উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার অগ্রভাগের দীপশিখাটির নাম শহীদ আসাদ। আসাদ শুধু উনসত্তরের আন্দোলনের একজন শহীদ নন; তিনি বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের চিরন্তন প্রতীক।
আসাদ শহীদ হওয়ার পর গণঅভ্যুত্থান আরও তীব্র রূপ নেয়, ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐক্য সুদৃঢ় হয় এবং আইয়ুব-শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট বাঙালি জাতির কাছে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অগ্নিশিখা। আন্দোলনকে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছিল সেই শহীদি মৃত্যু।
সেদিন, উনসত্তরের ২০ জানুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশাল মিছিল। পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে সরাসরি ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। আসাদের বুকে গুলি লাগে। এই সহিংস ঘটনায় সাধারণ ছাত্র-জনতার মধ্যে ক্রোধ ও প্রতিবাদের আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে পুরো ঢাকাকে আন্দোলনের অগ্নিগর্ভে পরিণত করে। সর্বগ্রাসী গণজোয়ারে রূপ নেয় আন্দোলন।
শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট আন্দোলনে আবেগী প্রতীক হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ বুঝে যায়, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আর আপসের পর্যায়ে নেই; এটি এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই। ফলে ছাত্রদের ভয় ও দ্বিধা ভেঙে যায়, প্রতিবাদ আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে লাগাতার হরতাল, মিছিল ও বিক্ষোভ শুরু হয়। শুধু ছাত্র নয়—শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলন আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিণত হয় সর্বস্তরের গণঅভ্যুত্থানে। পুলিশের গুলি ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে মানুষ আর পিছু হটে না, বরং প্রতিরোধ আরও তীব্র করে তোলে।
আইয়ুব খানের সরকার উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার যে মুখোশ পরে শাসন চালিয়ে যাচ্ছিল, আসাদের রক্ত সেই মুখোশ ছিঁড়ে দেয় জনগণের সামনে। এই হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, আইয়ুব খান আর জনগণের প্রতিনিধি নন; বরং তিনি দমন-পীড়নের একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন।
২০ জানুয়ারির পর কোনোকিছুই আর আগের মতো থাকে না। দাবিগুলো আরও সুস্পষ্ট ও তীব্র হয়ে ওঠে। অপ্রতিরোধ্য গণআন্দোলনের চাপে আইয়ুব খান বাধ্য হন জনতার দাবি মেনে নিতে। জনগণ বুঝে যায়, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বৈরশাসককে পিছু হটতে বাধ্য করা সম্ভব।
ছাত্র-জনতার এই অটল অবস্থানের সামনে আইয়ুব খান ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়েন—নিজ দলের ভেতরেও সমর্থন হারাতে থাকেন।
ফলে, গণঅভ্যুত্থানের পুরো ঘটনাপ্রবাহে আসাদের মৃত্যু ছিল আন্দোলনের এক মোড় ঘোরানো কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর আত্মদান আন্দোলনকে কেবল বেগবানই করেনি, বরং তাকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
আসাদের মৃত্যুর পর আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে প্রশাসনিক দমন বা সামরিক শক্তি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। রাজপথে ছাত্র-জনতার অবিরাম উপস্থিতি, হরতাল, মিছিল ও সংঘর্ষে রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। যদিও তিনি ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে হস্তান্তর করেন, তবুও এই পতন স্পষ্ট করে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও অপরাজেয় শক্তির সামনে কোনো স্বৈরশাসন স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে না।
শহীদ আসাদের পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর শিবপুরের ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আসাদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) শাখার সভাপতি। তিনি মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত কৃষক সমিতির অন্যতম সক্রিয় সংগঠকও ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে নরসিংদীর শিবপুর, হাতিরদিয়া ও মনোহরদী অঞ্চলে শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠে, যা কৃষক আন্দোলনের সাথে ছাত্র আন্দোলনের সংযোগ স্থাপন করেছিল। ১৯৬৯ সালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ বাঙালি জাতিকে সংগ্রামের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং স্বাধীনতার পথে আত্মবিশ্বাসী ও অটল করে তুলেছে। এই অভ্যুত্থান বাঙালি জাতিকে মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীন বাংলাদেশ।