গাজায় দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর ক্ষুধার মধ্যে কেটে গেছে আরেকটি বছর। নতুন বছর এলেও সেখানে কোনো নতুনত্ব আসেনি। আল জাজিরার সাংবাদিক মারাম হুমাইদের চোখে গাজায় ক্ষুধা, ক্ষতি আর নিরবচ্ছিন্ন কষ্টে কাটানো এক বছর।
মারাম হুমাইদ

গত দুই বছরে আমরা ঋতু, দিন ও সময় গোনা ছেড়ে দিয়েছি। দিন আর দিন নেই। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধ শুরুর আগে যে জীবন আমরা চিনতাম, তা আর নেই। দিনগুলো এক হয়ে গেছে।
আমরা কষ্টের সব রূপ অনুভব করেছি। সব তিক্ততা পান করেছি, শুধু যে পেয়ালাটি আমাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারত, সেটা ছাড়া। আমরা দেখেছি বিশ্ব ২০২৫ সালের শেষ নিয়ে লিখছে। মানুষ সাফল্য উদ্যাপন করছে। কিন্তু গাজায় নতুন বছর মানে যুদ্ধের তৃতীয় বছরে প্রবেশ। যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসও আমাদের সঙ্গী। গণহত্যা শুরুর পর থেকে গাজার যেন নিজেরই একটি আলাদা ক্যালেন্ডার রয়েছে।
এই বছর যারা বেঁচে আছে, তাঁরা কেবল শরীর নিয়ে টিকে আছে। তাঁদের আত্মা ক্ষয়ে গেছে। দুই বছর ধরে বাস্তুচ্যুত নারী-পুরুষের মুখের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ২০২৫ সালের শুরুতে আমরা আশাবাদী ছিলাম। অশ্রু ও অবিশ্বাস নিয়ে আমরা উত্তর গাজায় ফিরি আমাদের ধ্বংস হওয়া ঘরে, যেখানে আমরা সারাজীবন ছিলাম।
২০২৫ সালের জানুয়ারির যুদ্ধবিরতিতে আমরা ভেবেছিলাম যুদ্ধ শেষ। ভেবেছিলাম নতুন করে শুরু করা যাবে। কিন্তু আমরা ভুল ছিলাম। মাত্র ছয় সপ্তাহ পর যুদ্ধ ফিরে আসে। এবার আরও নিষ্ঠুরভাবে।

মার্চের মাঝামাঝি আমরা বোমার শব্দে জেগে উঠি। এই শব্দ কখনো আমাদের ছেড়ে যায়নি। এবার ইসরায়েল ক্ষুধাকে অস্ত্র বানায়। সবকিছুর প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। ত্রাণও বন্ধ থাকে। এরপর একই চক্র চলতে থাকে। যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, রক্ত আর ক্ষুধা। এক বেলার খাবারের জন্য নিরন্তর দৌড়।
প্রাচুর্যের ঋতু কেটে যায়। ঈদ ও উৎসব আসে। কিন্তু টেবিল ফাঁকা থাকে। না আছে ঈদের মিষ্টি। না আছে কফি। না আছে চকলেট। কিছুই নেই। মানুষ পানি দিয়েই আপ্যায়ন করে। অনেকে দারিদ্র্য লুকাতে অতিথিকে দাওয়াত করাই বন্ধ করে দেয়। এই বছরের ঈদে সুপারমার্কেটের তাক মাসের পর মাস খালি ছিল।
এক বিক্রেতা ছোট একটা টেবিল পেতে রেখেছিল। তাঁর স্ত্রী ঘরে চিনি, তিল আর ময়দা দিয়ে সামান্য মিষ্টি বানিয়েছিলেন। এক টুকরো মিষ্টির দাম ১০ শেকেল। প্রায় তিন ডলার। আমি অবাক হইনি। চিনি ও আটা তখন সোনার মতো দামী। গ্রাম হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল।
সেদিন আমি সন্তানদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরি। উৎসবের কোনো চিহ্ন খুঁজি। নিজের ওপরই অবাক হই। মনে মনে আশা করেছিলাম, ঈদ হলে কিছু বদলাবে। হয়তো খাবার আসবে।
কিন্তু নিজেকে বলি, গাজায় ঈদ হলে কী আসে–যায়? কিছুই বদলায় না। এটা আরেকটি সাধারণ দিন মাত্র। গাজায় একদিন মানেই আকাশে বোমা, আর মাটিতে ক্ষুধা ও আনন্দহীনতা। শেষ পর্যন্ত ঈদের দিনে উত্তরের দিকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাইনি। ফিরে এসেছি নিজের ঘরেই।
দেড় ঘণ্টার বেশি সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো গাড়ি পাইনি। এমনকি পশু-টানা গাড়িও না। এর চেয়েও বড় কারণ ছিল আরেকটি। আমার মনে হয়েছিল, আনন্দ যেন মরে গেছে। তাই ভেঙে পড়া মন নিয়ে ফিরে এলাম, পেছনে পেছনে হাঁটছিল আমার সন্তানরা।
ওদের জন্য নতুন কাপড় কেনার মতো টাকা আমার ছিল। কিন্তু আমার সব টাকা মিলিয়েও ওদের জন্য একটা বিস্কুট কিনতে পারিনি। ঘরে ফিরে সোফায় লুটিয়ে পড়ি। ভাবতে থাকি, গাজার ওপর কী ভয়ংকর ক্রোধ নেমে এসেছে। অথচ পৃথিবীর বাকি অংশ ঈদ উদ্যাপন করছে। আর আমরা না খেয়ে মরছি।
দিন যেতে যেতে আমরা নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকি। প্রতিটি দিন আমাদের শক্তি কেড়ে নেয়। দিনে দিনে কাজ করার ইচ্ছা হারাতে থাকি। লেখার আগ্রহও ফুরিয়ে আসে। মানুষের গল্প শোনার শক্তিও আর থাকে না।
ক্ষুধার্ত মানুষের গল্প শুনেই-বা কী হবে? বিশ্ব তো আমাদের বেরিয়ে থাকা হাড়ের সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যে গণহত্যা শেষই হচ্ছে না, তা নিয়ে লিখে কী হবে?
আমার ভেতরে আর শক্তি ছিল না। গল্পের কথা মাথায় আসত। কিন্তু মন বলত, বাকি শক্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে।
আমার দিন সীমিত হয়ে গেল খাবারের হিসাবের মধ্যে। কতটা আটা আছে, কতটা চাল আছে, কতটা চিনি আছে—এই হিসাবই ছিল সব। খোলা আগুনে ধোঁয়ার মধ্যে আমি সন্তানদের জন্য ডাল রান্না করতাম। শেষ খামিরটুকু নিয়ে দুশ্চিন্তা করতাম। কোথা থেকে জ্বালানি কাঠ পাব, তা ভেবে উদ্বিগ্ন থাকতাম। এক কাপ কফির জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা হতো। কফি যেন স্বপ্ন হয়ে গিয়েছিল। আগের ভরপুর খাবারের টেবিলের ছবি আমি বারবার দেখতাম।
আমরা দেখেছি মানুষ এক বস্তা আটা বা খাদ্যসামগ্রীর জন্য মারা যাচ্ছে। রাতে মানুষ ভিড় করছে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। যুদ্ধের পুরো সময় আমি গাজা ছাড়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভাবনার অর্থ বদলে গেছে।
আমি স্বপ্ন দেখতাম, সন্তানদের এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে তারা ইচ্ছেমতো খেতে পারবে। এই অপমান ও কষ্টের নাম আমি স্মৃতিতে রাখতে চাই—‘যাতে আমরা ভুলে না যাই।’
আমি কীভাবে ভুলব? আজও ফল ও সবজিতে ভরা কোনো দোকানের পাশ দিয়ে গেলে আমি থমকে যাই। হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। মনে মনে প্রার্থনা করি, এই নিয়ামত যেন আবার হারিয়ে না যায়।
আমি কীভাবে ভুলব? গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সুপারমার্কেটে ঢুকে খাবারে ভরা তাক দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। আমি উন্মাদের মতো কেনাকাটা করেছিলাম।

খাবার, চকলেট, চিপস, ক্রিম চিজ, আটা, ডাল—সবকিছুই নিয়েছিলাম। দাম দ্বিগুণ হলেও মনে হয়েছিল ধনসম্পদ বহন করছি। এরপর থেকে যেকোনো দোকানে ঢুকলেই ভয় গ্রাস করে। উদ্বেগ আসে। ক্লান্তি চেপে বসে। যা দরকার, তা কিনি। যা দরকার নেই, তাও কিনি।
এখন খাবার তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। তবু মন বলে, এই প্রাচুর্য টিকবে না। আমরা অভ্যস্ত হয়েছি অভাবে। খালি তাক আর বিচ্ছিন্ন সরবরাহ লাইনে।
এটা এক গভীর মানসিক আঘাত। এই বুঝি খাবার ফুরিয়ে যাবে। আমি খাবারকে ঘৃণা করি না। আমি ঘৃণা করি খাবারকে ঘিরে থাকা সেই আতঙ্ক আর ভয়কে।
এই ভয় ফিরে আসে প্রতিটি দরজা বন্ধের শব্দে। প্রতিটি মাদুর ঝাড়ার শব্দে। প্রতিটি চলন্ত ট্রাকের শব্দে। এমনকি গুলির শব্দেও। সবকিছু আমাদের আবার জরুরি অবস্থায় ঠেলে দেয়। আমরা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দের অপেক্ষায় থাকি।
বছরের শেষের দিকে এক রাতে আমরা হাসি-ঠাট্টা করছিলাম। আমার বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে। তাঁরা সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের সঙ্গে আশ্রয়ে আছে। ইসরায়েল তখন উত্তর গাজা থেকে মানুষ উচ্ছেদ করেছিল।
আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড নকল করতে চেয়েছিলাম। যেখানে কেকের চারপাশে সবাই বসে। প্রত্যেকে একটি মোমবাতি জ্বালায়। বছরের একটি ‘অর্জন’ বলে। আমরা শুরু করেছিলাম কেক ছাড়া। ম্লান এলইডির আলোয়। কারণ মাসের পর মাস বিদ্যুৎ ছিল না।
আমার পালা এলে আমি বলেছিলাম, এই বছরের আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমি মানসিকভাবে টিকে থাকতে পেরেছি।
বাক্য শেষ করার আগেই সবাই হেসে উঠল। আমার বোন হাসতে হাসতে বলল, ‘কে বলেছে তোমার মানসিক স্থিতি এখনও আছে?’
আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। প্রতিক্রিয়ায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর নিজের কথার ওজন বুঝে আমিও হেসে ফেলি।
কী বলছ তুমি? কোন মানসিকতা? কোন সুস্থতা? হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো।
যা বলেছি, যা বলিনি, আর যা কোনোদিন বলব না—সবকিছুর পরও কি মানসিক স্থিতির কথা বলা যায়?
এটাই ছিল বছরের সবচেয়ে সৎ সমাপ্তি।
এমন এক সমাপ্তি, যেখানে আমি বুঝেছি আমার শক্তির সীমা কোথায়। আমি বুঝেছি আমি একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। তবু কোনোভাবে চলতে পেরেছি।
এটা মৃত্যুকে জয় করা নয়। এটা শক্তিও নয়। এই অবস্থায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা ধীরে ধীরে আত্মা ও মনকে ক্ষয় করে।
দিনের পর দিন আমাদের মানবিকতা আরও ঝরে যায়। এক সময় আমরা আর জীবনের উপযুক্ত থাকি না। যত বছরই পার হোক না কেন।

গত দুই বছরে আমরা ঋতু, দিন ও সময় গোনা ছেড়ে দিয়েছি। দিন আর দিন নেই। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধ শুরুর আগে যে জীবন আমরা চিনতাম, তা আর নেই। দিনগুলো এক হয়ে গেছে।
আমরা কষ্টের সব রূপ অনুভব করেছি। সব তিক্ততা পান করেছি, শুধু যে পেয়ালাটি আমাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারত, সেটা ছাড়া। আমরা দেখেছি বিশ্ব ২০২৫ সালের শেষ নিয়ে লিখছে। মানুষ সাফল্য উদ্যাপন করছে। কিন্তু গাজায় নতুন বছর মানে যুদ্ধের তৃতীয় বছরে প্রবেশ। যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসও আমাদের সঙ্গী। গণহত্যা শুরুর পর থেকে গাজার যেন নিজেরই একটি আলাদা ক্যালেন্ডার রয়েছে।
এই বছর যারা বেঁচে আছে, তাঁরা কেবল শরীর নিয়ে টিকে আছে। তাঁদের আত্মা ক্ষয়ে গেছে। দুই বছর ধরে বাস্তুচ্যুত নারী-পুরুষের মুখের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ২০২৫ সালের শুরুতে আমরা আশাবাদী ছিলাম। অশ্রু ও অবিশ্বাস নিয়ে আমরা উত্তর গাজায় ফিরি আমাদের ধ্বংস হওয়া ঘরে, যেখানে আমরা সারাজীবন ছিলাম।
২০২৫ সালের জানুয়ারির যুদ্ধবিরতিতে আমরা ভেবেছিলাম যুদ্ধ শেষ। ভেবেছিলাম নতুন করে শুরু করা যাবে। কিন্তু আমরা ভুল ছিলাম। মাত্র ছয় সপ্তাহ পর যুদ্ধ ফিরে আসে। এবার আরও নিষ্ঠুরভাবে।

মার্চের মাঝামাঝি আমরা বোমার শব্দে জেগে উঠি। এই শব্দ কখনো আমাদের ছেড়ে যায়নি। এবার ইসরায়েল ক্ষুধাকে অস্ত্র বানায়। সবকিছুর প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। ত্রাণও বন্ধ থাকে। এরপর একই চক্র চলতে থাকে। যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, রক্ত আর ক্ষুধা। এক বেলার খাবারের জন্য নিরন্তর দৌড়।
প্রাচুর্যের ঋতু কেটে যায়। ঈদ ও উৎসব আসে। কিন্তু টেবিল ফাঁকা থাকে। না আছে ঈদের মিষ্টি। না আছে কফি। না আছে চকলেট। কিছুই নেই। মানুষ পানি দিয়েই আপ্যায়ন করে। অনেকে দারিদ্র্য লুকাতে অতিথিকে দাওয়াত করাই বন্ধ করে দেয়। এই বছরের ঈদে সুপারমার্কেটের তাক মাসের পর মাস খালি ছিল।
এক বিক্রেতা ছোট একটা টেবিল পেতে রেখেছিল। তাঁর স্ত্রী ঘরে চিনি, তিল আর ময়দা দিয়ে সামান্য মিষ্টি বানিয়েছিলেন। এক টুকরো মিষ্টির দাম ১০ শেকেল। প্রায় তিন ডলার। আমি অবাক হইনি। চিনি ও আটা তখন সোনার মতো দামী। গ্রাম হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল।
সেদিন আমি সন্তানদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরি। উৎসবের কোনো চিহ্ন খুঁজি। নিজের ওপরই অবাক হই। মনে মনে আশা করেছিলাম, ঈদ হলে কিছু বদলাবে। হয়তো খাবার আসবে।
কিন্তু নিজেকে বলি, গাজায় ঈদ হলে কী আসে–যায়? কিছুই বদলায় না। এটা আরেকটি সাধারণ দিন মাত্র। গাজায় একদিন মানেই আকাশে বোমা, আর মাটিতে ক্ষুধা ও আনন্দহীনতা। শেষ পর্যন্ত ঈদের দিনে উত্তরের দিকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাইনি। ফিরে এসেছি নিজের ঘরেই।
দেড় ঘণ্টার বেশি সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো গাড়ি পাইনি। এমনকি পশু-টানা গাড়িও না। এর চেয়েও বড় কারণ ছিল আরেকটি। আমার মনে হয়েছিল, আনন্দ যেন মরে গেছে। তাই ভেঙে পড়া মন নিয়ে ফিরে এলাম, পেছনে পেছনে হাঁটছিল আমার সন্তানরা।
ওদের জন্য নতুন কাপড় কেনার মতো টাকা আমার ছিল। কিন্তু আমার সব টাকা মিলিয়েও ওদের জন্য একটা বিস্কুট কিনতে পারিনি। ঘরে ফিরে সোফায় লুটিয়ে পড়ি। ভাবতে থাকি, গাজার ওপর কী ভয়ংকর ক্রোধ নেমে এসেছে। অথচ পৃথিবীর বাকি অংশ ঈদ উদ্যাপন করছে। আর আমরা না খেয়ে মরছি।
দিন যেতে যেতে আমরা নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকি। প্রতিটি দিন আমাদের শক্তি কেড়ে নেয়। দিনে দিনে কাজ করার ইচ্ছা হারাতে থাকি। লেখার আগ্রহও ফুরিয়ে আসে। মানুষের গল্প শোনার শক্তিও আর থাকে না।
ক্ষুধার্ত মানুষের গল্প শুনেই-বা কী হবে? বিশ্ব তো আমাদের বেরিয়ে থাকা হাড়ের সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যে গণহত্যা শেষই হচ্ছে না, তা নিয়ে লিখে কী হবে?
আমার ভেতরে আর শক্তি ছিল না। গল্পের কথা মাথায় আসত। কিন্তু মন বলত, বাকি শক্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে।
আমার দিন সীমিত হয়ে গেল খাবারের হিসাবের মধ্যে। কতটা আটা আছে, কতটা চাল আছে, কতটা চিনি আছে—এই হিসাবই ছিল সব। খোলা আগুনে ধোঁয়ার মধ্যে আমি সন্তানদের জন্য ডাল রান্না করতাম। শেষ খামিরটুকু নিয়ে দুশ্চিন্তা করতাম। কোথা থেকে জ্বালানি কাঠ পাব, তা ভেবে উদ্বিগ্ন থাকতাম। এক কাপ কফির জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা হতো। কফি যেন স্বপ্ন হয়ে গিয়েছিল। আগের ভরপুর খাবারের টেবিলের ছবি আমি বারবার দেখতাম।
আমরা দেখেছি মানুষ এক বস্তা আটা বা খাদ্যসামগ্রীর জন্য মারা যাচ্ছে। রাতে মানুষ ভিড় করছে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। যুদ্ধের পুরো সময় আমি গাজা ছাড়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভাবনার অর্থ বদলে গেছে।
আমি স্বপ্ন দেখতাম, সন্তানদের এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে তারা ইচ্ছেমতো খেতে পারবে। এই অপমান ও কষ্টের নাম আমি স্মৃতিতে রাখতে চাই—‘যাতে আমরা ভুলে না যাই।’
আমি কীভাবে ভুলব? আজও ফল ও সবজিতে ভরা কোনো দোকানের পাশ দিয়ে গেলে আমি থমকে যাই। হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। মনে মনে প্রার্থনা করি, এই নিয়ামত যেন আবার হারিয়ে না যায়।
আমি কীভাবে ভুলব? গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সুপারমার্কেটে ঢুকে খাবারে ভরা তাক দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। আমি উন্মাদের মতো কেনাকাটা করেছিলাম।

খাবার, চকলেট, চিপস, ক্রিম চিজ, আটা, ডাল—সবকিছুই নিয়েছিলাম। দাম দ্বিগুণ হলেও মনে হয়েছিল ধনসম্পদ বহন করছি। এরপর থেকে যেকোনো দোকানে ঢুকলেই ভয় গ্রাস করে। উদ্বেগ আসে। ক্লান্তি চেপে বসে। যা দরকার, তা কিনি। যা দরকার নেই, তাও কিনি।
এখন খাবার তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। তবু মন বলে, এই প্রাচুর্য টিকবে না। আমরা অভ্যস্ত হয়েছি অভাবে। খালি তাক আর বিচ্ছিন্ন সরবরাহ লাইনে।
এটা এক গভীর মানসিক আঘাত। এই বুঝি খাবার ফুরিয়ে যাবে। আমি খাবারকে ঘৃণা করি না। আমি ঘৃণা করি খাবারকে ঘিরে থাকা সেই আতঙ্ক আর ভয়কে।
এই ভয় ফিরে আসে প্রতিটি দরজা বন্ধের শব্দে। প্রতিটি মাদুর ঝাড়ার শব্দে। প্রতিটি চলন্ত ট্রাকের শব্দে। এমনকি গুলির শব্দেও। সবকিছু আমাদের আবার জরুরি অবস্থায় ঠেলে দেয়। আমরা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দের অপেক্ষায় থাকি।
বছরের শেষের দিকে এক রাতে আমরা হাসি-ঠাট্টা করছিলাম। আমার বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে। তাঁরা সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের সঙ্গে আশ্রয়ে আছে। ইসরায়েল তখন উত্তর গাজা থেকে মানুষ উচ্ছেদ করেছিল।
আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড নকল করতে চেয়েছিলাম। যেখানে কেকের চারপাশে সবাই বসে। প্রত্যেকে একটি মোমবাতি জ্বালায়। বছরের একটি ‘অর্জন’ বলে। আমরা শুরু করেছিলাম কেক ছাড়া। ম্লান এলইডির আলোয়। কারণ মাসের পর মাস বিদ্যুৎ ছিল না।
আমার পালা এলে আমি বলেছিলাম, এই বছরের আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমি মানসিকভাবে টিকে থাকতে পেরেছি।
বাক্য শেষ করার আগেই সবাই হেসে উঠল। আমার বোন হাসতে হাসতে বলল, ‘কে বলেছে তোমার মানসিক স্থিতি এখনও আছে?’
আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। প্রতিক্রিয়ায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর নিজের কথার ওজন বুঝে আমিও হেসে ফেলি।
কী বলছ তুমি? কোন মানসিকতা? কোন সুস্থতা? হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো।
যা বলেছি, যা বলিনি, আর যা কোনোদিন বলব না—সবকিছুর পরও কি মানসিক স্থিতির কথা বলা যায়?
এটাই ছিল বছরের সবচেয়ে সৎ সমাপ্তি।
এমন এক সমাপ্তি, যেখানে আমি বুঝেছি আমার শক্তির সীমা কোথায়। আমি বুঝেছি আমি একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। তবু কোনোভাবে চলতে পেরেছি।
এটা মৃত্যুকে জয় করা নয়। এটা শক্তিও নয়। এই অবস্থায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা ধীরে ধীরে আত্মা ও মনকে ক্ষয় করে।
দিনের পর দিন আমাদের মানবিকতা আরও ঝরে যায়। এক সময় আমরা আর জীবনের উপযুক্ত থাকি না। যত বছরই পার হোক না কেন।

নব্বই দশকের জনপ্রিয় ‘ছাইয়্যা ছাইয়্যা’ গানের সঙ্গে গলা মেলায়নি এমন সিনেমাপ্রেমী খুব কম পাওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, ‘তাল সে তাল মিলা’, ‘মাসাক্কালি’ বা ‘তেরে বিনা’-এর মতো অনেক জনপ্রিয় গান হয়ত আমাদের প্লে-লিস্টেই রয়েছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী বনানী চৌধুরী। আজকের অনেক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর জন্য তিনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন মসৃণ পথ। কিন্তু আমরা ক’জনই বা আজ তাঁর এই অবদান মনে রাখি?
১৬ ঘণ্টা আগে
ফোন সাইলেন্ট। না ভাইব্রেশন, না নোটিফিকেশন। তবু কাজের ফাঁকে, আড্ডার মাঝখানে হাতটা নিজে থেকেই চলে যায় ফোনের দিকে। লক খুলে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি; না, কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। কয়েক মিনিট পর আবারও একই কাজ। পরিচিত লাগছে? আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন এমন হয়?
২১ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের পথে হেঁটে চলেছে কলকাতার ‘পথের কুকুর’ আলোক। এখন সবাই তাকে চেনে ‘দ্য পিস ডগ’ নামে। ‘শান্তি পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে ১৯ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে সে এখন টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটনের দিকে হাঁটছে।
২ দিন আগে