সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১ বছর

কতটা বদলেছে সাঁওতালদের ভাগ্য

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১৬: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক

সাঁওতালদের বঞ্চনার গল্পটা বেশ পুরনো। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ গণঅভ্যুত্থান হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয়। জমি, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে সিধু, কানহু, চাঁদ ও ভৈরব মুর্মুর নেতৃত্বে হাজারো সাঁওতাল ব্রিটিশ শাসন, জমিদারি শোষণ ও মহাজনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। সেই সংগ্রাম শুধু একটি বিদ্রোহ ছিল না, ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক। তারপর ১৭১ বছর পেরিয়ে গেলেও উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামের গল্প খুব একটা বদলায়নি।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি এলেও ভূমি হারানোর শঙ্কা, উচ্ছেদের অভিযোগ, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার বাস্তবায়ন এখনো তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

একসময় জমি ছিল সাঁওতালদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু ভূমি হারানো, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে থাকা এবং কর্মসংস্থানের সংকট তাদের জীবনকে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে সাঁওতাল সমাজে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। তারপরও মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে এখনো।

বাংলাদেশে সরকারি জনশুমারি অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টিরও বেশি। এর মধ্যে সমতলের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী সাঁওতাল। তাদের প্রধান বসতি দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, জয়পুরহাট, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও ও রংপুর অঞ্চলে। কৃষিকাজ, দিনমজুরি এবং মৌসুমি শ্রমনির্ভর জীবনই এখনও অধিকাংশ পরিবারের প্রধান অবলম্বন। তবে গত এক দশকে তাদের জীবিকায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে মৌসুমি শ্রমের চাহিদা কমেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পোশাকশিল্প, নির্মাণখাত, নিরাপত্তাসেবা ও অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। অনেক পরিবার এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ পাচ্ছে, গ্রামে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ব্যবহারও বেড়েছে। কিন্তু শহরমুখী এই অভিবাসনের ফলে পারিবারিক বন্ধন ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এডুকেশন স্ট্যাটাস অব দ্য সান্তাল কমিউনিটি ইন নর্দান বাংলাদেশ: এ কেস স্টাডি শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি উপবৃত্তি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে সাঁওতাল শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে দারিদ্র্য, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার অভাব, অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়া এবং মাধ্যমিকের পর ঝরে পড়া এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষকরা মনে করেন, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ ছাড়া শিক্ষার এই অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদি হবে না।

উচ্চশিক্ষায়ও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমে এখন সাঁওতাল তরুণদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেশি। তাদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস তুলে ধরছেন। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আত্মপরিচয়ের বোধ শক্তিশালী হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে অধিকাংশ সাঁওতাল পরিবার কেবল কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও এখন অনেকে ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও কারিগরি পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিও কিছু পরিবারকে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে সহায়তা করেছে। তবুও ভূমিহীনতা এবং মৌসুমি বেকারত্ব এখনো বড় বাস্তবতা।

নারীদের অবস্থারও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে তারা মূলত কৃষিশ্রম ও গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পোশাকশিল্পের কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার হারও বেড়েছে। তবে মজুরি বৈষম্য, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে।

সাঁওতালদের সবচেয়ে বড় সংকট ভূমির অধিকার। বিশেষ করে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, দিনাজপুর, নওগাঁ, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে বহু বছর ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আয়োজিত সমাবেশেও সাঁওতাল নেতারা আবারও জমি ফেরত, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রভাবশালী মহলের দখলের কারণে বহু পরিবার এখনও নিজস্ব জমিতে ফিরতে পারেনি।

২০২৬ সালেও সেই সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সম্প্রতি ভূমি অধিকার রক্ষায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ নিয়ে করা এক রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আদালত জানতে চান, কেন সাঁওতালদের ভূমির অধিকার রক্ষা করা হয়নি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়নি। এই ঘটনা দেখায়, বিষয়টি এখন শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের বাংলাদেশ ভূমি ও সম্পদ সংঘাত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ভূমি নিয়ে সংঘাত এখনো ব্যাপক আকারে বিদ্যমান। শুধু ২০২৫ সালেই ৬৪টি বড় ভূমি ও সম্পদ সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৭৮ হাজার ৯৮১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্বল ভূমি প্রশাসন, মালিকানার অনিশ্চয়তা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলদারিকে এসব সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাস্তবতা সাঁওতালসহ সমতলের আদিবাসীদের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়।

অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়েও ভূমি বিরোধের জটিলতা স্পষ্ট। গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদের এক প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ২ লাখ ৮১ হাজার ৬৫৯টি ভূমি-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। যদিও সরকার ভূমি সেবা ডিজিটালাইজেশন, ই-পর্চা, অনলাইন নামজারি ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সম্প্রতি কিছু এলাকায় নতুন করে হামলা ও উচ্ছেদের অভিযোগও সামনে এসেছে। জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা বারবার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা দুই ক্ষেত্রেই সাঁওতাল পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। এ প্রসঙ্গে ভূমি অধিকার সংগঠন এএলআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার রফিক আহমেদ সিরাজী গত বছর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘সাঁওতালদের ভোগ-দখলীয় জমিতে জোরপূর্বক দখল ও হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এখনো হয়নি। তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত না হলে এ ধরনের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।’

গবেষকেরাও মনে করেন, সাঁওতালদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিরাপদ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়া। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভূমি দখল শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি তাদের সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামষ্টিক জীবনব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই শিক্ষা বা ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও জমির অধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত