লুকিয়ে বাবার নাটকের মহড়া দেখা সেই ছেলেটিই যখন বাংলাদেশের সিনেমার ‘মহানায়ক’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ২০: ৫৯
বুলবুল আহমেদ। স্ট্রিম গ্রাফিক

অভিনেতা বুলবুল আহমেদকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘মহানায়ক’। হয়েছেন ‘দেবদাস’, হয়েছেন ‘শ্রীকান্ত’। সত্তর ও আশির দশকে সুদর্শন নায়ক হিসেবে তিনি অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। অভিনয়জগতের সবাই তাঁকে ‘ভদ্রলোক’ হিসেবেই জানে। ২০১০ সালে ১৫ জুলাই বুলবুল আহমেদের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিত্রনায়ক রাজ্জাক বলেন, ‘আমি তাঁকে ডাকতাম ভদ্র নায়ক বলে। শুধু আমি কেন, পুরো চলচ্চিত্রের মানুষই তাঁকে ভদ্র মানুষ বলে জানেন।’

পর্দায় বুলবুল আহমেদের উপস্থিতি মানেই ছিল মার্জিত আভিজাত্য। চশমা চোখে সেই চেনা গোলগাল মুখ, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা স্মিত হাসি। রূপালি পর্দায় সময়ের সীমানা পেরিয়েছেন। সাদা-কালো যুগ থেকে রঙিন ক্যানভাসে তাঁর বিচরণ। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাট্যাঙ্গনেও ছিল পদচারণা।

অথচ এই নিপাট ভদ্রলোকটির হওয়ার কথা ছিল ব্যাংকার। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ব্যাংকেই কাজ করতেন। কিন্তু ভেতরের শিল্পীসত্তা তাঁকে বেশিদিন বেঁধে রাখেনি। বাবা খলিল আহমেদ ছিলেন সংস্কৃতিমনা। বাড়িতেই নিয়মিত নাটকের মহড়া করতেন। ছোট বুলবুল লুকিয়ে সেই মহড়া দেখতেন আর এই আসর থেকেই অনুপ্রেরণা পান অভিনয়ের। ১৯৬৮ সালে 'পূর্বাভাস' নাটকের মাধ্যমে পথচলা শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

সাহিত্যের রাজপুত্র বুলবুল আহমেদ

বুলবুল আহমেদ সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রে আগ্রহী ছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রতি ছিল বিশেষ অনুরাগ। ১৯৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। এটি ছিল বাংলাদেশে এই উপন্যাসের প্রথম চলচ্চিত্রায়ণ। পর্দায় দেবদাস চরিত্রে হাজির হন বুলবুল আহমেদ। তার অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে মুহূর্তেই। পারুর ভূমিকায় কবরী এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে আনোয়ারা। জুরিবোর্ড রিমেকের কারণে জাতীয় পুরস্কার না দিলেও দর্শক হৃদয়ে তিনি চিরকালের জন্য ‘দেবদাস’ হয়ে যান।

পর্দায় দেবদাস চরিত্রে হাজির হন বুলবুল আহমেদ। সংগৃহীত ছবি
পর্দায় দেবদাস চরিত্রে হাজির হন বুলবুল আহমেদ। সংগৃহীত ছবি

১৯৮৬ সালে অভিনয় করেন ‘শুভদা’ চলচ্চিত্রে। এটিও শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের চিত্রায়ন। ১৯৮৭ সালে নিজেই নির্মাণ করেন ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছবি। এখানে তিনি শ্রীকান্ত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনাতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এই ছবিতে রাজলক্ষ্মী ছিলেন শাবানা। ছবিটি বাচসাস পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ১১টি বিভাগে জেতে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও ছবিটি চারটি বিভাগে পুরস্কার জেতে।

শুধু চলচ্চিত্র নয়, নাটকেও বুলবুল আহমেদ ছিলেন সমান জনপ্রিয়। জহির রায়হানের উপন্যাস ‘বরফ গলা নদী’ থেকে তৈরি নাটকে অভিনয় করেন। কায়েস চরিত্রে তাঁর অভিনয় সবার নজর কেড়েছিল। তিনিই প্রথম একই নাটকে ভিন্ন সময়ে দুটি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তরুণ বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প ‘হৈমন্তী’ অবলম্বনে তৈরি নাটকে ‘অপু’-র চরিত্রে অভিনয় করেন। সময়ের ব্যবধানে তিনিই আবার হৈমন্তীর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকে বুলবুল আহমেদ অভিনীত শফিক চরিত্রটি দারুণ সাড়া জাগায়।

১৯৯৬ সালে বুলবুল অভিনয় করেন শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘দীপু নাম্বার টু’তে। মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ছবিতে তিনি বাবার চরিত্রে ছিলেন। জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

মৌলিক কাহিনীনির্ভর সিনেমার ‘মহানায়ক’

বুলবুল আহমেদ কখনোই তথাকথিত নকল গল্পের স্রোতে ভাসেননি। ছবি বাছাইয়ের সময় তিনি সবসময়ই মৌলিক ও রুচিশীল গল্পকে প্রাধান্য দিতেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সমসাময়িক অন্য নায়কদের থেকে আলাদা।

পরিচালক আলমগীর কবিরের সঙ্গে বুলবুল আহমেদের সখ্যতা ছিল দারুণ। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জুটি যেমন পশ্চিমবাংলার সিনেমাজগতে পরিবর্তন এনেছে, বুলবুল আহমেদের সঙ্গে পরিচালক আলমগীর কবিরের জুটিও ঢাকাই সিনেমাকে অনেক সমৃদ্ধ ছবি উপহার দিয়েছে।

পর্দায় বুলবুল আহমেদের উপস্থিতি মানেই ছিল মার্জিত আভিজাত্য। সংগৃহীত ছবি
পর্দায় বুলবুল আহমেদের উপস্থিতি মানেই ছিল মার্জিত আভিজাত্য। সংগৃহীত ছবি

এই জুটির প্রথম যৌথ কাজ ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এটি নির্মিত হয়েছিল। ছবিতে বুলবুল আহমেদের বিপরীতে নায়িকা ছিলেন ববিতা। ২০০২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের তালিকায় এটি স্থান পায়। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ১০ চলচ্চিত্রের মধ্যে এটি আট নম্বরে ছিল।

এই জুটির দ্বিতীয় ছবি ছিল ‘সূর্য কন্যা’ (১৯৭৫)। এই ছবিতে বুলবুলের নায়িকা ছিলেন জয়শ্রী কবির। সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি আর্কাইভকেও সমৃদ্ধ করে অনেক। এরপর আসে ১৯৭৭ সালের কালজয়ী ছবি ‘সীমানা পেরিয়ে’। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা নিয়ে এটি নির্মিত। উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তব চিত্র ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। অনন্য অভিনয়ের জন্য প্রথমবারের মতো জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার। ছবিটি মোট তিনটি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিল।

১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় এই জুটির ‘মহানায়ক’ চলচ্চিত্র। মূলত এই ছবির পর থেকেই বুলবুল আহমেদের উপাধি হয় ‘মহানায়ক’। এই ছবিতে সুবীর নন্দীর গাওয়া দুটি গান এখনও কালজয়ী হয়ে আছে। একটি ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, অন্যটি ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’।

Ad 300x250

সম্পর্কিত