পান্তা-ইলিশ কি তবে ‘উপদ্রব’

Multiple Authors
ইয়াশাব ওসামা রহমান ও মিজানুর রহমান

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৫৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

পয়লা বৈশাখে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই প্রথা আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল না। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হওয়া এই রীতি এখন সংরক্ষণবাদীদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। তাঁরা এমনিতেই ইলিশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন।

কাকতালীয়ভাবে, ২০২৫-এর নভেম্বর থেকে ২০২৬-এর ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা (ছোট ইলিশ) ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়েই বাংলা নববর্ষ পালিত হয়।

ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক এবং মৎস্যবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব মনে করেন, ইলিশ খাওয়ার এই চল শুরু হয়েছে মূলত আশির দশকে। আর এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করা। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়াতেই ইলিশের এই চল শুরু হয়। যদিও বর্তমানে দেশের ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রমে সংরক্ষণের জন্য জাটকা নিধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অধ্যাপক ওহাবের কথার প্রমাণ মেলে সরকারি উদ্যোগেও। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল দেশব্যাপী জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন করা হয়। আর এই সপ্তাহ শেষ হয় ঠিক পয়লা বৈশাখের আগেই।

ঐতিহ্যের কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক ওহাব মনে করিয়ে দেন, অতীতে এমন কোনো রীতির অস্তিত্ব ছিল না। এই প্রথা নতুন আবিষ্কার। বাঙালি পান্তা-মরিচ খেত। যার সামর্থ্য ছিল, সে পান্তা ভাতের সঙ্গে সেই মাছই খেত। প্রবাদে আছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’, কিন্তু সেটা যে ইলিশ মাছই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। সব মিলিয়ে তিনি পান্তা-ইলিশের এই প্রথাকে স্রেফ 'উপদ্রব' বলে মনে করেন।

অধ্যাপক ওহাব হতাশার সঙ্গে জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জাটকা ধরা বন্ধ নেই। বাজারে ১২০০ থেকে ১৭০০ টাকায় ছোট ইলিশ দেদার বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ইলিশের দাম যত বাড়ে, বড় ব্যবসায়ী আর নৌকার মালিকদের লাভ তত বেশি হয়। তাই তারা করপোরেট স্বার্থেই পয়লা বৈশাখে ইলিশকে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ইলিশ গবেষক নিয়ামুল নাসের বলেন, ‘পান্তা-ইলিশ আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমাদের সংস্কৃতি ছিল ভর্তা, শুকনো মরিচ আর ভাত। তখন ইলিশ ছাড়াও অনেক ধরনের খাবার আমাদের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ছিল।’

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক প্রয়াত অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেছিলেন, বৈশাখের প্রথম দিনে ইলিশ খাওয়ার চল খুব বেশি দিনের নয়। নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য ইলিশ কেনার মতো বাড়তি টাকা কৃষকদের হাতে সাধারণত থাকে না। কৃষকরা এই উৎসবে ইলিশ খান—এই কথা সত্য নয়। তাই ইলিশ খাওয়ার এই রীতির সঙ্গে প্রাচীন বাংলা নববর্ষের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি রমনায় পয়লা বৈশাখের মেলায় দোকান বসানো ব্যবসায়ীদের এর জন্য দায়ী করেন। অনেকেই আবার বড় ব্যবসায়ীদের দিকেই আঙুল তোলেন।

এর বাইরে আরও দুটি মত প্রচলিত আছে। একদলের মতে, আশির দশকে কিছু কবি মিলে নববর্ষের উদ্যাপনে জোর করে ইলিশ খাওয়া ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। অন্য দলের যুক্তি হলো, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উৎসবে মূলত নিরামিষ খান; তাই তাদের উৎসব থেকে আলাদা করার জন্যই এই মাছ খাওয়ার প্রথা শুরু হয়েছিল।

শুরুটা যেভাবেই হোক না কেন, ইলিশের ওপর চাপ কিন্তু কমছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইলিশ পাওয়া গেলেও প্রজননের জন্য এই মাছ বাংলাদেশের গঙ্গা অববাহিকাকেই বেছে নেয়। বাণিজ্যিক খামারগুলো এই প্রজনন পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইলিশ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন মিথ বা লোককথা।

অধ্যাপক নাসের বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা ছোট মাছ বা পোনা খেতেন না। এ কারণেই আমরা ইলিশ রক্ষা করতে পেরেছিলাম। তাঁদের জীবনযাপন ছিল খুব সাধারণ। তাই মাছের বংশবিস্তারে কোনো বাধা পড়ত না।’

সব বিতর্ককে ছাপিয়ে ইলিশ এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিকীকরণের পথে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে অধ্যাপক নাসের বলছেন, সবাই ইলিশ রক্ষা করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা রক্ষা করা যাচ্ছে?

খাওয়ার জন্যই কি সংরক্ষণ?

