ফাবিহা বিনতে হক

২০২১ সালে পাকিস্তানি নির্মাতা ও পরিচালক নাবিল কুরেশি খেল খেল মেঁ নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন। ওই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, পাকিস্তানের একটি ইউনিভার্সিটির ড্রামা ক্লাবের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রোডাকশন নিয়ে ঢাকায় একটি নাট্যোৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছে। তারা স্থির করে, এই অনুষ্ঠানটি যেহেতু ঢাকায় হচ্ছে, তাই তারা বাংলাদেশ সৃষ্টির আসল ইতিহাস নিয়েই নাটকটি করবে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে তাদের সহপাঠী ছাত্র-ছাত্রীরা পর্যন্ত এই ব্যাপারে ব্যাপক অসহযোগিতা করতে শুরু করে। তাদের বিরোধীতার কারণ হিসেবে তারা বলে, ৫০ বছর আগে পাকিস্তান যে বাংলাদেশের কাছে শোচনীয়ভাবে যুদ্ধে হেরেছিল, সেই লজ্জার কাহিনিই কি তারা নাটকে তুলে ধরতে চায়?
এই সিনেমা মুক্তির আগে থেকেই বিতর্কের জন্ম হয় দেশটিতে। মুক্তির পর এই বিতর্ক আরও বেড়ে যায়।
একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আজও যে তীব্র অস্বস্তি কাজ করে, খেল খেল মেঁ নামে ওই সিনেমাটিই ছিল তার প্রমাণ।
যে দেশটি ২০২১ সালে গিয়েও বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরতে অস্বস্তিতে ভোগে, সেই দেশ কী একাত্তরের যুদ্ধের সময় সাধারণ পাকিস্তানিদের জানতে দেবে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন আর বাঙালির প্রতিরোধের কথা?
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সেন্সরশিপ আর সরকারি প্রোপাগান্ডার কারণে সাধারণ পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটাই অন্ধকারে ছিল। যুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে খবর প্রচার করত, তা বিশ্লেষণ করলে এর স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক সংকটের শুরুতে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের অবস্থান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নেমে আসে ব্যাপক নির্মমতা। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকায় কালরাতের খবরগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। বিবিসিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সময়ের পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা।
২৬ মার্চ নওয়ায়ে ওয়াক্ত পত্রিকার প্রধান শিরোনামে ছাপা হয়—রংপুর, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও দেওপুরে বিক্ষোভকারী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর সময় হওয়া এসব সংঘর্ষে ৬৪ জন নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়।
তার পরের দিন পত্রিকায় আরও বড় করে কিছু খবর ছাপা হয়। যেমন—দেশে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগীদের দেশদ্রোহী ঘোষণা, আওয়ামী লীগকে অবৈধ ঘোষণা, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আইন ও কারফিউ জারি এবং সারা দেশে কঠোর সেন্সরশিপ।

সামরিক আইন প্রশাসনের দাবি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে ‘জাতীয় অখণ্ডতা’ বিপদের মুখে থাকায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব সেন্সরশিপের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ জানতই না পূর্ব পাকিস্তানে আসলে কী ঘটনা ঘটছে। এছাড়া, পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে জানার অন্য উপায়ও ছিল না।
আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সেসময় পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলো অনেকটাই সরকারি সূত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রেস ট্রাস্টের আওতায় প্রকাশিত পত্রিকা মাশরিক-এ ৩ এপ্রিল একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যেখানে লেখা ছিল—‘প্রেসিডেন্টের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেখ মুজিব অনড় থেকেছেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তারা পাকিস্তানের পতাকার অবমাননা করেছেন এবং কায়েদ-এ-আজমের (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) ছবিও ছিঁড়ে ফেলেছেন।’
এছাড়া, মাশরিক-এর ২৭ মার্চের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্র করছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।’
পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোতে।
শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারকে ‘১২ কোটি পাকিস্তানির মনের ইচ্ছার প্রতিফলন’ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে অভিযান চালানোর জন্য ইয়াহিয়া খানের সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে সমর্থনও জানায় অনেক সংবাদমাধ্যম।
বামপন্থী ও ডানপন্থী গণমাধ্যমের একই সুর
একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে যখন বইছে রক্তের বন্যা, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন বইছে নিন্দার ঝড়। সেটি হোক ডানপন্থী মিডিয়া কিংবা বামপন্থী। এর উদহারণ হিসেবে বলা যায়—জামায়াতে ইসলামীর এশিয়া এবং বামপন্থী আল-ফতেহ পত্রিকার কথা। এই দুই পত্রিকার আদর্শগত মতভেদ থাকলেও তারা খবরে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় হস্তক্ষেপকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানায় এবং দেশের অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে সেসময় পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন পাকিস্তানের প্রবীণ সাংবাদিক সেলিম মনসুর খালিদ। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির আরএ বাজারে প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টের একটি প্রেস রুম থেকে প্রতিদিন সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হতো। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল ড. মকবুল ভাট্টি, তিন বাহিনীর প্রতিনিধি এবং আইএসপিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার এআর সিদ্দিকী তথ্য সরবরাহ করতেন।’
সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন সময় পাকিস্তানের টেলিভিশন বা রেডিওতে খবরের বাইরে আর কোনো অনুষ্ঠান হতো না। সংবাদ বুলেটিনের পর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের ‘খবরের ওপর আলোচনা’ নামে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হতো, যেখানে সবাই সরকারের অবস্থানই তুলে ধরতেন।

পাকিস্তানি গণমাধ্যম চাইলেও যে সরকারের বিপক্ষে যায় এমনকিছু প্রকাশ করতে পারতো, সেই সুযোগও ছিল না। বিরোধীপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতো তার ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে পয়লা এপ্রিল নওয়ে ওয়াক্ত পত্রিকার সংখ্যা থেকে। সেদিন পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠাসহ দুটো পাতা, কোনো লেখা ছাড়াই ফাঁকা অবস্থায় ছাপা হয়েছিল।
পশ্চিম পাকিস্তান সরকার শুধু যে একতরফা খবর প্রকাশ করত তা নয়, বরং সেই খবরের ওপর ভিত্তি করে জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করতে বিশেষ নিবন্ধও লেখা হতো।
সাধারণ মানুষের ওপর একতরফা খবরের প্রভাব
মাসের পর মাস ধরে এমন একতরফা, প্রোপাগাণ্ডায় পরিপূর্ণ সংবাদ শুনতে শুনতে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সরকারি প্রোপাগান্ডাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁদের ধারণা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চায়, কেবল কিছু হিন্দু ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলে ভারতের মদদে দেশকে ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে।
উর্দু ডাইজেস্ট-এর সম্পাদক আলতাফ হাসান কোরেশি ‘ভালোবাসার নদী বয়েই যাচ্ছে’ এরকম শিরোনামে একটি নিবন্ধমালা প্রকাশ করেছিলেন ১৯৬৬ সালে। এই সাংবাদিক নিয়মিত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বেশকিছু অভিযোগের বিষয়ে জানতে পারেন। তবুও আলতাফ হাসান মনে করেন, ‘অনেক ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানকে ভালোবাসতো এবং তাঁরা পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চাইত। বিচ্ছিন্নতা চাইত না।’
সেই সময়ের পাকিস্তানি মিডিয়াগুলোর প্রোপাগান্ডার প্রভাব কতটা গভীর ছিল, একজন ৮০ বছর বয়সী পাকিস্তানি বৃদ্ধার কথা থেকেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ কীভাবে স্বাধীন হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রয়াত স্বামী বলতেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা মুজিবকে ভোট না দিত, তাহলে বাংলাদেশ কখনই আলাদা হতো না।’
বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ কীভাবে দেখত, সে কথা উল্লেখ করে পাকিস্তানের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ এইচ নাইয়ার বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের চোখে বাঙালিরা ছিল এক অভুক্ত, পাঁচ ফুট উচ্চতার দুর্বল জাতি। আর আমরা হচ্ছি উঁচু জাতের মানুষ। কাজেই একধরনের হেয় চোখে দেখা হতো তাদের।’
মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে কী আছে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে
পাকিস্তানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্কুলশিক্ষার্থীরা প্রথম জানার সুযোগ পায় নবম শ্রেণিতে উঠে। দেশটির সরকারি স্কুলগুলোতে যেসব পাঠ্যবই পড়ানো হয়, সেখানে খুবই অস্পষ্টভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়। এই বিবরণ দুই বা তিন পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ, খুব বিস্তারিত কিছু সেখানে লেখা নেই।
তবে এর বিপরীতে পাকিস্তানের বেসরকারি স্কুলগুলোতে ও-লেভেলে ‘পাকিস্তান স্টাডিজ’ বলে যে বই পড়ানো হয়, সেখানে পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যেসব অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তবে সরকারি বা বেসরকারি স্কুল—উভয় ক্ষেত্রেই পাঠ্যক্রমে একটা বিষয় অভিন্ন আর তা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস।
