leadT1ad

শৈত্যপ্রবাহ: কী, কখন ও কেন হয়

দেশের ২০ জেলায় আজ বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। শৈত্যপ্রবাহ কী, এটি কখন হয় ও কতদিন থাকে? বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ হয় ও কেন হয়?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৫৫
চুয়াডাঙ্গায় হেড লাইট জ্বেলে চলাচল করছে যানবাহন। স্ট্রিম ছবি

দেশের ২০ জেলায় আজ বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় আজ শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলমান এই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে আরও কয়েকদিন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানা যাচ্ছে, আজ সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে নরসিংদী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া জেলাসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারী ধরণের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। এর আগের দিন নওগাঁর বদলগাছীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেদিন ছিল এই শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

শৈত্যপ্রবাহ কী

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যখন ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায় এবং এই অবস্থা অন্তত তিনদিন স্থায়ী হয়, তখন তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলা যাবে। অর্থাৎ তাপমাত্রা কমে গেলে তা যদি একদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তবে এটিকে শৈত্যপ্রবাহ বলা যাবে না।

বাংলাদেশে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ সচরাচর খুব বেশি দেখা যায় না। তবে যখন শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয় তখন তা নির্দিষ্ট কিছু এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

বাংলাদেশে কখন শৈত্যপ্রবাহ হয় এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক বলেন, ‘সাধারণত জানুয়ারি মাসে শৈত্যপ্রবাহ বেশি হয়। যদিও অতীতে ডিসেম্বরের শেষদিকেও শৈত্যপ্রবাহ হয়েছে। বিশেষ করে, দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শৈত্যপ্রবাহের আশংকা থাকে।’

শৈত্যপ্রবাহ কত ধরণের হয়ে থাকে

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে শৈত্যপ্রবাহকে চারটি ভাগে ভাগ করেছে:

১. মৃদু শৈত্যপ্রবাহ: তাপমাত্রা যখন ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে তখন এটিকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।

২. মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ: তাপমাত্রা যখন ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এটিকে বলা হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।

৩. তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: তাপমাত্রা যখন ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, এটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।

৪. অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: তাপমাত্রা যখন ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তখন এটিকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।

বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ হয়

বাংলাদেশে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ সচরাচর খুব বেশি দেখা যায় না। তবে যখন শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয় তখন তা নির্দিষ্ট কিছু এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল হলো শৈত্যপ্রবাহপ্রবণ অঞ্চল।

দেশজুড়ে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। এআই নির্মিত ছবি
দেশজুড়ে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। এআই নির্মিত ছবি

আবহাওয়াবিদদের মতে, মূলত রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু, রাঙ্গামাটি শৈত্যপ্রবাহপ্রবণ অঞ্চল।

পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাগঞ্জ, রাজশাহী বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, পাবনা, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, সিলেট, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, সীতাকুন্ডু, গোপালগঞ্জ, সৈয়দপুর, মাদারীপুর অঞ্চলও শৈত্যপ্রবাহে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

কেন এই অঞ্চলগুলোতেই শৈত্যপ্রবাহ হয়

এর পেছনে প্রধানত ভৌগোলিক ও আবহাওয়াজনিত বেশকিছু কারণ রয়েছে। যেমন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর হিমালয় পর্বতমালার খুব কাছে অবস্থিত। শীতকালে হিমালয়ের ওপর দিয়ে বয়ে আসা ভারী ও হিমশীতল বাতাস সরাসরি এই জেলাগুলোতে আঘাত হানে। মাঝখানে এমন কোনো বড় পাহাড় বা বাধা নেই যা এই বাতাসকে আটকাতে পারে। তাই হিমালয়ের ‘ফ্রিজিং এফেক্ট’ সরাসরি এই এলাকায় পড়ে।

এছাড়া, সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার হয়ে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে প্রবেশ করে। চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও যশোর অঞ্চলটি এই বাতাসের গতিপথ বা ‘করিডোর’-এ পড়ে। একারণে চুয়াডাঙ্গা উত্তরের জেলা না হওয়া সত্ত্বেও সেখানে প্রায়ই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

তাপমাত্রা যখন ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তখন এটিকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।

অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সমুদ্রের উষ্ণ জলীয় বাষ্প দক্ষিণের বাতাসকে খুব বেশি ঠান্ডা হতে দেয় না। কিন্তু উত্তরের জেলাগুলো সমুদ্র থেকে অনেক দূরে। ফলে সমুদ্রের এই উষ্ণ প্রভাব সেখানে পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কন্টিনেন্টাল এফেক্ট’।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকা, বিশেষ করে চরাঞ্চলগুলোর মাটি বালুময়। বালুর ধর্ম হলো এটি যেমন দ্রুত গরম হয়, তেমনি দ্রুত তাপ ছেড়ে দিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। রাতে মাটি দ্রুত তাপ হারিয়ে ফেলার কারণে ভোরের দিকে তাপমাত্রা অনেক নিচে নেমে যায়।

শীতকালে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ‘জেট স্ট্রিম’ বা তীব্র গতির বাতাস নিচে নেমে আসলে শীতের তীব্রতা বাড়ে। এছাড়া উত্তরের জেলাগুলোতে ঘন কুয়াশা দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়। দিনের বেলা সূর্য মাটি গরম করতে পারে না, আর রাতে তাপমাত্রা আরও কমে যায়; এই দুইয়ের প্রভাবে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ সৃষ্টি হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত