leadT1ad

১৮৬ বছর আগের যে ঘটনা বদলে দিয়েছিল ভারতবর্ষের চা-শিল্পের ইতিহাস

আজ থেকে ১৮৬ বছর আগের কথা। ১৮৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি। লন্ডনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘মিনিসিং লেন’-এর আসামের চা পাতা প্রথম নিলামে তোলা হয়। সেদিন থেকে চা আর শুধু চীনের রইল না। চায়ের জন্য গুপ্তচরবৃত্তিও হয়েছিল, শেষে জন্ম নিল আমাদের এই অঞ্চলের চা শিল্প।

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ০৬
ছবি: সংগৃহীত

১৮৬ বছর আগের কথা। ১৮৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি। লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল। সুদূর ভারতবর্ষ থেকে ‘ক্যালকাটা’ নামের জাহাজে আসা এমন এক পণ্য নিলামে উঠতে যাচ্ছে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনীতি পরিবর্তনে বিরাট ভুমিকা রাখতে পারে। সেই পণ্যটি ছিল ভারতের আসামের জঙ্গল থেকে আসা ‘চা পাতা’। চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশের মাটিতে উৎপাদিত চা যে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে, তা প্রমাণের দিন ছিল সেটি।

বিকল্প পথের সন্ধানে

সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই ব্রিটিশদের কাছে চা একটি জনপ্রিয় পানীয় হয়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পরও ইংরেজ সাহেবদের চা-পানের অভ্যাস যে অটুট ছিল, তা বোঝা যায় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সের ক্যাপ্টেন জর্জ ফ্রাঙ্কলিন অ্যাটকিনসনের আঁকা ছবি (১৮৬০) থেকে। যার শিরোনাম ‘স্টেশনের কর্নেল সাহেব’। ছবিটি দেখে বোঝা যায়, সাহেবকে চা পরিবেশন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বইটিতে আরও চারবার চা পান ও টি-পার্টির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু সমস্যা ছিল একটিই। তা হলো, বিশ্বজুড়ে চায়ের একমাত্র জোগানদাতা ছিল চীন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে চা কিনতে হতো। পরবর্তী সময়ে তারা এর বিনিময়ে আফিম বিক্রি শুরু করলেও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সবসময়ই নড়বড়ে ছিল।

আফিম যুদ্ধের জের ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার হারায়। তখন তারা বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে। চা-এর জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে যে, গোয়েন্দাগিরির মতো এক মারাত্মক ফন্দি আঁটে ব্রিটিশরা। যা ইতিহাসে ‘ ব্রিটিশ টি রবারি’ নামে খ্যাত।

রবার্ট ফরচুন নামে একজন স্কটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানীকে চীনা পোশাক পরিয়ে বিদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ চীনের এমন চা–অঞ্চলে পাঠানো হয়। ফরচুন গভীরভাবে সেখানে চা উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করেন এবং যথেষ্ট পরিমাণ চায়ের বীজ নিয়ে ফেরত আসেন। করপোরেট গুপ্তচরবৃত্তির এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক সারাহ রোজ লিখেছেন ‘ফর অল দ্য টি ইন চায়না: হাও ইংল্যান্ড স্টোল দ্য ওয়ার্ল্ডস ফেবারিট ড্রিংক অ্যান্ড চেঞ্জড হিস্ট্রি’ (২০১০)। যেখানে বিষ্ময়ে হতবাক লেখিকা বইটির শুরুতেই লিখেছেন ‘দ্য টাস্ক রিকয়ার্ড এ প্ল্যান্ট হান্টার, এ গার্ডেনার, এ থিফ, এ স্পাই’।

১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চা–বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ভারতীয় চা-ই ইউরোপে চীনের চাহিদার ভিতকে একেবারে নড়িয়ে দিয়েছিল।

ফরচুন চীন থেকে শুধু বীজ এবং চারাই আনেননি, সঙ্গে করে একদল প্রশিক্ষিত চীনা চা–শ্রমিককেও নিয়ে যান। কিন্তু আবহাওয়া ও মাটির পার্থক্যের কারণে সেই প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হতে থাকে। কারণ তখনও ব্রিটিশরা জানত না, ভারতের আসামের গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা চায়ের জাত।

আসামের জঙ্গল ও ব্রুস ভাইদের অভিযান

ভারতীয় উপমহাদেশের চা শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দুই স্কটিশ সহোদরের নাম। রবার্ট ব্রুস ও চার্লস আলেকজান্ডার ব্রুস। রবার্ট ব্রুস ছিলেন একজন ভাগ্যান্বেষী বণিক ও অভিযাত্রী। ১৮২৩ সালে তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসামের রংপুরে (তৎকালীন আহোম রাজ্যের রাজধানী) যান। সেখানে গিয়ে তিনি স্থানীয় ‘সিংফো’ উপজাতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন।

রবার্ট দেখেন, সিংফোরা জঙ্গল থেকে এক ধরণের বুনো গাছের পাতা সংগ্রহ করে, তা রোদে শুকাচ্ছে। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে একটি পানীয় তৈরি করে খাচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলত ‘ফলাপ’।

রবার্ট ব্রুস সিংফো দলপতি বিসা গাম-এর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। বিসা গাম রবার্টকে জঙ্গলের সেই বুনো ঝোপগুলো দেখান। রবার্ট উদ্ভিদবিদ না হলেও তাঁর জহুরির চোখ চিনতে ভুল করেনি যে, এটিই সেই কাঙ্ক্ষিত চা গাছ। তিনি বিসা গামের সঙ্গে চুক্তি করেন যাতে ভবিষ্যতে তিনি এই গাছের চারা ও বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই আবিষ্কারকে পূর্ণতা দেওয়ার আগেই ১৮২৪ সালে রবার্ট ব্রুস মৃত্যুবরণ করেন।

১৯০৩ সালে আসামের চা বাগান। ছবি: বউন সিফার্ড
১৯০৩ সালে আসামের চা বাগান। ছবি: বউন সিফার্ড

রবার্টের মৃত্যুর পর তাঁর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নেন ছোট ভাই চার্লস আলেকজান্ডার ব্রুস। চার্লস ছিলেন ব্রিটিশ গানবোটের একজন কমান্ডার, যিনি অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় আসামে অবস্থান করছিলেন। ভাইয়ের ডায়েরি ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি আবার বিসা গামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চার্লস জঙ্গল থেকে চায়ের চারা ও বীজ সংগ্রহ করে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে পাঠান।

কিন্তু তৎকালীন বিখ্যাত ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. ন্যাথানিয়েল ওয়ালিচ প্রথমে এই চারাগুলোকে ‘চা গাছ’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর ধারণা ছিল, চীনের চা গাছই একমাত্র আসল চা, আর আসামের এই গাছগুলো ক্যামেলিয়া গোত্রের অন্য কোনো বুনো প্রজাতি। এই অবহেলায় কেটে যায় আরও কয়েক বছর।

টি কমিটি গঠন

লর্ড বেন্টিঙ্ক ১৮৩৪ সালে ভারতে চা চাষের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য একটি ‘টি কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটি চীন থেকে চারা এনে আসামে রোপণ করে, কিন্তু সেগুলো আসামের তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মরে যায়। অন্যদিকে, চার্লস ব্রুস প্রমাণ করে দেখান যে আসামের স্থানীয় বুনো চা গাছগুলোই ওই পরিবেশে দিব্যি বেড়ে উঠছে এবং স্বাদও চমৎকার। অবশেষে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা স্বীকার করতে বাধ্য হন, আসামের গাছটি চা পাতার নিজস্ব একটি প্রকরণ এবং এটি চীনের চায়ের চেয়েও কড়া লিকার দিতে সক্ষম।

শুরু হয় চার্লস ব্রুসের এক নতুন সংগ্রাম। আসামের গহীন জঙ্গলে, বাঘ-ভাল্লুক আর ম্যালেরিয়ার ভয় উপেক্ষা করে তিনি স্থানীয়দের নিয়ে চায়ের বাগান তৈরি শুরু করেন। চীনা পদ্ধতি অনুসরণ করে চা পাতা প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থাও তিনি করেন।

১৮৩৮ সা্লে চার্লস ব্রুসের তত্ত্বাবধানে আসামের বাগান থেকে তোলা পাতা দিয়ে প্রস্তুত করা হয় চায়ের প্রথম বাণিজ্যিক চালান। মোট ১২টি বড় সিন্দুক বা ‘চেস্ট’ ভর্তি করা হয় এই চা দিয়ে। চা ভর্তি সিন্দুকগুলো প্রথমে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে নৌকায় করে কলকাতায় আনা হয়। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর, ১৮৩৮ সালের নভেম্বর মাসে ‘ক্যালকাটা’ নামক জাহাজে করে এই সিন্দুকগুলো লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

রবার্ট দেখেন, সিংফোরা জঙ্গল থেকে এক ধরণের বুনো গাছের পাতা সংগ্রহ করে, তা রোদে শুকাচ্ছে। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে একটি পানীয় তৈরি করে খাচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলত ‘ফলাপ’।

দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ৪ মাস পর জাহাজটি লন্ডনে পৌঁছায়। তবে যাত্রাপথে কিছু চা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ৮টি সিন্দুক (মতান্তরে কিছু কম-বেশি) নিলামের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

১৮৬ বছর আগে আজকের দিনেই চা পাতার নিলাম

১৮৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি। লন্ডনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘মিনিসিং লেন’-এর কমার্শিয়াল সেল-রুমসে চা পাতার নিলাম ডাকা হয়। সেদিনের নিলামের নায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন পিডিং। তিনি অত্যধিক চড়া দামে আসামের চায়ের একটি বড় অংশ কিনে নেন। শোনা যায়, তিনি প্রতি পাউন্ড চায়ের জন্য সাধারণ চায়ের দামের প্রায় ২০-৩০ গুণ বেশি দাম হেঁকেছিলেন।

১৮৩৯ সালের এই সফল নিলামের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। লন্ডনের বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, ভারতের মাটিতেই সোনা ফলানো সম্ভব। চায়ের জন্য আর চীনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। এই ঘটনার মাত্র এক মাসের মধ্যে লন্ডনে গঠিত হয় ‘দ্য আসাম কোম্পানি’। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম জয়েন্ট স্টক টি কোম্পানি।

১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চা–বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ভারতীয় চা-ই ইউরোপে চীনের চাহিদার ভিতকে একেবারে নড়িয়ে দিয়েছিল।

দিনাক সোহানি কবিরের লেখা ‘পূর্ববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭’ থেকে জানা যায়, ১৮৭৯ সালে ব্রিটেন ৩৪ মিলিয়ন পাউন্ড ভারতীয় চা আমদানি করে। একই সময়ে ব্রিটেন ১২৬ মিলিয়ন পাউন্ড চা আমদানি করে চীন থেকে। অথচ পরবর্তী এক দশকেই এ চিত্র পাল্টে যায়। ১৮৯০ সালে ব্রিটেন চীন থেকে ৫৭ মিলিয়ন পাউন্ড চা আমদানি করে। একই সময়ে ব্রিটেন ১০১ মিলিয়ন পাউন্ড চা আমদানি করে ভারত থেকে। পরবর্তী সময়ে ১৯১৫ সালে ১৮২ মিলিয়ন পাউন্ড ভারত থেকে কিন্তু মাত্র ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড চীন থেকে আমদানি করে।

কালের পরিক্রমায় চা এখন আর অভিজাত কোনো খাবার নয়। দুধ চা, ‘র’ চা, লেবু চা, মরিচ চা, মাল্টা চা, তেঁতুল চা, শাহি চা, মসলা চা, মালাই চা, মটকা চাসহ হরেক পদের আরও চা পাওয়া যায় দেশের আনাচকানাচে। সারা পৃথিবীতে চায়ের এই সহজলভ্যতার পথ খুলে দিয়েছিলো ১৮৩৯ সালের আজকের এই দিনটি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত