জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিশ্লেষণ

রেজিম চেঞ্জ: ইরাক-লিবিয়া-আফগান হতে যাচ্ছে ইরান?

লেখা:
লেখা:
মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

বহু বছর ধরে পশ্চিমারা একটি যুক্তি দিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, ইরানে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে যে দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বাইরে থেকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ‘রেজিম চেঞ্জের’ ঝুঁকির চেয়েও বেশি। জানুয়ারিতে বিক্ষোভের ওপর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ইরানের বিরোধীদের ব্যাপক প্রচারণার ফলে এই হস্তক্ষেপের পথে থাকা ‘নৈতিক বাধা’ অনেকটাই কমে যায়।

এর পরপরই ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের ‘জেগে ওঠার’ আহ্বান জানান। আর এখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে তাঁরা উদযাপন করছে।

তবে, সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দিলেই যে খুব দ্রুত একটি পরিবর্তন আসবে এবং দেশ শান্তিতে চলবে—এমন ধারণা মোটেও নিশ্চিত নয়। বরং আয়াতুল্লাহ খামেনির পরের ইরান হয়তো পশ্চিমারা যেমন দেখতে চান, তেমন নাও হতে পারে।

‘রেজিম চেঞ্জ’-এর করুণ উদাহরণ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক তিনটি উদাহরণ আমাদের দেখায় যে কেন বাইরের হস্তক্ষেপ সাধারণত স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, বাহ্যিক সামরিক অভিযানের পর দ্রুত স্থিতিশীলতা নয়, বরং বিশৃঙ্খলাই দেখা দেয়। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইনডিকেটরস’-এ এই দেশগুলোর স্কোর দেখলেই তা বোঝা যায়।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আফগানিস্তানে শাসন পরিবর্তন হয়। এরপর দুই দশক ধরে যুদ্ধ ও বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চলতে থাকে। ২০২১ সালে দেশটি আবার তাদের আগের অবস্থায় ফিরে গেছে, কিন্তু স্থিতিশীলতা এখনো আসেনি।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর ইরাকে বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেষ্টা সত্ত্বেও দেশটি ২০০৩ সালের আগের স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি।

২০১১ সালে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের পর লিবিয়া ভেঙে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের সূচকে দেশটি ইতিবাচক স্থিতিশীলতা থেকে বিশ্বের সবচেয়ে নিচের স্তরে নেমে যায়। পুনরুদ্ধারের কোনো লক্ষণ নেই। দেশটি এখনো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে—যার একটি শাসন কেন্দ্র ত্রিপোলিতে এবং অন্যটি বেনগাজিতে।

এই তিন দেশের কোনোটিই হস্তক্ষেপের আগের স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি। তাদের পথচলা চিহ্নিত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতায়

‘রেজিম চেঞ্জ’ নাও হতে পারে

ইরানের শাসনব্যবস্থা আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়ার চেয়ে অনেক দিক থেকে আলাদা। নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যাকাণ্ড হয়তো বড় প্রভাব ফেলবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে রাষ্ট্রটি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

ইরানের অধিকাংশ মানুষ শিয়া মতাবলম্বী। শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, খামেনির মৃত্যুকে একটি ‘শাহাদাতের গল্প’ হিসেবে দেখা হতে পারে। ইসলামবিরোধী শক্তির হাতে মৃত্যু পরাজয় নয়, বরং মুক্তির পথ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শাসকদের যেভাবে উৎখাত বা হত্যা করা হয়েছে, এটি সেভাবে একটি তিক্ত পতন না-ও হতে পারে। পরিবর্তে এটি একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ আত্মাহুতির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের পবিত্রতা অর্জন।

এই শাহাদাতের ধারণাটি দেশের জনগণের একটি বড় অংশকে (এমনকি যারা আগে সরকারের সমালোচক ছিলেন তাদেরকেও) দেশ রক্ষার তাগিদে একতাবদ্ধ করতে পারে। একজন নেতাকে ‘বিদেশি আগ্রাসনে শহীদ’ হিসেবে উপস্থাপনে জাতীয় ঐক্য হতে পারে ও বাইরের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে পারে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এবং সমাজকে এমনভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যা সরকার পরিবর্তনের সমর্থকরা কল্পনাও করেননি।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ফলাফল বা ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণে এটি হয়তো আজ একটু কঠিন মনে হতে পারে। তবে এটি ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।

ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা বলছে, বাহ্যিক হস্তক্ষেপের সময় যদি প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অক্ষত না থাকে, তবে দীর্ঘ অস্থিরতা দেখা দেয়।

ইরানের ক্ষেত্রে এখন বড় প্রশ্ন হলো, প্রশাসনিক ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা টিকে থাকবে কি না। এটি মূলত নির্ভর করছে দেশটির ‘ডিপ স্টেট’ বা শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর, যারা দেশের অর্থব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সেবাগুলো পরিচালনা করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক প্রশাসন যদি নেতৃত্বের শূন্যতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তবে লিবিয়ার মতো সম্পূর্ণ ভাঙন এড়ানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ঐক্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়তে পারে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। জানুয়ারির বিক্ষোভের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতাদের সম্পর্কের ফাটল তৈরি করেছে। ফলে কোনো নেতার পক্ষেই জনগণের ব্যাপক সমর্থন পাওয়া কঠিন। সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানির মতো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির নেতৃত্বে অবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা হতে পারে।

খামেনির মৃত্যু পরবর্তী অস্থিরতা

যদি প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে অথবা সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তবে দেশ ভেঙে পড়ার এবং দীর্ঘ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে আজ যারা যুদ্ধের ডাক দিচ্ছেন, তারা হয়তো এমন এক অনিরাপত্তার চক্র শুরু করবেন যার চরম মূল্য দিতে হবে সাধারণ ইরানি সমাজকে।

এ ধরনের পরিণতিকে প্রভাবিত করতে পারে দুটি বিষয়। প্রথমত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির দুর্বল হয়ে যাওয়া। কয়েক দশকের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে সেই সামাজিক গোষ্ঠীটি আজ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, যারা সাধারণত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ভারসাম্য বজায় রাখে। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকলে চলমান যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে পারে সশস্ত্র কোনো দল বা বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামোর উগ্রবাদী অংশ।

বিশেষ করে আইআরজিসি ও বাসিজের কট্টর অংশ, যারা নতুন কোনো ব্যবস্থাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে আশা করছে যে তারা শান্তিতে মিশে যাবে, আসলে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং তারা রাষ্ট্রীয় শক্তি থেকে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে রূপ নিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক বিভাজন। ইরানে গড় মধ্যপ্রাচ্যের দেশের তুলনায় বেশি জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হলে এবং নিরাপত্তা নেতৃত্ব লক্ষ্যবস্তু হলে, রাষ্ট্র ভাঙনের ঝুঁকি ও বিভিন্ন মিলিশিয়ার উত্থানকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পুরোনো ক্ষোভের রেখা ধরে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সীমান্ত অঞ্চলে বালুচ, কুর্দি ও আরব জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ পূর্ণাঙ্গ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বড় শহরগুলোতে ঐক্যবদ্ধ নিরাপত্তা শৃঙ্খল ভেঙে গেলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, যেখানে নিয়ন্ত্রণহীন মিলিশিয়ারা এলাকার সম্পদ দখলের জন্য লড়াই করবে।

একই সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ‘এলিটদের যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে লড়াই করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘর্ষের ময়দানে পরিণত হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেকে বলেছেন, ‘অন্তহীন তিক্ততার চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো’—এ যুক্তি দিয়ে ইরানে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা হয়েছে। এই ধারণা দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বাসের ওপর যে সামরিক উপায়ে দ্রুত সমাধান সম্ভব।

কিন্তু ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা বলছে, যুদ্ধের ফলাফল কখনো সরলরেখায় চলে না; বরং এটি এক অনিশ্চিত এবং দীর্ঘস্থায়ী অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী সমাপ্তি হলেও ইতিহাস দেখায়, এমন সহিংস বিচ্ছেদের ‘সম্ভাব্য ফলাফল’ প্রায়ই হয় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়।

ইরানের মানুষের জন্য একটি শাসনব্যবস্থার এই ‘তেতো সমাপ্তি’ হয়তো তাদের কষ্টের শেষ নয়, বরং এক নতুন অন্তহীন তিক্ততার শুরু হতে পারে যা কয়েক দশক ধরে পুরো অঞ্চলকে তাড়া করে বেড়াবে।

  • মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক; অধ্যাপক, ফিলিপস-ইউনিভার্সিট্যাট মারবুর্গ, জার্মানি

আল জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত