সম্প্রতি বিশ্ব রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছেন গত বছর শান্তিতে নোবেল পাওয়া ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের হাতে এই পদক তুলে দেন তিনি। ব্যাপারটি এখন তুমুল আলোচনায়।
এরপর এক বিবৃতিতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি জানিয়েছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান পেয়েছেন, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই পুরস্কারটি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে। তবে পদকটি হস্তান্তর করা যেতে পারে। তাই পদক, সনদ বা পুরস্কারের অর্থের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে নথিভুক্ত হবেন, তিনি বা সেই প্রতিষ্ঠানই মূল বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত থাকবেন।
এই ঘটনায় মনে প্রশ্ন জাগে, এমনটা কি আগেও হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ রাখতে হয় নোবেল ইতিহাসের পাতায়। সেখানে দেখা যায়, উপহার দেওয়া ছাড়াও নোবেল পুরস্কারকে ঘিরে রয়েছে এমন সব ঘটনা, যা রীতিমতো চমকপ্রদ।
ট্রাম্পকে নিজের নোবেল পদক উপহার দিলেন মাচাদো। ছবি: সংগৃহীতনাৎসিদের চোখ ফাঁকি দিতে তরলে বদলে গেল নোবেল পদক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি ঘটনা নোবেল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। তখন হিটলারের নাৎসি বাহিনী ডেনমার্ক দখল করে নিয়েছে। ইহুদি ও জার্মান বিজ্ঞানীদের ওপর ছিল কড়া নজরদারি। নির্দেশ ছিল জার্মান নাগরিকরা কোনোভাবেই নোবেল পুরস্কার গ্রহণ বা সংরক্ষণ করতে পারবেন না।
ঠিক সেই সময় কোপেনহেগেনে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোরের গবেষণাগারে রাখা ছিল দুজন জার্মান নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ম্যাক্স ভন লাউ ও জেমস ফ্রাঙ্কের সোনার নোবেল মেডেল। নাৎসিদের হাতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল ভয়াবহ।
এই সংকটময় মুহূর্তে এক অভিনব বুদ্ধি বের করেন হাঙ্গেরিয়ান রসায়নবিদ জর্জ ডি হেভেসি। তিনি ভাবলেন, সোনা লুকানোর সেরা উপায় হলো একে তরল বানিয়ে ফেলা! তিনি ‘অ্যাকুয়া রিজিয়া’ বা ‘অম্লরাজ’ নামে পরিচিত অ্যাসিডে মেডেল দুটি ডুবিয়ে দেন। ধীরে ধীরে সোনার মেডেল গলে পরিণত হয় কমলা রঙের তরলে।
নাৎসি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে যেদিন গায়েব হলো নোবেল। ছবি: সংগৃহীতসেই তরল ভর্তি বোতল তিনি ল্যাবরেটরির সাধারণ একটি তাকেই রেখে দেন। যুদ্ধ শেষে সেই তরল থেকে আবার সোনা আলাদা করা হয় এবং নোবেল কমিটি সেই সোনা দিয়েই নতুন করে মেডেল বানিয়ে বিজ্ঞানীদের ফিরিয়ে দেয়।
নিলামে তোলার ইতিহাস
নোবেল পুরস্কার সংরক্ষণের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে তা নিলামে তোলার ইতিহাসও। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে, তখন ডেনিশ বিজ্ঞানী নিলস বোর ফিনল্যান্ডের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের নোবেল স্বর্ণপদকটি নিলামে তোলেন এবং সেই অর্থ দান করেন ‘ফিনিশ যুদ্ধ-ত্রাণ’ তহবিলে।
এই ত্যাগের ধারাবাহিকতা দেখা যায় সাম্প্রতিক সময়েও। ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ তাঁর নোবেল পদকটি নিলামে তোলেন। নিউইয়র্কে সেটি রেকর্ড ১০ কোটি ৩৫ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। পুরো অর্থ তিনি ইউনিসেফের মাধ্যমে ইউক্রেনের শিশু শরণার্থীদের কল্যাণে দান করেন। নোবেল ইতিহাসে এটি মানবিক ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।
নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে দেওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থও অনেক সময় মানবসেবায় উৎসর্গ করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পাওয়া মাদার তেরেসা পুরস্কারের অর্থ পুরোটা দান করে দেন তাঁর ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ সংস্থায়। এই অর্থ দিয়ে কুষ্ঠরোগী, অনাথ শিশু ও মৃত্যুপথযাত্রী দরিদ্র মানুষদের জন্য আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
নোবেল চুরি
ইতিহাসে নোবেল পুরস্কার নিলামে তোলার ঘটনা যেমন আছে, দুর্ভাগ্যবশত মহামূল্যবান এই পুরস্কারটি চুরি যাবার ঘটনাও রয়েছে। ২০০৪ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রভবন জাদুঘর থেকে চুরি হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পদকটি। এটি ছিল নোবেল ইতিহাসের অন্যতম বড় চুরির ঘটনা। সিবিআই দীর্ঘ তদন্ত করেও সেই আসল মেডেল আর উদ্ধার করতে পারেনি। পরে নোবেল কমিটি রবীন্দ্রনাথের প্রতি সম্মান জানিয়ে রেপ্লিকা বা নকল মেডেল তৈরি করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ ও নোবেল। ছবি: সংগৃহীততবে শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, বিখ্যাত জার্মান লেখক এরিখ মারিয়া রেমার্ক, যিনি ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ লিখে শান্তি বা সাহিত্যের বার্তা দিয়েছিলেন, তাঁর নোবেলটিও চুরি গিয়েছিল। তবে তা পরে উদ্ধার করা হয়।
একই পরিবারে পাঁচটি নোবেল
নোবেল ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি হলো কুরি পরিবার। বিজ্ঞানী মেরি কুরি ও তাঁর স্বামী পিয়ের কুরি ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। পরে ১৯১১ সালে মেরি কুরি আবারও রসায়নে নোবেল অর্জন করেন। তাঁদের মেয়ে আইরিন জুলিও-কুরি ও জামাই ফ্রেডরিক জুলিও ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পান। একই পরিবারে চারজন সদস্য, মোট পাঁচটি নোবেল, ইতিহাসে এমন নজির আর নেই।
নোবেল নিতে অস্বীকৃতি
ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই পুরস্কার নিজ ইচ্ছায় গ্রহণ করেননি, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক চাপে নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত নাম জাঁ-পল সার্ত্র।
১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল জেতেন এই ফরাসি দার্শনিক ও লেখক। কিন্তু তিনি শুরুতেই নোবেল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। সার্ত্রের মতে, কোনো লেখককে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান দিয়ে ‘প্রতিষ্ঠানের অংশ’ বানিয়ে ফেলা উচিত নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় যখন তাকে কোনো পুরস্কারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অবস্থানে বসিয়ে দেওয়া হয়।
আরেকটি ঘটনা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক বাধার ফল। ১৯৩৫ সালে শান্তিতে নোবেল পান জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিকর্মী কার্ল ভন ওসিয়েতস্কি। তিনি নাৎসি সরকারের সমালোচনার জন্য তখন জার্মান কারাগারে বন্দি ছিলেন। হিটলারের নির্দেশে তাঁকে নোবেল গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এই ঘটনাকে নাৎসি জার্মানির মানবাধিকার দমননীতির এক নগ্ন উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
১৯৭৩ সালে শান্তিতে নোবেল পান ভিয়েতনামের কূটনীতিক লে দুক থো। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে যৌথভাবে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকার জন্য। কিন্তু লে দুক থো নোবেল নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ভিয়েতনামে তখনো প্রকৃত শান্তি আসেনি। শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে শান্তির পুরস্কার নেওয়া তাঁর কাছে অর্থহীন।
আরেকটি রাজনৈতিক চাপের উদাহরণ পাওয়া যায় সোভিয়েত ইউনিয়নে। ১৯৫৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পান রুশ লেখক বরিস পাস্তেরনাক। প্রথমে তিনি আনন্দের সঙ্গে পুরস্কার গ্রহণের ঘোষণা দিলেও পরে সোভিয়েত সরকারের প্রবল চাপ ও হুমকির মুখে নোবেল প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। তাঁর লেখা উপন্যাস ডক্টর জিভাগো সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা করায় এই প্রতিক্রিয়া আসে। অনেক পরে ১৯৮৯ সালে তাঁর ছেলে ইয়েভগেনি বাবার পক্ষে মেডেল গ্রহণ করেন।