পাকিস্তানের সরকারি স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমিতে ৭০-এর নির্বাচন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি পেয়ে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮৭টি পেয়ে বিজয়ী হয় পিপলস পার্টি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি, আর পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি।
তৎকালীন সামরিক সরকার বিজয়ী দলগুলোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্বের কথাও উল্লেখ আছে। এই গড়িমসির ফলে পূর্ব পাকিস্তানে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামরিক সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ উসকে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চালায়। পূর্ব পাকিস্তানে যখন আইন অমান্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন সামরিক শাসকেরা ‘জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থে’ তা দমন করতে সেখানে সেনা নামানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তারা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেন।
পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের সুযোগ নেয় ভারত। তারা পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এই হস্তক্ষেপের কারণে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারত তার সেনাবাহিনীর সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই ঘটনার পর পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পুরো বিষয়টিই ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার মনোভাব ফুটে উঠেছে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে।

পাকিস্তানের স্কুল পর্যায়ের নবম শ্রেণির একটি উর্দু ইতিহাস বইয়ে এ প্রসঙ্গে সাতটি নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে—
ভৌগোলিক দূরত্ব: ‘দুর্ভাগ্যবশত’ পাকিস্তানের দুই ভূখণ্ডের মধ্যে ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মাঝে অবস্থিত ছিল ভারত। এই দূরত্বের ফলে প্রতিরক্ষাগত জটিলতা যেমন তৈরি হয়েছিল, যোগাযোগ ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হয়।
ভাষার প্রশ্ন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর যেহেতু শুধু উর্দুকেই রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ মেনে নিতে পারেনি। এই ভাষাগত বঞ্চনার ইস্যু থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে সরে যাওয়া: দীর্ঘ ৯ বছর পাকিস্তানে কোনও সংবিধান ছিল না। ১৯৫৬-তে একটা সংবিধান প্রণীত হলেও পরে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। একের পর এক সামরিক স্বৈরশাসক দেশ শাসন করতে থাকেন। পাকিস্তানে কোনও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল না বলেই ১৯৭০-এর নির্বাচনে জেতার পরও আওয়াম লীগকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
অর্থনৈতিক কারণ: প্রথম থেকেই পাকিস্তানের সব অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ছিল না। সেখানকার বাংলাভাষী মানুষ বিশ্বাস করেছিল, আলাদা পাকিস্তান তৈরি হলে তাদের দুর্দশার অবসান হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদের বঞ্চনার কারণেই শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় ও তিনি ছয় দফা নিয়ে আসেন।
সামরিক অভিযান: পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের ‘সশস্ত্র আন্দোলন’কে পাকিস্তান সরকার একটি ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করে এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। এতে বহু নিরীহ সাধারণ মানুষ মারা যায়, সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ভারত ও পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা: পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে সেই সময়ের পরাশক্তি বিশেষ করে ভারত, পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের ভারত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্রও তুলে দিতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রও ‘নীরবে’ সায় দিয়েছিল।
হিন্দু শিক্ষকদের নেতিবাচক ভূমিকা: পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষক ও অধ্যাপকদেরই প্রাধান্য ছিল, কারণ বাঙালি মুসলিমরা তখন শিক্ষা-দীক্ষায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিলেন। তাদের শেখানো বিদ্যাই বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার দাবিকে অনুপ্রাণিত করে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানের লেখক ও সাংবাদিকরা নানা সাম্প্রদায়িক, ভূরাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণকেই দায়ী করছেন। একাত্তরের মত এখনও তারা বাংলাদেশিদের মুক্তিসংগ্রাম বা স্বাধীনতার লড়াইকে কৃতিত্ব দিতে রাজি নন! তবে সবকিছুর ভিড়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলো সেসময় প্রকৃত সত্য তুলে ধরত তবে কি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চলমান নৃশসংতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের ধারণা বদলে যেত?

২০২১ সালে পাকিস্তানি নির্মাতা ও পরিচালক নাবিল কুরেশি খেল খেল মেঁ নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন। ওই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, পাকিস্তানের একটি ইউনিভার্সিটির ড্রামা ক্লাবের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রোডাকশন নিয়ে ঢাকায় একটি নাট্যোৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছে। তারা স্থির করে, এই অনুষ্ঠানটি যেহেতু ঢাকায় হচ্ছে, তাই তারা বাংলাদেশ সৃষ্টির আসল ইতিহাস নিয়েই নাটকটি করবে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে তাদের সহপাঠী ছাত্র-ছাত্রীরা পর্যন্ত এই ব্যাপারে ব্যাপক অসহযোগিতা করতে শুরু করে। তাদের বিরোধীতার কারণ হিসেবে তারা বলে, ৫০ বছর আগে পাকিস্তান যে বাংলাদেশের কাছে শোচনীয়ভাবে যুদ্ধে হেরেছিল, সেই লজ্জার কাহিনিই কি তারা নাটকে তুলে ধরতে চায়?
এই সিনেমা মুক্তির আগে থেকেই বিতর্কের জন্ম হয় দেশটিতে। মুক্তির পর এই বিতর্ক আরও বেড়ে যায়।
একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আজও যে তীব্র অস্বস্তি কাজ করে, খেল খেল মেঁ নামে ওই সিনেমাটিই ছিল তার প্রমাণ।
যে দেশটি ২০২১ সালে গিয়েও বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরতে অস্বস্তিতে ভোগে, সেই দেশ কী একাত্তরের যুদ্ধের সময় সাধারণ পাকিস্তানিদের জানতে দেবে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন আর বাঙালির প্রতিরোধের কথা?
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সেন্সরশিপ আর সরকারি প্রোপাগান্ডার কারণে সাধারণ পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটাই অন্ধকারে ছিল। যুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে খবর প্রচার করত, তা বিশ্লেষণ করলে এর স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক সংকটের শুরুতে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের অবস্থান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নেমে আসে ব্যাপক নির্মমতা। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকায় কালরাতের খবরগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। বিবিসিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সময়ের পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা।
২৬ মার্চ নওয়ায়ে ওয়াক্ত পত্রিকার প্রধান শিরোনামে ছাপা হয়—রংপুর, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও দেওপুরে বিক্ষোভকারী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর সময় হওয়া এসব সংঘর্ষে ৬৪ জন নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়।
তার পরের দিন পত্রিকায় আরও বড় করে কিছু খবর ছাপা হয়। যেমন—দেশে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগীদের দেশদ্রোহী ঘোষণা, আওয়ামী লীগকে অবৈধ ঘোষণা, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আইন ও কারফিউ জারি এবং সারা দেশে কঠোর সেন্সরশিপ।

সামরিক আইন প্রশাসনের দাবি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে ‘জাতীয় অখণ্ডতা’ বিপদের মুখে থাকায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব সেন্সরশিপের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ জানতই না পূর্ব পাকিস্তানে আসলে কী ঘটনা ঘটছে। এছাড়া, পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে জানার অন্য উপায়ও ছিল না।
আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সেসময় পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলো অনেকটাই সরকারি সূত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রেস ট্রাস্টের আওতায় প্রকাশিত পত্রিকা মাশরিক-এ ৩ এপ্রিল একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যেখানে লেখা ছিল—‘প্রেসিডেন্টের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেখ মুজিব অনড় থেকেছেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তারা পাকিস্তানের পতাকার অবমাননা করেছেন এবং কায়েদ-এ-আজমের (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) ছবিও ছিঁড়ে ফেলেছেন।’
এছাড়া, মাশরিক-এর ২৭ মার্চের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্র করছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।’
পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোতে।
শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারকে ‘১২ কোটি পাকিস্তানির মনের ইচ্ছার প্রতিফলন’ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে অভিযান চালানোর জন্য ইয়াহিয়া খানের সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে সমর্থনও জানায় অনেক সংবাদমাধ্যম।
বামপন্থী ও ডানপন্থী গণমাধ্যমের একই সুর
একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে যখন বইছে রক্তের বন্যা, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন বইছে নিন্দার ঝড়। সেটি হোক ডানপন্থী মিডিয়া কিংবা বামপন্থী। এর উদহারণ হিসেবে বলা যায়—জামায়াতে ইসলামীর এশিয়া এবং বামপন্থী আল-ফতেহ পত্রিকার কথা। এই দুই পত্রিকার আদর্শগত মতভেদ থাকলেও তারা খবরে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় হস্তক্ষেপকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানায় এবং দেশের অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে সেসময় পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন পাকিস্তানের প্রবীণ সাংবাদিক সেলিম মনসুর খালিদ। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির আরএ বাজারে প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টের একটি প্রেস রুম থেকে প্রতিদিন সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হতো। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল ড. মকবুল ভাট্টি, তিন বাহিনীর প্রতিনিধি এবং আইএসপিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার এআর সিদ্দিকী তথ্য সরবরাহ করতেন।’
সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন সময় পাকিস্তানের টেলিভিশন বা রেডিওতে খবরের বাইরে আর কোনো অনুষ্ঠান হতো না। সংবাদ বুলেটিনের পর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের ‘খবরের ওপর আলোচনা’ নামে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হতো, যেখানে সবাই সরকারের অবস্থানই তুলে ধরতেন।

পাকিস্তানি গণমাধ্যম চাইলেও যে সরকারের বিপক্ষে যায় এমনকিছু প্রকাশ করতে পারতো, সেই সুযোগও ছিল না। বিরোধীপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতো তার ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে পয়লা এপ্রিল নওয়ে ওয়াক্ত পত্রিকার সংখ্যা থেকে। সেদিন পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠাসহ দুটো পাতা, কোনো লেখা ছাড়াই ফাঁকা অবস্থায় ছাপা হয়েছিল।
পশ্চিম পাকিস্তান সরকার শুধু যে একতরফা খবর প্রকাশ করত তা নয়, বরং সেই খবরের ওপর ভিত্তি করে জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করতে বিশেষ নিবন্ধও লেখা হতো।
সাধারণ মানুষের ওপর একতরফা খবরের প্রভাব
মাসের পর মাস ধরে এমন একতরফা, প্রোপাগাণ্ডায় পরিপূর্ণ সংবাদ শুনতে শুনতে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সরকারি প্রোপাগান্ডাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁদের ধারণা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চায়, কেবল কিছু হিন্দু ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলে ভারতের মদদে দেশকে ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে।
উর্দু ডাইজেস্ট-এর সম্পাদক আলতাফ হাসান কোরেশি ‘ভালোবাসার নদী বয়েই যাচ্ছে’ এরকম শিরোনামে একটি নিবন্ধমালা প্রকাশ করেছিলেন ১৯৬৬ সালে। এই সাংবাদিক নিয়মিত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বেশকিছু অভিযোগের বিষয়ে জানতে পারেন। তবুও আলতাফ হাসান মনে করেন, ‘অনেক ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানকে ভালোবাসতো এবং তাঁরা পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চাইত। বিচ্ছিন্নতা চাইত না।’
সেই সময়ের পাকিস্তানি মিডিয়াগুলোর প্রোপাগান্ডার প্রভাব কতটা গভীর ছিল, একজন ৮০ বছর বয়সী পাকিস্তানি বৃদ্ধার কথা থেকেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ কীভাবে স্বাধীন হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রয়াত স্বামী বলতেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা মুজিবকে ভোট না দিত, তাহলে বাংলাদেশ কখনই আলাদা হতো না।’
বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ কীভাবে দেখত, সে কথা উল্লেখ করে পাকিস্তানের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ এইচ নাইয়ার বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের চোখে বাঙালিরা ছিল এক অভুক্ত, পাঁচ ফুট উচ্চতার দুর্বল জাতি। আর আমরা হচ্ছি উঁচু জাতের মানুষ। কাজেই একধরনের হেয় চোখে দেখা হতো তাদের।’
মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে কী আছে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে
পাকিস্তানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্কুলশিক্ষার্থীরা প্রথম জানার সুযোগ পায় নবম শ্রেণিতে উঠে। দেশটির সরকারি স্কুলগুলোতে যেসব পাঠ্যবই পড়ানো হয়, সেখানে খুবই অস্পষ্টভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়। এই বিবরণ দুই বা তিন পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ, খুব বিস্তারিত কিছু সেখানে লেখা নেই।
তবে এর বিপরীতে পাকিস্তানের বেসরকারি স্কুলগুলোতে ও-লেভেলে ‘পাকিস্তান স্টাডিজ’ বলে যে বই পড়ানো হয়, সেখানে পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যেসব অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তবে সরকারি বা বেসরকারি স্কুল—উভয় ক্ষেত্রেই পাঠ্যক্রমে একটা বিষয় অভিন্ন আর তা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস।
পাকিস্তানের সরকারি স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমিতে ৭০-এর নির্বাচন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি পেয়ে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮৭টি পেয়ে বিজয়ী হয় পিপলস পার্টি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি, আর পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি।
তৎকালীন সামরিক সরকার বিজয়ী দলগুলোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্বের কথাও উল্লেখ আছে। এই গড়িমসির ফলে পূর্ব পাকিস্তানে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামরিক সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ উসকে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা চালায়। পূর্ব পাকিস্তানে যখন আইন অমান্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন সামরিক শাসকেরা ‘জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থে’ তা দমন করতে সেখানে সেনা নামানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তারা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেন।
পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের সুযোগ নেয় ভারত। তারা পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এই হস্তক্ষেপের কারণে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারত তার সেনাবাহিনীর সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই ঘটনার পর পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পুরো বিষয়টিই ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার মনোভাব ফুটে উঠেছে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে।

পাকিস্তানের স্কুল পর্যায়ের নবম শ্রেণির একটি উর্দু ইতিহাস বইয়ে এ প্রসঙ্গে সাতটি নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে—
ভৌগোলিক দূরত্ব: ‘দুর্ভাগ্যবশত’ পাকিস্তানের দুই ভূখণ্ডের মধ্যে ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মাঝে অবস্থিত ছিল ভারত। এই দূরত্বের ফলে প্রতিরক্ষাগত জটিলতা যেমন তৈরি হয়েছিল, যোগাযোগ ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হয়।
ভাষার প্রশ্ন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর যেহেতু শুধু উর্দুকেই রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ মেনে নিতে পারেনি। এই ভাষাগত বঞ্চনার ইস্যু থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে সরে যাওয়া: দীর্ঘ ৯ বছর পাকিস্তানে কোনও সংবিধান ছিল না। ১৯৫৬-তে একটা সংবিধান প্রণীত হলেও পরে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। একের পর এক সামরিক স্বৈরশাসক দেশ শাসন করতে থাকেন। পাকিস্তানে কোনও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল না বলেই ১৯৭০-এর নির্বাচনে জেতার পরও আওয়াম লীগকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
অর্থনৈতিক কারণ: প্রথম থেকেই পাকিস্তানের সব অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ছিল না। সেখানকার বাংলাভাষী মানুষ বিশ্বাস করেছিল, আলাদা পাকিস্তান তৈরি হলে তাদের দুর্দশার অবসান হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদের বঞ্চনার কারণেই শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় ও তিনি ছয় দফা নিয়ে আসেন।
সামরিক অভিযান: পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের ‘সশস্ত্র আন্দোলন’কে পাকিস্তান সরকার একটি ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করে এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। এতে বহু নিরীহ সাধারণ মানুষ মারা যায়, সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ভারত ও পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা: পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে সেই সময়ের পরাশক্তি বিশেষ করে ভারত, পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের ভারত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্রও তুলে দিতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রও ‘নীরবে’ সায় দিয়েছিল।
হিন্দু শিক্ষকদের নেতিবাচক ভূমিকা: পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষক ও অধ্যাপকদেরই প্রাধান্য ছিল, কারণ বাঙালি মুসলিমরা তখন শিক্ষা-দীক্ষায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিলেন। তাদের শেখানো বিদ্যাই বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার দাবিকে অনুপ্রাণিত করে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানের লেখক ও সাংবাদিকরা নানা সাম্প্রদায়িক, ভূরাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণকেই দায়ী করছেন। একাত্তরের মত এখনও তারা বাংলাদেশিদের মুক্তিসংগ্রাম বা স্বাধীনতার লড়াইকে কৃতিত্ব দিতে রাজি নন! তবে সবকিছুর ভিড়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলো সেসময় প্রকৃত সত্য তুলে ধরত তবে কি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চলমান নৃশসংতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের ধারণা বদলে যেত?

একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে কাজ কাজ করেন ফাবিহা। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধের তিনটি চলচ্চিত্র বেছে নিতে বললে, তিনি শ্যামল ছায়া, ওরা ১১ জন এবং আগুনের পরশমণির নাম জানান।
২ ঘণ্টা আগে
২৬ মার্চ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়। প্রতি বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি আমরা। তবে ‘স্বাধীনতা’ শব্দ সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। জেনজিদের চোখে স্বাধীনতা মানে এক, তো মিলেনিয়ালদের চোখে স্বাধীনতার মানে আরেক।
৪ ঘণ্টা আগে
২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই থেকে প্রতি বছর ২৬ মার্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উদযাপিত হয় স্বাধীনতা দিবস।
৫ ঘণ্টা আগে
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ইতিহাসে সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিবস কমই আছে। আজ ২৬শে মার্চ, আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ৫৫ বছর আগে এই দিনেই এদেশের মানুষ স্বাধীন একটি ভূখণ্ডের আশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।
৮ ঘণ্টা আগে