leadT1ad

আজ ধীরে হাঁটার দিন

হলুদ পাঞ্জাবি না থাকলেও চলবে, আজ একটু হিমু হয়ে যান

আজ ১৯ জুন, ‘ওয়ার্ল্ড স্যান্টারিং ডে’ বা ‘বিশ্ব ধীরে হাঁটা দিবস’। ‘স্যান্টারিং’ শব্দের অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের তাড়া না রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে চারপাশটা দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়ানো। ১৯৭৯ সালে ডব্লিউ টি র‍্যাবে মানুষের ব্যস্ততা ও ক্যালোরি পোড়ানোর ফিটনেস-আসক্তির প্রতিবাদে এই দিবসের প্রচলন করেন।

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১৫: ৩২
এআই জেনারেটেড ছবি

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না; আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে, পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।’

‘উনিশশো চৌত্রিশের’ নামের এই কবিতার সঙ্গে বর্তমানের কোনো মিল নেই। এই আধুনিক সময় আমাদের জীবনকে সহজ করতে সবকিছু দিয়েছে। কিন্তু অবসর দেয়নি। আমরা শুধু ছুটে বেড়াচ্ছি, কোন সুখের খোঁজে তা কেউ জানে না। ভেবে দেখুন তো, শেষ কবে তাড়াহুড়ো না করে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে হেঁটেছেন? তাকিয়ে দেখেছেন চারপাশের পরিবেশ? কিংবা দু’দণ্ড শান্তির আশায় বসেছেন শান্ত পার্কে কিংবা হেঁটেছেন ফোনে স্ক্রলিং করা ছাড়াই।

কখনও কি হিমুর মতো হতে ইচ্ছে করেনি? হুমায়ূন আহমেদের সেই কালজয়ী চরিত্র হিমু উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরে, চারপাশটা দুচোখ ভরে দেখে। এজন্যই হিমুর মুখে আমরা শুনতে পাই, ‘হিমুরা কিছু করে না, শুধু দেখে।’

ঠিক এই ‘হিমু হওয়ার’ মতো আনন্দ ও শান্তি খুঁজে দিতেই প্রতি বছর ১৯ জুন পালিত হয় ‘বিশ্ব স্যান্টারিং দিবস’ বা ধীরে হাঁটা দিবস। উদ্দেশ্য হলো আমাদের ব্যস্ততম জীবনের গতি একটু কমিয়ে ধীরে-সুস্থে হাঁটা, চারপাশ উপভোগ করা এবং তাড়াহুড়োর সংস্কৃতি থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া। তাই কিছু সময়ের জন্য ‘হিমু’ হয়ে যেতে পারেন। তবে খালি পায়ে হাঁটার দরকার নেই। পায়ে পরে নিন নরম জুতা, হলুদ পাঞ্জাবির পরিবর্তে যেকোনো আরামদায়ক পোশাক পরলেও চলবে।

জগিং এর বিরুদ্ধে ‘স্যান্টারিং ডে’

ইংরেজি ‘Saunter’ শব্দের অর্থ হলো কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়া ধীরগতিতে হেঁটে বেড়ানো। এই দিবসটির ইতিহাস বেশ মজার। সত্তরের দশকে মার্কিন নাগরিক ডব্লিউ টি র‍্যাবে প্রথম এই দিবসটির ধারণা নিয়ে আসেন। ১৯৭৯ সালের ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ম্যাকিনাক দ্বীপের গ্র্যান্ড হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটির প্রচলন করা হয়।

যদি একা হাঁটতে ভালো না লাগে, তবে কোনো প্রিয় বন্ধু বা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিতে পারেন। কোনো কাজের কথা না বলে, কোনো ব্যবসার হিসাব না করে, তাঁর সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করতে করতে হেঁটে যান অনেকটা পথ।

তখন পশ্চিমা বিশ্বে ফিটনেস সচেতনতা বাড়াতে ‘জগিং’ বা দৌড়ানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। সবাই কেবল ক্যালোরি পোড়ানো আর ফিটনেস গোল নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এই দৌড়-ঝাঁপের তীব্র আসক্তির বিরুদ্ধে এক ধরণের হালকা প্রতিবাদ হিসেবেই র‍্যাবে এই ‘স্যান্টারিং ডে’ চালু করেন।

ডব্লিউ টি র‍্যাবে সে সময় মজার ছলে সবাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষকে সবসময় এত দ্রুত দৌড়াতে হবে কেন? মাঝে মাঝে জীবনকে উপভোগ করার জন্য ধীরে হাঁটাও তো দরকার। তিনি বলতেন, মানুষ এত দ্রুত দৌড়াচ্ছে যে তাঁরা জীবনের সহজ-সুন্দর জিনিসগুলো দেখতে পাচ্ছে না। পরে এটি শান্তি ও মানসিক সুস্থতার প্রতীকী উদযাপনে পরিণত হয়।

২০০২ সালে ডব্লিউ টি র‍্যাবের ছেলে জন এক সাক্ষাৎকারে বাবার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘বাবা বলতেন, স্যান্টারিং হলো এমনভাবে হাঁটা, যেখানে আপনি কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে যাচ্ছেন বা কখন পৌঁছাবেন—তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। স্যান্টারিংয়ের মূল মন্ত্র হলো পথ চলার পথে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করা, প্রকৃতির ঘ্রাণ নেওয়া এবং আশপাশের পৃথিবীকে মনোযোগ দিয়ে দেখা। অর্থাৎ, গন্তব্য বড় নয়, আনন্দটা লুকিয়ে আছে আপনার পথচলার মধ্যেই।’

‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’

আমাদের জীবন এখন অবিরাম গতিময়। ফোনের নোটিফিকেশন, কাজের চাপ আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে আমরা আধুনিক সময়ের সাথে যুক্ত থাকলেও মানসিক চাপ বাড়িয়ে ফেলেছি কয়েক গুণ। তাই ব্যস্ত জীবনকে মাঝে মাঝে ছুটি দেওয়া খুব জরুরি। মনে রাখবেন, শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোই শেষ কথা নয়, যাত্রাপথটাকেও সমানভাবে উপভোগ করতে হয়। একদিন সময় নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটুন, প্রিয়জনের সাথে মনের কথা বলুন।

কখনও কি হিমুর মতো হতে ইচ্ছে করেনি? হুমায়ূন আহমেদের সেই কালজয়ী চরিত্র হিমু উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরে, চারপাশটা দুচোখ ভরে দেখে। এজন্যই হিমুর মুখে আমরা শুনতে পাই, ‘হিমুরা কিছু করে না, শুধু দেখে।’

স্যান্টারিং বা ধীর গতিতে হাঁটা কিন্তু কোনো শরীরচর্চা বা ফিটনেস গোল অর্জনের উপায় নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শান্তভাবে হাঁটলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে। চিকিৎসকেরা একে এক ধরনের ‘অ্যাক্টিভ মেডিটেশন’ বা সক্রিয় ধ্যান বলে থাকেন।

তাই এই দিনটি উদযাপনের জন্য কোনো বিশেষ পরিকল্পনার দরকার নেই। কাজের চাপ কমিয়ে বিকেল বা সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়ুন রাস্তায়। আনমনে হেঁটে দেখুন শহরের অলিগলি। হাঁটার জন্য বেছে নিতে পারেন কোনো পার্ক, সবুজে ঘেরা উদ্যান, নদীর পাড় কিংবা নিজের চেনা কোনো নিরিবিলি গলি। হাঁটার সময় বারবার ফোনের স্ক্রিন চেক করবেন না। ধীর পায়ে হাঁটুন, বুক ভরে শ্বাস নিন।

লক্ষ্য করুন গাছের পাতার রঙ, বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধ কিংবা পাখির মিষ্টি গান। মনে রাখবেন, আপনি কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য হাঁটছেন না; হাঁটছেন হাঁটার আনন্দটুকু উপভোগ করার জন্য। অনেকটা রবি ঠাকুরের ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’-র মতো।

যদি একা হাঁটতে ভালো না লাগে, তবে কোনো প্রিয় বন্ধু বা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিতে পারেন। কোনো কাজের কথা না বলে, কোনো ব্যবসার হিসাব না করে, তাঁর সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করতে করতে হেঁটে যান অনেকটা পথ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত