খাদিজা আক্তার

‘শরীরের লগে ঘেঁইষা বসেছেন কেন?’—বাসে একজন নারী যাত্রীর এই অতি স্বাভাবিক প্রতিবাদের বিপরীতে যখন উত্তর আসে, ‘প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন, বাসে চড়েন কেন? বাসে চড়লে শরীর লাগবোই!’—তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কদর্য রূপ। যুগ বদলালেও গণপরিবহনে নারীকে হেনস্তা করার প্রক্রিয়া ও ধরণ বদলায়নি। বরং নিত্যদিন পুরুষ যাত্রী কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের হাতে নারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক বড় কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, বাসে যাতায়াতের সময় দুই সিটের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে পুরুষরা বসে থাকেন এবং নারীদের জন্য রাখা অল্প অংশে গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করেন। ৪০-৪২ আসনের বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মাত্র ৮টি আসন বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো পুরুষদের দখলেই থাকে। প্রতিবাদ করলে জোটে অশিষ্ট মন্তব্য ও কদর্য প্রশ্ন। অধিকাংশ নারীই কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর তাগিদে মুখ বুজে এই যৌন নির্যাতন ও হয়রানি সহ্য করেন। কোনো দৃঢ়চেতা নারী রুখে দাঁড়ালে চালক-হেলপার থেকে শুরু করে এক শ্রেণির যাত্রীও অপরাধীর পক্ষ নিয়ে ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে হেনস্তা করে।
বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করা মোস্তারি খানম বলছিলেন, ‘সপ্তাহের পাঁচ দিনই গণপরিহনে চেপে অফিস করি। বেশির ভাগ দিনই দেখি, নারীদের সিটে বসে আছের পুরুষেরা। প্রতিবাদ করলে কটু কথা শুনতে হয় বলে কিছুই বলি না। দীর্ঘপথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাই।’
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাসের এই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে ‘অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিজম’ বা পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্ববীক্ষা। যখন কোনো সমাজ, সংস্কৃতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কেবল পুরুষের দৃষ্টিতে পরিচালিত হয়, তখন তাকে অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিজম বলা হয়। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী শার্লট পারকিন্স গিলম্যান ১৯১১ সালে তাঁর বই ‘দ্য মেন মেড ওয়ার্ল্ড অর আওয়ার অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিক কালচার’-এ এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। সেখানে তিনি দেখান যে সমাজের বহু নিয়ম, মূল্যবোধ, জ্ঞান ও প্রতিষ্ঠান পুরুষের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এবং নারীর অভিজ্ঞতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থায় আসন বিন্যাস থেকে শুরু করে নিরাপত্তা নীতি—সবই পুরুষকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো। নারী যাত্রীর সংখ্যা পুরুষদের প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য নগণ্য সংখ্যক সংরক্ষিত আসন রাখা এই অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। যেহেতু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তাই বাসে অশোভন স্পর্শ বা হয়রানি প্রতিরোধের ব্যবস্থাগুলোও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে নড়েচড়ে বসেছে নবগঠিত সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) দেশব্যাপী বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নারী অধিকার ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আধুনিক এই সমাজব্যবস্থায় প্রশ্নটি থেকেই যায়—কেবল আলাদা বাস সার্ভিস কি সমাধান? গণপরিবহনে নারীরা সত্যিই কি কোনোদিন ভয়হীনভাবে যাতায়াত করতে পারবে? প্রতিদিনের অসম্মান, অনিরাপত্তা আর কুৎসিত মানসিকতার যে প্রাচীর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তুলে রেখেছে, তা ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

‘শরীরের লগে ঘেঁইষা বসেছেন কেন?’—বাসে একজন নারী যাত্রীর এই অতি স্বাভাবিক প্রতিবাদের বিপরীতে যখন উত্তর আসে, ‘প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন, বাসে চড়েন কেন? বাসে চড়লে শরীর লাগবোই!’—তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কদর্য রূপ। যুগ বদলালেও গণপরিবহনে নারীকে হেনস্তা করার প্রক্রিয়া ও ধরণ বদলায়নি। বরং নিত্যদিন পুরুষ যাত্রী কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের হাতে নারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক বড় কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, বাসে যাতায়াতের সময় দুই সিটের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে পুরুষরা বসে থাকেন এবং নারীদের জন্য রাখা অল্প অংশে গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করেন। ৪০-৪২ আসনের বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মাত্র ৮টি আসন বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো পুরুষদের দখলেই থাকে। প্রতিবাদ করলে জোটে অশিষ্ট মন্তব্য ও কদর্য প্রশ্ন। অধিকাংশ নারীই কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর তাগিদে মুখ বুজে এই যৌন নির্যাতন ও হয়রানি সহ্য করেন। কোনো দৃঢ়চেতা নারী রুখে দাঁড়ালে চালক-হেলপার থেকে শুরু করে এক শ্রেণির যাত্রীও অপরাধীর পক্ষ নিয়ে ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে হেনস্তা করে।
বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করা মোস্তারি খানম বলছিলেন, ‘সপ্তাহের পাঁচ দিনই গণপরিহনে চেপে অফিস করি। বেশির ভাগ দিনই দেখি, নারীদের সিটে বসে আছের পুরুষেরা। প্রতিবাদ করলে কটু কথা শুনতে হয় বলে কিছুই বলি না। দীর্ঘপথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাই।’
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাসের এই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে ‘অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিজম’ বা পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্ববীক্ষা। যখন কোনো সমাজ, সংস্কৃতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কেবল পুরুষের দৃষ্টিতে পরিচালিত হয়, তখন তাকে অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিজম বলা হয়। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী শার্লট পারকিন্স গিলম্যান ১৯১১ সালে তাঁর বই ‘দ্য মেন মেড ওয়ার্ল্ড অর আওয়ার অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিক কালচার’-এ এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন। সেখানে তিনি দেখান যে সমাজের বহু নিয়ম, মূল্যবোধ, জ্ঞান ও প্রতিষ্ঠান পুরুষের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এবং নারীর অভিজ্ঞতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থায় আসন বিন্যাস থেকে শুরু করে নিরাপত্তা নীতি—সবই পুরুষকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো। নারী যাত্রীর সংখ্যা পুরুষদের প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য নগণ্য সংখ্যক সংরক্ষিত আসন রাখা এই অ্যান্ড্রোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। যেহেতু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তাই বাসে অশোভন স্পর্শ বা হয়রানি প্রতিরোধের ব্যবস্থাগুলোও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে নড়েচড়ে বসেছে নবগঠিত সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) দেশব্যাপী বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নারী অধিকার ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আধুনিক এই সমাজব্যবস্থায় প্রশ্নটি থেকেই যায়—কেবল আলাদা বাস সার্ভিস কি সমাধান? গণপরিবহনে নারীরা সত্যিই কি কোনোদিন ভয়হীনভাবে যাতায়াত করতে পারবে? প্রতিদিনের অসম্মান, অনিরাপত্তা আর কুৎসিত মানসিকতার যে প্রাচীর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তুলে রেখেছে, তা ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
.png)

সম্প্রতি উদয় রহমানের ‘সুর’ নামে একটি গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অনেকদিন পরে বাংলা সাহিত্যের কোনো গল্প নিয়ে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হলো। গল্পটি সত্যিই সাহিত্যমান উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন।
৪৪ মিনিট আগে
মানুষের বুকের ভেতর একটি দেশ থাকে। পাসপোর্ট তার ঠিকানা বদলে দিতে পারে, নাগরিকত্ব নতুন পরিচয় লিখে দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের মানচিত্র কখনো সংশোধিত হয় না। পৃথিবীর দীর্ঘতম যাত্রা এক দেশ থেকে আরেক দেশে নয়; নিজের জন্মভূমি থেকে নিজের ভেতরের মানুষটির কাছে। তাই মহাভারতের যক্ষ যখন প্রশ্ন করেন, ‘কে প্রকৃত সু
৩ ঘণ্টা আগে
পৃথিবীতে এমনও একটি দেশ আছে, যেখানে ট্রেনের দেরি মিনিটে নয়, সেকেন্ডে মাপা হয়। আর সামান্য দেরি হলেও যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চায় রেল কর্তৃপক্ষ। কীভাবে এমন রেলব্যবস্থা গড়ে তুলেছে জাপান?
২২ জুলাই ২০২৬
মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য নিয়ে নানা ধরনের মতভেদ দেখা যায়। কোথাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে মানবমূর্তি নির্মাণে সংযম দেখা যায়, কোথাও আবার জাতীয় বীর, স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ। ফলে ‘মুসলিম দুনিয়ায় ভাস্কর্য নেই’—এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, ত
২২ জুলাই ২০২৬