্যান্সগুলোকে বেশ প্রশংসার চোখে দেখছেন। আর সমালোচকদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ধর্মীয় শোকের সঙ্গে রাজনৈতিক সংহতিকে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে।
দিন দিন এই শোকগাথাগুলোতে ইসলামের সুরক্ষার সঙ্গে পারস্যের জাতীয়তাবাদী সুরও জোরালো হচ্ছে। এখন যুদ্ধকে ধর্মের লড়াইয়ের পাশাপাশি ‘ইরান’-এর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই নতুন বয়ান ঘিরেই তৈরি হচ্ছে এক প্রশ্ন: ইরানের এই যুদ্ধকালীন শোকের ভাষার ভিত্তি কী? কারবালার প্রতীক, জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরোধের সংজ্ঞাকে নতুন করে নির্ধারণ করার ক্ষমতা আসলে কার?
প্রতিবছর কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে ইরানসহ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিয়া মুসলমান পালন করেন পবিত্র আশুরা। শোকগাথা, কবিতা পাঠ এবং ইরাকের কারবালায় তীর্থযাত্রার মধ্য দিয়ে এই দিনটি পালিত হয়। ইয়াজিদের কাছে আনুগত্য স্বীকার না করে ইমাম হোসেনের (রা.) বীরোচিত মৃত্যুবরণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি অমর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিরোধের গল্পটি সময়ের সঙ্গে ইরানের সামাজিক জীবনের গভীরে মিশে গেছে। ১৬শ শতাব্দীতে সাফাভী রাজবংশ শিয়া ইসলামকে ইরানের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকেই আশুরার আচার-অনুষ্ঠান দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে এমন এক কাঠামো যা বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর্যায় পার হয়ে বার বার ইরানের রাজনীতিকে নতুন রূপ দিয়েছে।
ইতিহাসের নানা সন্ধিক্ষণে এই শোকের আচার ইরানের রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বিদেশি তামাক ব্যবসার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা তামাক বিরোধী আন্দোলনে (১৮৯১-৯২) আলেম ও ধর্মপ্রচারকরা মসজিদ ও বাজারের শোকসভাগুলোকে কাজে লাগিয়ে মির্জা হাসান শিরাযীর ফতোয়া প্রচার করেছিলেন।
সাংবিধানিক বিপ্লব (১৯০৫-১১)-এর সময়ে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রচারণায় আশুরার প্রতীকগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় মানুষের কণ্ঠে ছিল, ‘আমাদের আন্দোলন হোসেনী, আমাদের নেতা খোমেনি।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে তারা বিপ্লবের সংগ্রামের সাথে ইমাম হোসেনের (রা.) আত্মত্যাগের একটি সরাসরি মিল খুঁজে পেয়েছিল।
এই ঘটনাগুলোতে দেখা যায় শোকের আচারগুলো কেবল ধর্মীয় স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখেনি। বরং তা ধর্মপ্রচারক ও শোকগাথা গায়কদের মাধ্যমে এক গভীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করেছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রভাব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘কারবালা’ হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দানে জনমত তৈরির প্রধান ভাষা। এই প্রক্রিয়াটিই বর্তমান সময়ে ধর্মীয় সঙ্গীতশিল্পী বা ‘মাদাহ’দের সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের যুদ্ধকালীন জনমত বা সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টায় এই ধর্মীয় আচার ও কাঠামোর ভূমিকা এখনো কেন্দ্রীয়। ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে সরকার সমর্থিত শোকগাথা গায়ক বা ‘মাদাহ’রা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে কারবালার যুদ্ধেরই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে তুলে ধরছেন। তারা এই শোকের আবহের মাধ্যমে দেশের ভেতরের বর্তমান সংঘাতগুলোকে ত্যাগ করে প্রতিরোধকে আলিঙ্গন করতে বলছেন।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত এমনই একটি শোকগাথায়, গায়ক সুতুদে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন ‘পতাকাবাহী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এখানে টেনে এনেছেন কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের ভাই আব্বাস ইবনে আলীর স্মৃতিকে। তিনি কারবালায় পতাকাবহনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই ধরনের উপমা ইরানের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিফলন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর দুই সপ্তাহ আগে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ইমাম হোসেন যেমন ইয়াজিদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন, ঠিক তেমনি ইরান কখনোই ‘আমেরিকার ক্ষমতায় থাকা দুর্নীতিবাজদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করবে না।‘
বর্তমান যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের জুন মাসের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জনগণের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে অধিকাংশ ইরানিই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, প্রায় প্রতি রাতেই সরকার সমর্থিত র্যালিগুলোতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটছে। সেখানে শোকগাথা গায়করা পারফর্ম করে থাকেন।
আশুরার প্রতীকগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা একচেটিয়া নয়। ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়ে আলী খামেনিকে ইয়াজিদের সাথে তুলনা করেছিলেন। ২০২৩ সালের আশুরার সময় ইরানের বিভিন্ন শহরে শোকগাথা গায়করা একই কারবালার উপমা ব্যবহার করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন।
আশুরা আজও রাজনৈতিক বৈধতা জোগাতে পারে। তবে তা শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়।
২০২৫ সালের জুন মাসে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে, রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় গায়করা তাদের শোকগাথায় পারস্যের জাতীয়তাবাদী প্রতীকগুলোকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করছেন।
যুদ্ধের পরপরই আশুরার এক স্মরণসভায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বিশিষ্ট ধর্মীয় শোকগাথা গায়ক মাহমুদ কারিমিকে দেশাত্মবোধক গান ‘এ ইরান’ (ওহ ইরান)-এর একটি নতুন সংস্করণ গাওয়ার অনুরোধ জানান। কারিমি গানটির বেশ কয়েকটি চরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাতে ধর্মীয় বিষয়বস্তু যোগ করে ইরানকেই ‘কারবালার ভূমি’ হিসেবে নতুন রূপ দেন। এমনি করে ইরানের জাতীয় স্মৃতি কারবালার ভাষায় এক হয়ে যায়।
মাদাহ হোসেইন তাহেরির গাওয়া একটি শোকগাথায় ‘শাহনামা’-এর চিত্রকল্প ফুটে ওঠে। দশম শতাব্দীর কবি ফেরদৌসির লেখা এই মহাকাব্যটি মূলত প্রাচীন পারস্যের বীর ও পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে রচিত। তাহেরি তার শোকগাথায় শিয়া শোকের সঙ্গে পারস্যের এই মহাকাব্যের ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটান। সেই গানে তিনি ঘোষণা করেন, ইমাম হোসেন তার লড়াইয়ে ‘একা নন’, কারণ যারা সেখানে উপস্থিত আছেন তারা সবাই ‘রস্তম’-এর বংশধর। উল্লেখ্য, রস্তম ‘শাহনামা’-এর এক কিংবদন্তি বীর।
তবে সমালোচকদের মতে, ইরানি শাসকরা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা আরও সুদৃঢ় করতে এই পুরনো পারস্যের প্রতীকগুলোকে নতুন করে ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান প্রচণ্ডভাবে কমে যায়। জানুয়ারি মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একই ধরনের প্রতীকের ব্যবহার করা হয়েছে। বিক্ষোভের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানিরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘খামেনি যাহহাক, আমরা তোমাদের মাটির নিচে পুঁতে ফেলব।‘ এখানে তারা খামেনিকে ‘শাহনামা’-এর সেই পৌরাণিক অত্যাচারী চরিত্র ‘যাহহাক’-এর সাথে তুলনা করেছেন।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, জাতীয় প্রতীকের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে এক তীব্র লড়াই চলছে। সরকার নিজের বৈধতা প্রমাণে এগুলো ব্যবহার করছে। বিরোধী পক্ষও একইভাবে সেই একই প্রতীক ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।
ইরান দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় আদর্শকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেছিলেন: ‘ইসলামের জন্য লড়াই না করে আপনি ইরানকে রক্ষা করতে পারবেন না। আবার ইরানের পতাকা উড্ডীন না করে ইসলামের সীমানাও রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
গত বছর আশুরার অনুষ্ঠানে অনেক শোক পালনকারীর হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা দেখা গেছে। বোঝা যায় যে এই ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর আশুরা উপলক্ষে কয়েক হাজার বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শোকানুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। এই রীতিগুলো ইরানি সমাজের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে।
এই সামাজিক গভীরতাই ব্যাখ্যা করে, কেন যুদ্ধ বা সংকটের মুহূর্তে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য কারবালা একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তবে যুদ্ধকালীন জনমত গঠন আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বৈধতা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্র চাইলেই আশুরাকে ব্যবহার করতে পারে। একে নিজের মতো করে সাজাতে পারে। এমনকি জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে একে মিলিয়ে দিতে পারে। তবে এই বয়ানগুলো জনগণ কীভাবে গ্রহণ করছে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে নেই। এগুলোর কার্যকারিতা কেবল তেহরানের প্রচারণার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যেখানে দাঁড়িয়ে ইরানিরা এসব কথা শোনে।
(মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ)
.png)

ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চিন্তাবিদদের একজন ড. আলী শারিআতি। তিনি ছিলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী। ছিলেন এমন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি ধর্মকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।
২ ঘণ্টা আগে
১৯৮৮ সালের জুন মাস। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর তখন এক অকল্পনীয় উন্মাদনায় কাঁপছে। কারণ, সেখানে এসেছেন পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন। তাঁর ‘ব্যাড’ অ্যালবামের প্রচারের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল কনসার্টের। স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই। হাজার হাজার চোখ মঞ্চের দিকে। হঠাৎ আলো নিভে গিয়ে চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেল
১৭ ঘণ্টা আগে
১৯০৩ সালের ২৫ জুন ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের বাংলা প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী এরিক আর্থার ব্লেয়ার মহাকালে ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েল নামে বিশ্বখ্যাত। স্বৈরাচার ও একদলীয় মতবাদের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার জর্জ অরওয়েলের কাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বচ্ছ গদ্য, সামাজিক সমালোচনা, সর্বগ্রাসী সর্বাত্মকবাদ (কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যব
১৭ ঘণ্টা আগে
ব্যান্ডের কার্যক্রম সচল রাখতে এবং ভক্তদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে ‘ট্যুরিং ভোকাল’ হিসেবে ব্যান্ডে যুক্ত হয়েছেন বখতিয়ার হোসাইন। সম্প্রতি ব্যান্ডের সব সদস্য ফেসবুক লাইভে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিবর্তনের কথা জানান।
২ দিন আগে