স্বাক্ষরে লুকিয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিত্বের গোপন রূপ

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৭: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরটি কখনো দেখেছেন?

স্বাক্ষরটি বেশ বড়, স্পষ্ট আর নজরকাড়া। বহু বছর ধরেই তাঁর এই স্বাক্ষরটি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে আসছে। ট্রাম্প নিজেও নিজের স্বাক্ষর নিয়ে বেশ গর্বিত। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সামরিক নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্বাক্ষর খুব ভালোবাসি, সত্যি বলছি। সবাই আমার স্বাক্ষর পছন্দ করে।’

স্বাক্ষর বা সই মানুষের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু আইনি নথিপত্রেই নয়, একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব কেমন, তা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে তাঁর স্বাক্ষর। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, একজন মানুষের স্বাক্ষর কেমন হবে তার অনেককিছুই নির্ভর করে মানুষের মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিত্ব ও তাঁর সামাজিক মর্যাদার ওপর।

প্রেক্ষাপট

স্বাক্ষরের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সম্পর্কের বিষয়টি প্রথম ঘটনাক্রমে আবিষ্কার করেন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী রিচি জুইগেনহাফ্‌ট।

সময়টা ১৯৬৭ সাল। তিনি তখন ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি লাইব্রেরিতে খণ্ডকালীন কাজ করতেন তিনি। লাইব্রেরি থেকে কেউ বই নিলে বা ফেরত দিলে বইয়ের পেছনের একটি কার্ডে নাম সই করতে হতো।

সেখানে কাজ করতে গিয়ে রিচি একটি অদ্ভুত প্যাটার্ন খেয়াল করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা যখন বই নিতেন, তাঁরা সই করার সময় কার্ডের অনেকটা জায়গা দখল করে বেশ বড় করে স্বাক্ষর করতেন। অন্যদিকে, ছাত্ররা সই করার সময় খুব অল্প জায়গায় ছোট করে নাম লিখতেন। দেখে মনে হতো, ছাত্ররা হয়তো অবচেতনভাবেই চাইছেন কার্ডে যেন আরও অনেকের সই করার জায়গা থাকে। বিষয়টি কিছুটা খটকা লাগে রিচির। আর সেখান থেকেই গবেষণার শুরু।

স্বাক্ষর কি মর্যাদা আর আত্মসম্মানের প্রতীক?

এই কৌতূহল থেকে রিচি বিষয়টি নিয়ে নিয়মমাফিক গবেষণা শুরু করেন। তিনি প্রত্যেক অধ্যাপক থেকে অন্তত দশটি করে স্বাক্ষরের নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর একই অক্ষরের নাম থাকা ছাত্রদের স্বাক্ষরের সঙ্গে সেগুলোর আকার মিলিয়ে দেখেন। তিনি প্রমাণ পান যে, অধ্যাপকদের স্বাক্ষর ছাত্রদের তুলনায় বেশ বড়।

এই বিষয়টি কি কেবল বয়সের জন্য হচ্ছে নাকি এখানে সামাজিক মর্যাদারও ব্যাপার আছে, এটি বুঝতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মালিদের স্বাক্ষরও পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, তাঁদের স্বাক্ষর ছাত্রদের চেয়ে বড় হলেও অধ্যাপকদের চেয়ে ছোট। অর্থাৎ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাক্ষর বড় হলেও সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।

এমনকি রিচির প্রিয় শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী কার্ল শেইবের পুরনো স্বাক্ষর পরীক্ষা করেও এক চমকপ্রদ তথ্য পান। তিনি দেখেন, কলেজের প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে অধ্যাপক হওয়া পর্যন্ত ক্যারিয়ারের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ওই শিক্ষকের স্বাক্ষরের আকারও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে।

শুধু নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রিচি আরও কয়েকটি দেশের মানুষের ওপর গবেষণা চালান। এমনকি সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরানও রয়েছে। ইরানে ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হয়। সেই দেশের মানুষের স্বাক্ষর থেকেও একই ফলাফল পান রিচি। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, স্বাক্ষরের আকারের সঙ্গে মানুষের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।

স্বাক্ষরের সঙ্গে ‘নার্সিসিজম’-এর সম্পর্ক

রিচি জুইগেনহাফটের এই গবেষণার পর কেটে গেছে প্রায় ৪০ বছর। ২০১৩ সালে ‘হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ’ থেকে রিচির কাছে একটি ফোন আসে। বড় বড় কোম্পানির সিইও-দের স্বাক্ষরের সঙ্গে তাঁদের ‘নার্সিসিজম’ বা আত্মমগ্নতার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে কথা হয় রিচির। ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপকের এমন ধারণার সূত্র ধরে রিচি আবারও তাঁর নিজের ছাত্রদের ওপর একটি পরীক্ষা চালান।

এই গবেষণার ফলাফল ছিল অবাক করার মতো। তিনি দেখেন, সত্যিই স্বাক্ষরের আকারের সঙ্গে মানুষের আত্মমগ্নতার (নার্সিসিজম) সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যাদের যাঁদের স্বাক্ষর যত বড়, তাঁদের মধ্যে নিজেকে বড় করে দেখার বা আত্মমগ্নতার প্রবণতাও তত বেশি। ২০২০ সালের মধ্যে এই তত্ত্বটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, সিইও-দের নার্সিসিজম মাপার পাঁচটি স্বীকৃত উপায়ের মধ্যে স্বাক্ষরের আকারকে অন্যতম উপায় হিসেবে ধরা হয়।

স্বাক্ষরের ওপর অন্যদের প্রভাব

বর্তমানে এই গবেষণা আরও অনেক দূর এগিয়েছে। আমেরিকা থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এমনকি ইরানেও বড় বড় কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মানুষের স্বাক্ষরের আকার কেবল তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বই প্রকাশ করে না, এটি অন্যদের ওপরও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। ‘জার্নাল অব ফিলানথ্রপি’-তে প্রকাশিত একটি কানাডিয়ান গবেষণায় দেখা গেছে, অনুদান চাওয়ার চিঠিতে আবেদনকারীর স্বাক্ষরটি বড় হলে তা দাতাদের মনে প্রেরকের ক্ষমতা ও সফলতার একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। ফলে অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়!

একটি কলমের আঁচড় যে মানুষের ভেতরের এতগুলো গোপন কথা বলে দিতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর!

সম্পর্কিত