২০০৪ সালের দিকে সরকার ইলিশ রক্ষায় মনোযোগ দেয়। তখন থেকেই মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া শুরু হয়। তবে অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের দাবি, আসল উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের দিকে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের দিকে ইলিশের সংখ্যা বেশ কমে গিয়েছিল। এরপর সরকার বিদেশি সংস্থা ও গবেষকদের নিয়ে নানা উদ্যোগ নেয়। এই সদিচ্ছার ফলেই ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

উৎসবের সময়ে সংরক্ষণের উদ্যোগে বাধা পড়ার বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, নির্ধারিত অভয়াশ্রমের বাইরে ইলিশ ধরলে উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে এই মৌসুমে অভয়াশ্রম থেকে ইলিশ ধরলে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হবে। দেশে মোট ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম আছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থানে এখন মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ।

এই ছয়টি অভয়াশ্রম উপকূলীয় বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং শরীয়তপুর জেলায় অবস্থিত। সব মিলিয়ে এই অভয়াশ্রমগুলোর দৈর্ঘ্য ৪৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে বরিশাল, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা এবং শরীয়তপুরের অভয়াশ্রমগুলোতে সব ধরনের মাছ ধরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশই আসে ইলিশ থেকে। আর জাতীয় জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ৯৯ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টনে।

কাগজে-কলমে ইলিশের এই গল্প এক বিশাল সাফল্যের। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অধ্যাপক ওহাব যেমনটি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জাটকা ধরা থামছে না। ২৫ সেন্টিমিটারের নিচের ইলিশকে জাটকা হিসেবে ধরা হয়। গ্রেপ্তারের ভয় থাকা সত্ত্বেও বাজারে তা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে অধ্যাপক নাসের যেকোনো কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দেশের অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাবের কথা বলছেন।

জেলেদের জীবনের মূল্য কত?

বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ ধরার সঙ্গে যুক্ত। এর বাইরে আরও ২০-২৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। তাঁরা পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির মতো কাজে যুক্ত।

মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার জেলেদের সহায়তা করে। ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফ (VGF) প্রকল্পের আওতায় তাঁদের চাল দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে এই মাসিক চালের বরাদ্দ ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৪০ কেজি করা হয়েছে। কিন্তু এই সহায়তাই হয়তো যথেষ্ট নয়।

অধ্যাপক নাসের বলেন, চাল বরাদ্দের পাশাপাশি আরও কিছু সুবিধা দিলে তবেই তা কাজে আসবে। জেলেপল্লিগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, পুরুষরা যখন সাগর বা নদীতে যায়, তখন নারীরা বাড়িতেই থাকে। ওই দুর্গম এলাকায় নারীদের করার মতো কোনো কাজ নেই। তাই জেলেপল্লির নারীদের ক্ষমতায়ন করা গেলে সরকারি উদ্যোগগুলো আরও সফল হতো।

তিনি আরেকটি বড় সমস্যার কথা জানান, আর তা হলো শিক্ষার অভাব। এলাকাগুলো এতই দুর্গম যে সেখানে ভালো কোনো স্কুল নেই। ফলে জেলেপল্লির মানুষ সামান্য হিসাব-নিকাশও করতে পারে না। অথচ সাধারণ পোশাক কারখানায় চাকরি পেতে হলেও এইটুকু জ্ঞান লাগে। তাই তাদের এই পেশা থেকে বের করে আনতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

তিনি জেলেদের জীবনের ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দেন। এই উপকূলীয় গ্রামগুলো সব সময় দুর্যোগের মুখে থাকে। একটা ঝড়ে পুরো জীবন-জীবিকা ভেসে যেতে পারে। তাই এই মানুষগুলো সব সময়ই খুব অসহায় অবস্থায় থাকে। তিনি এসব এলাকায় কর্মসংস্থান তৈরির জন্য সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ওহাবের দাবি, এখানে একটি অসাধু চক্র কাজ করে। বিশেষ করে উৎসবের সময় তারা জেলেদের ইলিশ ধরতে বাধ্য করে। তিনি বলেন, ছোট ইলিশ ধরার জন্য জেলেদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হয়। এর পরিণতি যখন চারদিকে ছড়াবে, তখন তা জাতীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কাজের ঝুঁকির কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক নাসের বলেন, এই মানুষগুলো সাগর আর মহাসাগর থেকে আমাদের জন্য মাছ আনতে গিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রাখে। তাঁরা যদি সাগরে ডুবে মারা যান বা ডাকাতের হাতে খুন হন, তবে পুরো পরিবারের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।

জাতীয় গর্বের প্রতীক

জলবায়ু পরিবর্তন এমনিতেই ইলিশের বংশবিস্তারে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই ইলিশ হারিয়ে ফেলি, তবে এর অর্থ কী দাঁড়াবে? শুধু কি বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হবে?

অধ্যাপক নাসের বলেন, ‘আমরা যদি ইলিশ হারাই তবে আমরা শুধু একটা মাছই হারাব না। ১৯৭২ সাল থেকে ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। একটি জাতি তার প্রতীকের মাধ্যমেই পরিচিত হয়। শাপলা, দোয়েল বা ইলিশ হলো আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়। বাংলাদেশ এই ইলিশের জন্যই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।’

অধ্যাপক নাসের বলেন, প্রোটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরপুর এই মাছ একসময় সবার হাতের নাগালে ছিল। পুষ্টিগুণের বাইরে এর আরেকটা বড় দিক হলো কূটনীতি। ভারতের সেভেন সিস্টার্স, পশ্চিমবঙ্গ এবং আরও অনেকে আমাদের ইলিশের জন্য অপেক্ষায় থাকে। ইলিশ হারালে যে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে সেটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইলিশ যদি হারিয়ে যায় তবে বাংলাদেশ তার আত্মার একটি অংশও হারিয়ে ফেলবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত