অফিস শেষ করেই মনে হলো, ‘একটু কিছু’ খেতে মন চাচ্ছে। কোথায় খাব, কী খাব এসব বলতেই বন্ধু মনে করিয়ে দিল ‘আরে মোহাম্মদপুর গেলেই তো হয়, স্ট্রিট ফুড আছে’। কম দামে খাওয়ার এর চেয়ে ভালো জায়গা বোধ হয় ঢাকায় আর নেই।
ঢাকার রাস্তার চেহারা এখন বদলে গেছে। সন্ধ্যা হলেই দেখা যায় মোড়ে মোড়ে ছোট বা মাঝারি সাইজের ঝলমলে আলোয় সাজানো খাবারে ঠাসা ‘কার্ট’। কোনোটি থেকে কাবাবের ধোঁয়া উড়ে আসছে আবার কোথাও বানানো হচ্ছে লাইভ পিৎজা।
একসময় রাস্তার খাবার মানে ছিল ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, পেঁয়াজু কিংবা শীতের ভাপা বা চিতই পিঠা। এখন একই রাস্তায় পাওয়া যায় মোমো, রামেন, স্ট্রিট পাস্তা, শর্মা, চিকেন ফ্রাই, কাবাব, এমনকি ‘স্ট্রিট পিৎজা’ও। পুরো শহরটাই যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল ফুড কোর্টে।
এই পরিবর্তন কেবল খাবারের তালিকার পরিবর্তন নয়। এটি ঢাকার নগরজীবনের পরিবর্তনের গল্প। এমন এক শহরের গল্প, যেখানে মানুষ দিনের বেশির ভাগ সময়ই বাসার বাইরে থাকে। অবধারিতভাবেই তাই ‘বাইরে খাওয়া’ জীবনযাত্রার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত দুই দশকে ঢাকার স্ট্রিট ফুডের দৃশ্য স্থানীয় নাশতা থেকে বিশ্বায়িত খাদ্যসংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। আগে রাস্তার খাবার ছিল পরিচিত স্বাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন শহরের অলিগলিতে ভারতীয় দোসা, নেপালি মোমো, বেলজিয়ান ওয়াফল—সবই পাওয়া যায়। আগে ‘মামা’রা একটি স্ট্যান্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। কার্ট খুব কমই দেখা যেত। বিকেলে পাওয়া যেত ‘ভাজা-পোড়া’। তাও সেই পাড়ার সকালের নাশতার দোকানে, ধীরে ধীরে তা মোড়ে এল, সেখান থেকে সুবিধা, বিক্রি ও জনপ্রিয়তা বুঝে একদিন উঠে পড়ল কার্টে। এরপর এল—হালিম, বট, কাবাব-পরোটা। পরের ধাপে এই কার্টেই শুরু হলো মিনি বার্গার, স্যান্ডউইচ, নুডুলস। মাত্র ছয়-সাত বছর হলো চিকেন ফ্রাই কার্টে পাওয়া যায়। এমনকি কর্নডগ, চাইনিজ মিল, বিবিমবাপ-এর মতো বিভিন্ন জনপ্রিয় কোরিয়ান খাবার, নানা পদের কাবাব, দইবড়া এসব প্রায় রাস্তার পাশেই পাওয়া যায়। বছর দেড়েক আগে ‘সুশি’ ও ‘ওয়াফল’ও নেমে এসেছে রাস্তায়।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে নগরায়ণ। ঢাকা পৃথিবীর দ্রুততম বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর একটি। জাতিসংঘের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২২ লাখ, এখন তা সাড়ে তিন কোটিরও বেশি। এই দ্রুত নগর সম্প্রসারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সম্পর্ক বদলে দিয়েছে।
আগে খাবার ছিল মূলত পারিবারিক বিষয়। এখন নগরজীবনের চাপ—দীর্ঘ যাতায়াত, ছোট ফ্ল্যাট, কর্মব্যস্ততা, একক পরিবার এবং বিনোদনের অভাব—মানুষকে ক্রমশ বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ‘বাইরে খাওয়া’ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি জীবনের অংশ।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঢাকায় এখন প্রায় সব শ্রেণির মানুষই বাইরে খেতে চায়। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ স্ট্রিট ফুড আবার কেউ ক্যাফেতে খাচ্ছেন। আবার একই মানুষ সপ্তাহান্তে রেস্টুরেন্টে ‘ফাইন ডাইনিংয়েও’ যাচ্ছেন। কিন্তু ‘বাইরে খাওয়া’ হবেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে মানুষ এখন যেমন বিভিন্ন দেশের নানা স্বাদের খাবার সম্পর্কে জানতে পারছে, ঠিক তেমনি চাইলে ইউটিউব দেখে কয়েক মিনিটে তার রেসিপিও পেয়ে যাচ্ছে। এখন খাবার তৈরির উপাদানগুলোও মোটামুটি হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। ফলে ভিন্ন স্বাদের খাবারের সহজলভ্যতাও তৈরি হয়েছে। ঢাকার স্ট্রিট ফুডে চলে এসেছে ‘গ্লোবালাইজেশন’।
তবে যে জিনিসটি বাড়েনি তা হলো সময়। এখন শিক্ষার্থী হোক বা কর্মজীবী—সবাই আগের চেয়ে ব্যস্ত। পড়ার চাপ, কাজের চাপ, যানজট—এসব মিলিয়ে সবাই খুবই ব্যস্ত থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিকতা ও ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র চাপ। আগে সবাই দেখা করতে চাইলে একজনের বাড়িতে একবেলা দাওয়াতের রেওয়াজই ছিল প্রচলিত। কিন্তু এখন সবসময় কাজের চাপের কারণে রান্না ও পরিষ্কারের বাড়তি কষ্ট কেউ করতে চায় না। সমাধান—বাইরে খাওয়া। এছাড়াও, খাবারের ছবি তুলে পোস্ট করা তো আছেই।
আবার অনেকেই কাজের জন্য বাইরে খেতে বাধ্য হন। সদ্য পাস করা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত প্রাচুর্য আহমেদ জানান, ‘বাসায় হয়ত দিনে একবেলা খাওয়া হয়। বেশিরভাগ সময় বাইরেই খাওয়া হয়।’ তাঁর মতো অনেক চাকরিজীবীই প্রতিদিন অন্তত একবেলা হলেও বাসার বাইরে খান। যার কারণে অফিস পাড়াগুলোতে এখন হোটেল ছাড়াও গড়ে উঠেছে ছোট-ছোট কার্ট। মতিঝিলের মতো জায়গায় কার্টে কোরিয়ান খাবার ও চাইনিজ বিভিন্ন মুখোরোচক খাবার পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা এগুলো যেমন পেট ভরায় তেমনি পকেটের দিকেও খেয়াল রাখে।
তবে, শুধু প্রয়োজনীয়তা নয়, ‘বাসার বাইরে খেতে হবে’—এই দলে সবাই যোগ দিতে চায়। তাই দামি রেস্টুরেন্টে সম্ভব না হলেও একই খাবার যখন অর্ধেক দামে কার্টে পাওয়া যায়, তখন সকলেই তা ‘প্রেফার’ করে। ফলে যেমন খাওয়া হয়, তেমনি একই পরিমাণ টাকায় কয়েক ধরনের খাবার খাওয়া যায়। এই নতুন সংস্কৃতি বোঝার জন্য ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ুর ‘ক্লাস টেস্ট অ্যান্ড লাইফস্টাইল’ তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। বুর্দিয়ু বলেছিলেন, মানুষের রুচি কখনো শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়। এটি সামাজিক পরিচয় ও শ্রেণির প্রকাশও। অর্থাৎ, মানুষ কী খাচ্ছে, কোথায় খাচ্ছে, কীভাবে খাচ্ছে—এসব দিয়েও সে নিজের সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করে।
ঢাকার ক্যাফে সংস্কৃতির উত্থান দেখলে বোঝা যায়, মানুষ এখন খাবারের পাশাপাশি পরিবেশ, ছবি তোলা, সামাজিক উপস্থিতি—এসবও কিনছে। অর্থাৎ, খাবার এখন ‘স্ট্যাটাস মেকার’। কেউ ‘লোকাল’ স্ট্রিট ফুড খেয়ে নিজেকে সংস্কৃতিমনস্ক দেখাতে চায়, কেউ ‘ফাইন ডাইনিং’ দিয়ে সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করে।
ঢাকার বর্তমান খাদ্যসংস্কৃতিতে এই তত্ত্ব খুব স্পষ্ট। একসময় রাস্তার খাবারকে নিম্নবিত্তের খাবার হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই স্ট্রিট ফুডই ‘ট্রেন্ডি’। এখনকার তরুণেরা রাতের শহরে ‘ফুড হান্ট’-এ বের হয় বা ‘হিডেন জেম’ খুঁজে বেড়ায়, তার ভিডিও বানায়। এটিও এই সংস্কৃতির নতুন একটি দিক। এই চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েই শহরের কিছু জায়গায় এখন রাতে কার্ট বসে। রাত যত গভীর হয় মানুষের আনাগোনা তত বৃদ্ধি পায়। এরমধ্যেই বেশ মজার ও নতুন একটি ধারা হলো গাড়ির মধ্যেই খাবার বিক্রি। বিক্রেতারা নিজেদের গাড়ির পেছনের লাগেজ রাখার অংশেই ঢাকনা তুলে সেখানেই বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন।
অবদান আছে ফুড ভ্লগারদেরও। এখানে স্ট্রিট ফুডের ‘গ্ল্যামারাইজেশন’ করা হয়। খাবারকে তারা শুধু খাবার নয় বরং ‘এক্সপেরিয়েন্স’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাই, ঢাকার জীবনে স্ট্রিট ফুড এখন শুধু সস্তা খাবার নয়, এটি এখন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। ফুচকা খাওয়া এখন ‘লোকাল ভাইব’। পুরান ঢাকার কাচ্চি খাওয়া এখন ‘অথেনটিক এক্সপেরিয়েন্স’। স্ট্রিট বার্গার এখন ‘আর্বান কালচার’। অর্থাৎ, খাবার এখন সামাজিক ভাষা।
এছাড়াও, এখন মানুষের জীবনে বিনোদনের অভাব। আগে মানুষ বাইরে খেতে যেত বিশেষ উপলক্ষে। এখন বাইরে খাওয়া নিজেই বিনোদন। তাই এই পরিবর্তন শুধু খাবারের না, এটি জীবনযাত্রারও পরিবর্তন। বিনোদনের জন্যও এখন মানুষ বাইরে খেতে যায়। ঢাকায় পাবলিক স্পেস কমে যাওয়ার কারণে ক্যাফে, ফুড কার্ট, রেস্টুরেন্ট এখন হয়ে উঠেছে এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ বাসা বা অফিসের বাইরে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে। বন্ধুদের আড্ডা, সম্পর্ক, ছোটখাটো উদযাপন—সবকিছুর কেন্দ্র এখন খাবারের জায়গা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া লাবিব জানান, ‘এক প্লেট মোমো কার্টে ১০০ টাকায় পাওয়া যায় কিন্তু রেস্টুরেন্টে এর দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ। তাই বিশেষ কোনো উপলক্ষ না থাকলে বা শুধুই ‘খেতে’ চাইলে আমি কার্টেই খাই। তবে নতুন ফ্লেভার ট্রাই করতে রেস্টুরেন্টে যাই।’
ঢাকার খাবার সংস্কৃতি আজ দুই বিপরীত জগতকে একসঙ্গে ধারণ করছে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রয়োজন, অন্যদিকে সামাজিক পরিচয়। একদিকে থাকে কমদামে খাবার, অন্যদিকে ‘স্ট্যাটাস মেইন্টেইন’। ফুটপাতের পাশাপাশি আছে ফ্রেঞ্চ ধাঁচে ইন্টেরিওর করা ক্যাফে। তবে শেষ পর্যন্ত দুটোর কেন্দ্রেই আছে একই বিষয়—মানুষের নতুন ধারার জীবনযাপন ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখার প্রবণতা। ঢাকার ক্রমবর্ধমান একাকিত্ব, সীমিত পাবলিক স্পেস, ব্যস্ততা এবং ডিজিটাল জীবনের মধ্যে খাবার এখন সামাজিক সংযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই এই শহরে বাসার ‘বাইরে খাওয়া’ শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় না। এটি আমাদের শহুরে জীবনের ভাষা।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫, পিয়েরে বুর্দিয়ুর বই আ সোশ্যাল ক্রিটিক অব দ্য জাজমেন্ট অব টেস্ট ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন