স্ট্রিম ডেস্ক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির মাত্র এক মাস বাকি। আজ থেকে ১৬৯ বছর আগে, ১৮৫৫ সালের জুনের শেষ দিন এই উপমহাদেশে ঘটে গিয়েছিল আরেক অভ্যুত্থান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত গণসংগ্রাম সাওতাঁল বিদ্রোহ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের জনপদের প্রথম সেই অভ্যুত্থানের প্রেরণা রাজনীতি থেকে শুরু করে ছড়িয়ে পড়েছিল এই অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য ও সিনেমায়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের সেই রেশ ধরে নন্দিত বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ সিনেমার সংলাপে উঠে এসেছিল এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা। ‘জানোয়ার আর মহাজন তো একই, দুটোই জীবন বরবাদ করার জন্য লেগে আছে’।
এক সময় মূলধারার ইতিহাস বক্তারা সাঁওতালদের যেভাবে ‘আদিম’ ও ‘বনের’ লোক হিসেবে লোকচক্ষুর আড়াল করতে চাইতো, সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল সেই ইতিহাসের বিপরীতে এক মোক্ষম জবাব। অত্যাচারী মহাজন ও কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহই সাঁওতালদের নিয়ে এসেছিল ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভারতের ভগনাডিহি গ্রামে ১০ হাজার সাওতাঁল কৃষকের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন দুই বিদ্রোহী সহোদর—সিধু ও কানু। তাঁদের দাবি ছিল মহাজনদের কাছ থেকে ভূমি আর মানুষের মুক্তি। সমাবেশের পর ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থদের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়। কিন্তু দারিদ্র্য সাঁওতালদের সহজ-সরল চিঠির বাক্যে মন গলে না কর্তাদের। চিঠির উত্তর না পেয়ে নিজেদের শেষ রাস্তা বেছে নিতে বাধ্য হন সাঁওতালরা। শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ।
সময়টা ১৭৯০ সাল। মুর্শিদাবাদ ও ভাগলপুর অঞ্চলের বিরানভূমিতে প্রাণের জোয়ার এনেছিল সাওতাঁলরা। ফসলে ফসলে ভরে উঠেছিল সাওতাঁল জনপদ। তবে ফসল ঘরে তোলার আগেই তাতে নজর লাগে বনের পশু ও ক্ষমতাধর মহাজনদের।
গরুর গাড়ি বোঝাই করা ফসল নিয়ে যেত মহাজনের লোকেরা। বিনিময়ে কৃষকেরা পেতো খুবই সামান্য মজুরি। একদিকে দাম কম, অন্যদিকে ফসল মাপার বাটখারা নিয়েও করা হতো কারচুপি। পরিমাণের চেয়ে কম দেখানো হতো ওজন।
কৃষকেরা যে এসব ছলচাতুরী টের পেতো না, তা নয়। কিন্তু তাঁরা ছিল নিরুপায়। ফসল ফলানোর আগে মহাজনদের থেকে নেয়া ঋণের চাপে তাঁদের কাছে সর্বস্ব বেচতে একপ্রকার বাধ্যই হতো কৃষকেরা। তবে পেটে কিংবা পিঠে, কোনোকিছুই চিরকাল সয় না। ফলে মহাজনদের জোচ্চুরির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল অনিবার্য।
এই অনিবার্য বিদ্রোহ দমন করতে ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো জারি করা হয়েছিল সামরিক আইন। ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুকের গুলি ও কামানের গোলার সামনে সাঁওতালদের তীর-ধনুকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে তা হয়েও ওঠেনি। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন থেকে প্রায় আট মাস ধরে চলে লড়াই। ব্রিটিশেরা এগিয়ে যায় যুদ্ধের ময়দানে। কিন্তু লড়াইয়ের কোনো মীমাংসা না করেই ব্রিটিশেরা বেছে নেয় নিরস্ত্র সাঁওতালদের হত্যার পথ। সাঁওতাল সমাজে হুঁল হিসেবে পরিচিত ও লড়াইয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল জনপদটির ২৫ হাজার মানুষকে।
ব্রিটিশদের বিরদ্ধে ওই লড়াইয়ের ফলাফলের চেয়ে ‘লড়াই’ করার হিম্মতই পরে হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।
‘উলগুলানের শেষ নাই’
মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’ বইয়ে ভূমি ফিরে পেতে বিরসা মুন্ডা বলেছিলেন ‘উলগুলানের শেষ নাই’ (লড়াইয়ের শেষ নাই)। অরণ্যকে ফিরে পেতে, জুলুমের বিরুদ্ধে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন সিধু, কানু, বিরসারা।
এই জনপদে উলগুলান বা হুলের শেষ হয়নি। দেড় শ বছর পরেও টিকে আছে বৈষম্য। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে গত জুলাইতে বাংলার মাটিতে হয়েছে আরেক বিদ্রোহ, আরেক অভ্যুত্থান। ঝরে গেছে শত শত তরুণ প্রাণ। পতন হয়েছে শাসক শেখ হাসিনার। তবে নির্মম পরিহাস এই যে, সিধু-কানুর যে বিদ্রোহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এই অঞ্চলের সব অভ্যুত্থানকে, দিনাজপুর থেকে সেই বিদ্রোহের দুই বরপুত্র সিধু-কানুর ভাস্কর্যই ভেঙে ফেলা হয়েছিল বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর। তবে সিধু-কানুর হুল বা হিম্মত যেহেতু ভাস্কর্য বা কোনো কারুকার্যে বন্দী থাকার ব্যাপার নয়। তাই বলাই যায়-ভাস্কর্য থাকুক বা না থাকুক, সিধু-কানুর শিক্ষা যুগ যুগ ধরে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে যাবে সকল বৈষম্যের বিরদ্ধে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির মাত্র এক মাস বাকি। আজ থেকে ১৬৯ বছর আগে, ১৮৫৫ সালের জুনের শেষ দিন এই উপমহাদেশে ঘটে গিয়েছিল আরেক অভ্যুত্থান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত গণসংগ্রাম সাওতাঁল বিদ্রোহ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের জনপদের প্রথম সেই অভ্যুত্থানের প্রেরণা রাজনীতি থেকে শুরু করে ছড়িয়ে পড়েছিল এই অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য ও সিনেমায়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের সেই রেশ ধরে নন্দিত বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ সিনেমার সংলাপে উঠে এসেছিল এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা। ‘জানোয়ার আর মহাজন তো একই, দুটোই জীবন বরবাদ করার জন্য লেগে আছে’।
এক সময় মূলধারার ইতিহাস বক্তারা সাঁওতালদের যেভাবে ‘আদিম’ ও ‘বনের’ লোক হিসেবে লোকচক্ষুর আড়াল করতে চাইতো, সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল সেই ইতিহাসের বিপরীতে এক মোক্ষম জবাব। অত্যাচারী মহাজন ও কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহই সাঁওতালদের নিয়ে এসেছিল ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভারতের ভগনাডিহি গ্রামে ১০ হাজার সাওতাঁল কৃষকের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন দুই বিদ্রোহী সহোদর—সিধু ও কানু। তাঁদের দাবি ছিল মহাজনদের কাছ থেকে ভূমি আর মানুষের মুক্তি। সমাবেশের পর ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থদের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়। কিন্তু দারিদ্র্য সাঁওতালদের সহজ-সরল চিঠির বাক্যে মন গলে না কর্তাদের। চিঠির উত্তর না পেয়ে নিজেদের শেষ রাস্তা বেছে নিতে বাধ্য হন সাঁওতালরা। শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ।
সময়টা ১৭৯০ সাল। মুর্শিদাবাদ ও ভাগলপুর অঞ্চলের বিরানভূমিতে প্রাণের জোয়ার এনেছিল সাওতাঁলরা। ফসলে ফসলে ভরে উঠেছিল সাওতাঁল জনপদ। তবে ফসল ঘরে তোলার আগেই তাতে নজর লাগে বনের পশু ও ক্ষমতাধর মহাজনদের।
গরুর গাড়ি বোঝাই করা ফসল নিয়ে যেত মহাজনের লোকেরা। বিনিময়ে কৃষকেরা পেতো খুবই সামান্য মজুরি। একদিকে দাম কম, অন্যদিকে ফসল মাপার বাটখারা নিয়েও করা হতো কারচুপি। পরিমাণের চেয়ে কম দেখানো হতো ওজন।
কৃষকেরা যে এসব ছলচাতুরী টের পেতো না, তা নয়। কিন্তু তাঁরা ছিল নিরুপায়। ফসল ফলানোর আগে মহাজনদের থেকে নেয়া ঋণের চাপে তাঁদের কাছে সর্বস্ব বেচতে একপ্রকার বাধ্যই হতো কৃষকেরা। তবে পেটে কিংবা পিঠে, কোনোকিছুই চিরকাল সয় না। ফলে মহাজনদের জোচ্চুরির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল অনিবার্য।
এই অনিবার্য বিদ্রোহ দমন করতে ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো জারি করা হয়েছিল সামরিক আইন। ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুকের গুলি ও কামানের গোলার সামনে সাঁওতালদের তীর-ধনুকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে তা হয়েও ওঠেনি। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন থেকে প্রায় আট মাস ধরে চলে লড়াই। ব্রিটিশেরা এগিয়ে যায় যুদ্ধের ময়দানে। কিন্তু লড়াইয়ের কোনো মীমাংসা না করেই ব্রিটিশেরা বেছে নেয় নিরস্ত্র সাঁওতালদের হত্যার পথ। সাঁওতাল সমাজে হুঁল হিসেবে পরিচিত ও লড়াইয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল জনপদটির ২৫ হাজার মানুষকে।
ব্রিটিশদের বিরদ্ধে ওই লড়াইয়ের ফলাফলের চেয়ে ‘লড়াই’ করার হিম্মতই পরে হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।
‘উলগুলানের শেষ নাই’
মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’ বইয়ে ভূমি ফিরে পেতে বিরসা মুন্ডা বলেছিলেন ‘উলগুলানের শেষ নাই’ (লড়াইয়ের শেষ নাই)। অরণ্যকে ফিরে পেতে, জুলুমের বিরুদ্ধে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন সিধু, কানু, বিরসারা।
এই জনপদে উলগুলান বা হুলের শেষ হয়নি। দেড় শ বছর পরেও টিকে আছে বৈষম্য। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে গত জুলাইতে বাংলার মাটিতে হয়েছে আরেক বিদ্রোহ, আরেক অভ্যুত্থান। ঝরে গেছে শত শত তরুণ প্রাণ। পতন হয়েছে শাসক শেখ হাসিনার। তবে নির্মম পরিহাস এই যে, সিধু-কানুর যে বিদ্রোহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এই অঞ্চলের সব অভ্যুত্থানকে, দিনাজপুর থেকে সেই বিদ্রোহের দুই বরপুত্র সিধু-কানুর ভাস্কর্যই ভেঙে ফেলা হয়েছিল বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর। তবে সিধু-কানুর হুল বা হিম্মত যেহেতু ভাস্কর্য বা কোনো কারুকার্যে বন্দী থাকার ব্যাপার নয়। তাই বলাই যায়-ভাস্কর্য থাকুক বা না থাকুক, সিধু-কানুর শিক্ষা যুগ যুগ ধরে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে যাবে সকল বৈষম্যের বিরদ্ধে।
.png)

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা নগরীও এমন অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাব কিংবা সমাজের উচ্চবিত্তরা ঢাকায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন নানা ধরনের কারিগর, শিল্পী ও পেশাজীবীরাও। ফলে কলকাতা ও উত্তর ভারতের অনেক পেশা একসময় ঢাকায় প্রচলিত ছিল। সময়ের আবর্তে সেই পেশাগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে
০৯ আগস্ট ২০২৬
‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
০৬ আগস্ট ২০২৬
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।
০৫ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
২৯ জুলাই ২০২৬