স্বামীহারা থেকে সমাজহারা: বিধবা নারীদের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ১৮: ৩৬
স্বামীহারা থেকে সমাজহারা: বিধবা নারীদের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রতি বছর ২৩ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস। এমন একটি দিবসও যে ক্যালেন্ডারে আছে তা আমার মতো অনেকেই হয়তো জানেন না। এ বিষয়ে জানতেই একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলাম বিধবা নারী এবং এই দিবস নিয়ে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর ২৩ জুনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ২০০৫ সাল থেকে লুম্বা ফাউন্ডেশন এই দিবসটি পালন করে আসছিল। যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য রাজিন্দর লুম্বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিধবা নারীদের নানা সমস্যা নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে লুম্বা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই দিবসের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে লুম্বার মা।

রাজিন্দর লুম্বার মা ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বিধবা হন। মায়ের সংগ্রামী জীবন কাছ থেকে দেখে তিনি এই ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা পান। ২০০৫ সালে কার্যক্রম শুরু করার পর লুম্বা ফাউন্ডেশন জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ে পাঁচ বছরব্যাপী বৈশ্বিক প্রচারণা চালায়। পরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসকে স্বীকৃতি দেয়।

তৎকালীন সমাজ নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় সমাজ স্বীকার করত না। নারীর পরিচয় নির্ধারিত হতো স্বামী বা পুরুষ সঙ্গীর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। তাই স্বামী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও অবস্থান রাতারাতি বিলীন হয়ে যেত। এ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় পরিবারের কাছে বোঝায় পরিণত হতেন তাঁরা।

মূলত বিধবা নারীদের দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অবিচারের বিষয়গুলো সামনে আনতেই এই দিবসটি পালন করা হয়। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা কখনো সহজ নয়। তাই আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে বিধবাদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। বিশ্বের অনেক দেশে এখনো বিধবাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিছু অঞ্চলে তাদের অশুভ বা জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত বলেও মনে করা হয়।

যুগে-যুগে দেশে-দেশে বিধবাদের দুরবস্থা

অতীতে স্বামী মারা যাওয়ার পর নারীর পৃথিবী রাতারাতি পালটে যেত নরকে। বিধবাদের দেখা হতো অশুভ, অলক্ষুনে হিসেবে। শুভ কাজে তাঁদের উপস্থিতি অমঙ্গল ডেকে আনে বলে বিশ্বাস করা হতো। বিয়ে বা যেকোনো উৎসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হতো। এখনও কিছু সংস্কৃতিতে বিধবাদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বৈষম্যমূলক রীতি দেখা যায়। কোথাও তাঁদের সবার শেষে খেতে ডাকা হয়, কোথাও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয়, আবার কোথাও এমন রীতিও প্রচলিত রয়েছে যা তাঁদের জন্য অসম্মানজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।

ভারতীয় উপমহাদেশে এককালে হিন্দু বিধবাদের রঙিন পোশাক পরা নিষেধ ছিল, নিষিদ্ধ ছিল আমিষ খাওয়া। এককালে স্বামী মারা গেলে চুলও কামিয়ে দেওয়া হতো বিধবাদের।

শুধু অতীতে নয়, আফ্রিকার অনেক আদিবাসী সমাজে এখনও বিশ্বাস করা হয়, স্বামীর মৃত্যুর পেছনে স্ত্রীর কোনো না কোনো হাত রয়েছে। ঘানায় দরিদ্র বিধবাদের অবস্থা এখনো বেশ করুণ। দেশটির কিছু এলাকায় বিধবাদের মৃত স্বামীর দেহাবশেষের অংশ ব্যবহার করে তৈরি করা স্যুপ বা খাবার গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।

ঘানা সরকার বিধবাদের ওপর আরোপিত এসব রীতি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও, অনেক মানুষ এখনো সেসব প্রথা অনুসরণ করে। মৃতদেহকে গোসল দেয়া হয় যে পানি দিয়ে, সেই পানি মৃতের স্ত্রীকে পান করতে দেয়া হয়। যদিও অনেক বিধবা এখন আর এসব রীতি মানেন না। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন এমন বিধবারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না।

পাপুয়া নিউগিনির কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো কোনো পুরুষ হুট করে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে তার দায় চাপানো হয় ঘরের নারীর ওপর। তাঁকে অপবাদ দেওয়া হয় সে জাদুটোনা করে স্বামীকে মেরে ফেলেছে। এরপর চলে অমানবিক নির্যাতন।

কঙ্গো বা উগান্ডার মতো দেশে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে বিধবা নারীদের বাধ্য করা হয় মৃত স্বামীর ভাই বা কোনো অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে রাত কাটাতে, যেন তাঁর ভেতরের ‘অশুভ আত্মা’ দূর হয়।

শুধু আফ্রিকাতেই নয়, ইউরোপের মধ্যযুগীয় সমাজেও এই নির্মমতা দেখা যায়। সেখানে ১৫ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে চার্চ এবং সমাজের প্রভাবশালী পুরুষেরা মিলে ‘উইচ হান্ট’ বা ‘ডাইনি নিধন’ উৎসব শুরু করে। এই শিকারে সবচেয়ে বেশি বলির পাঁঠা বানানো হতো বয়স্ক, নিঃসঙ্গ এবং বিশেষ করে বিধবা নারীদের। কোনো এলাকায় হঠাৎ শিলাবৃষ্টি হলে, ফসল নষ্ট হলে কিংবা গবাদি পশু মারা গেলে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সেই নিঃসঙ্গ বিধবাদের দোষী সাব্যস্ত করা হতো। বিজ্ঞান ও ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তাঁদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন। কখনো তাঁদের হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যদি ভেসে উঠত তবে প্রমাণ হতো তাঁরা ডাইনি! আর তখন তাঁদের প্রকাশ্য বাজারে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো।

আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে বিধবাদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। বিশ্বের অনেক দেশে এখনো বিধবাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিছু অঞ্চলে তাদের অশুভ বা জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত বলেও মনে করা হয়।

কারণ তৎকালীন সমাজ নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় সমাজ স্বীকার করত না। নারীর পরিচয় নির্ধারিত হতো স্বামী বা পুরুষ সঙ্গীর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। তাই স্বামী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও অবস্থান রাতারাতি বিলীন হয়ে যেত। এ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় পরিবারের কাছে বোঝায় পরিণত হতো তাঁরা।

সতীদাহ প্রথার নির্মমতা

প্রাচীন হিন্দু সমাজে বিধবা নারীর ওপর হওয়া অন্যতম অমানবিক রীতি ছিল সতীদাহ প্রথা। খ্রিস্টীয় ৪০০ সালের দিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় থেকেই সতীদাহ প্রথার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এরও আগে এই প্রথার উল্লেখ দেখা যায়। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতে আসা ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুস তক্ষশীলায় সতীদাহের একটি ঘটনা তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। এ ছাড়া খ্রিস্টপূর্ব ৩১৬ সালে গ্রিক জেনারেল ইউমেনেসের এক ভারতীয় সৈন্য মারা গেলে তার দুই স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যান বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তবে সবসময়ই যে নারীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে আগুনে ঝাঁপ দিতেন তা কিন্তু নয়।

সেসময় কোনো পরিবার থেকে একজন নারী সতী হওয়া মানে ছিল বিরাট সম্মানের বিষয়। স্বামীর প্রতি অধীনতা, সতীত্ব ও ধর্মপরায়ণতার পরম লক্ষণ মনে করা হতো এই প্রথাকে। বলা হতো, স্বামীর সঙ্গে সহমরণে গেলে সেই সতী নারী সরাসরি স্বর্গে যাবে।

এ ছাড়া, ছেলের মৃত্যুর পর তার বউ বাড়িতে থাকা মানেই ছিল শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছে বাড়তি এক আপদ। স্বভাবতই সব পরিবার চাইত তাদের বউটিও সহমরণে যাক। কিন্তু দেখা যেত অনেক ছোট বয়সে মেয়েরা বিধবা হয়ে গেছে। স্বামীর মৃত্যুতে তারা হতবিহ্বল হলেও কান্নার সময় পেত না। অনেক নারীরা চিতায় ওঠার শেষ মুহূর্তে এসে তীব্র ভয় পেয়ে বেঁকে বসতো। আসলে খুব কম নারীই ছিল যারা পরকালের মোহে পড়ে আগুনের দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যেত।

চিতার আগুন ছুঁয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নারী চিৎকার করে কাঁদত, ছেড়ে দিতে বলত। এই কান্নার আওয়াজ যেন বাইরে কেউ না শোনে, তাই শবযাত্রীরা দল বেঁধে ঢোল, মাদল ও বাঁশির কানফাটা আওয়াজে চারপাশ ভরিয়ে তুলত। অনেকে চিতা থেকে উঠে পালানোর চেষ্টা করলে বড় বাঁশ দিয়ে তাদের আবার আগুনের ভেতর চেপে ধরে রাখা হতো। অনিচ্ছুক মেয়েদের আগে থেকেই জোর করে আফিম জাতীয় কড়া ওযুধ খাওয়ানো হতো, যেন তারা নেশার ঘোরে চিতার ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে।

কাউকে আবার মাথার পেছন দিকে শক্ত লাঠি দিয়ে আঘাত করে অবশ করে ফেলা হতো। তবে লক্ষ্য রাখা হতো আঘাত যেন আবার এত জোরে না হয় যাতে মেয়েটা ওখানেই মরে যায়। কারণ প্রথার নীতি অনুযায়ী জীবিত মানুষকে আগুনের শিখায় পোড়াতে হবে। তাহলেই স্ত্রী পরবর্তী জন্মে উঁচু বংশে জন্মাতে পারবে, আর ভাগ্য ভালো হলে এই স্বামীর স্ত্রী হয়েই আবার জন্ম নেবে। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার নারীকে জীবিত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে স্বামীর চিতায়।

সহমরণে যাওয়ার কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিয়মও তৈরি করে রাখা হয়েছিল। এর মাঝে ছিল যারা সহমরণে যেতে পারবে না তাদের তালিকা। যেমন যদি কোনো নারীর সন্তান এতই ছোট হয় যে নিজের দেখাশোনা করতে পারে না, যদি কোনো নারীর ঋতুঃস্রাবের সময় স্বামী মারা যায় কিংবা যদি তার গর্ভে সন্তান থাকে। শিশুর মাকে সহমরণে যেতে না দেওয়ার নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। বাদশাহরা নিয়ম করেন, কাউকে দিয়ে সতীদাহ পালন করাতে হলে আগে রাজদরবারের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু বাদশাহরা যেহেতু মাঠপর্যায়ে নিজে অনুসন্ধানে নামতেন না, প্রজাদের ঘরের সুখ-দুঃখের সাথে মিশে যেতে পারতেন না, তাই স্বামীর লোভী পরিবার স্থানীয় কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে অনুমতি আদায় করে নিত।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত