ভ্রমণগদ্য
তৌহিন হাসান
বাস থেকে নেমে, বিপত্তি বাধলো হোটেলের রিসিপশনে এসে। বিপত্তি না বলে ‘বিপদ’ বলা ভালো—‘মহা বিপদ’। রিসিপশনিস্ট ছেলেটা জানাল, তাদের হোটেলে আজকের তারিখে আমার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই।
আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। মোবাইলে এই হোটেলের রিজার্ভেশন কনফার্মেশনের ইমেইল আছে, এমনকি দুই রাতের হোটেল রুম রেন্ট পেইড। আমি ছেলেটাকে আবার আমার নাম বললাম, হোটেলের নামও বললাম। ছেলেটা আরেকবার তার কম্পিউটারের মনিটরে ভালো করে খুঁজে-টুজে ফাইনাল জানিয়ে দিলো—‘না, নেই। নো রিজার্ভেশন।’
বিকেল তখন সাড়ে ৪টার মতো বাজে। শীতের সময়। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হোটেল রুম দোতলায়, নিচতলায় তাদের পাব। রিসিপশন নিচতলাতেই, পাবের কাউন্টারের পাশে। সেদিন, ২০২৩ সালের থার্টি ফাস্টের রাত। পুরো পাবের একটি চেয়ারও খালি নেই। মানুষের কোলাহলে আর গ্লাসের টুং-টাং শব্দে মুখরিত। ওদিকে আমাদের মুখ শুকিয়ে কাঠ। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক তখন হোটেলের ম্যানেজার, একজন বয়স্ক নারী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
‘তোমাদের হোটেল রিজার্ভেশন নিয়ে বোধহয় সমস্যা হয়েছে। রিজার্ভেশন কপিটা আমাকে আরেকবার দেখাতে পারো?’

আমি তড়িঘড়ি মোবাইল থেকে কপিটা বের করে ভদ্রমহিলার হাতে দিলাম। তিনি নিজেই কম্পিউটারের মনিটরে বসলেন এবং কিছুক্ষণ পর চেক করে বললেন—
‘তুমি হোটেল রুম বুক করেছো, জানুয়ারির ৩১ তারিখ। আজ ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ।’
আমি আঁতকে উঠলাম। বলে কী? ম্যানেজার ভদ্রমহিলা ততক্ষণে আমার মোবাইল আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজেই মোবাইল থেকে দেখলাম, আসলেই তাই। আমি দুদিনের জন্য হোটেল বুক করেছি জানুয়ারি ৩১ তারিখ থেকে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সম্ভবত ভুলে ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারিতে ক্লিক করে ফেলেছিলাম। আমি অসহায়ের মতো ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এখন উপায়?’
ম্যানেজার জানালেন, কিছুই করার নেই তাঁর পক্ষ থেকে। কারণ তাদের হোটেলে কোনো ফাঁকা রুম নেই। থাকার কথাও না। থার্টি ফার্স্ট নাইট—নতুন বছর উদযাপন করতে সব হোটেল এবং এয়ার বিএনবি কয়েক মাস আগে থেকেই বুকড হয়ে ছিল। এবার মহাবিপদটা টের পেলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমে এল।
আমরা হোটেলের ভিতর থেকে বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। ভাবতে লাগলাম, কী করা যায়! আমার ভ্রমণসঙ্গী বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করব এখন?’ সে শুধু সংক্ষেপে উত্তর দিলো, ‘আগে দেখি, কোনো হোটেল ফাঁকা আছে কিনা।’ এই বলে সে মোবাইলে একটার পর একটা হোটেল বুকিং সাইট ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলো।
আমি শুধু একটার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে লাগলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, যদি হোটেল পাওয়া না যায়, তাহলে মার্কেট থেকে একটা তাঁবু কিনে ফেলব। রাস্তার ধারে তাঁবু ফেলে, তাতেই রাত কাটাব। কারণ আমাদের ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। থার্টি ফার্স্ট নাইট বলে, ছোট এই শহর থেকে সন্ধ্যার পর আর কোনো ফেরার বাস নেই।

হুইটবি (Whitby) ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের সমুদ্রতীরবর্তী ছোট একটি শহর ও বন্দর। উত্তর সাগরের তীরে এস্ক (Esk River) নদীর মোহনায় শহরটি অবস্থিত। শহরের পূবদিকে, সমুদ্রতীর ঘেঁষে একটি পাথুরে পাহাড়ের খাড়া চূড়ায় একটি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যেটি হুইটবি অ্যাবে (Whitby Abbey) নামে পরিচিত। এটি এই শহরের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে বিশিষ্ট নিদর্শন, যা ছিল ৭ম শতকের (প্রতিষ্ঠাকাল ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ) একটি খ্রিস্টান মনেস্ট্রি। এখন তাঁর পুরোটাই একটা ধ্বংসাবশেষ। সমুদ্র তীরবর্তী এস্ক নদীর মোহনা, জেলে পাড়ার ফিশ অ্যান্ড চিপস এবং হুইটবি অ্যাবের জন্য শহরটি ট্যুরিস্টদের খুব বেশি আকর্ষণ করে।
অবশেষে বন্ধুটি চিৎকার করে উঠলো, ‘পেয়েছি’।
আমি আরও জোরে চিৎকার করে জানতে চাইলাম, ‘কী?’
সে কোনো উত্তর না দিয়ে হনহন করে হাঁটা দিল উল্টো দিকে। আমিও পিছু নিলাম তাঁর। গুগল ম্যাপ ধরে অনেক অলি-গলি পেরিয়ে একটা পুরানো হোটেল খুঁজে পাওয়া গেল। যদিও জীর্ণ হোটেল, তাও তো পেলাম। কিন্তু দুই রাতের জন্য ভাড়া গুনতে হয়েছিলো তিন গুণ। আমরা তাতেই রাজি! উঠে গেলাম হোটেলে।
কিছুক্ষণ পর হাতে-মুখে পানি ছিটিয়ে বের হলাম শহর দেখতে। ছোট ছিমছাম একটি শহর। ছোট একটা নদীর অংশ দিয়ে শহরটি দুই ভাগে বিভক্ত। ওপারে পুরানো শহর, এপারে নতুন। শহরজুড়ে মানুষের আনাগোনা—বুঝলাম, সকলেই ট্যুরিস্ট।
হুইটবি শহরটি সমুদ্র তীরঘেঁষা বলে এখানকার স্থানীয় মানুষের অধিকাংশের পেশা মাছ ধরা। এখন শীতকাল, এটা মাছ ধরার মৌসুম নয়। ফলে জেলেদের নৌকাগুলো সমুদ্র থেকে শহরের ভেতরে যে নদীর অংশ ঢুকে গেছে, সেখানে বেঁধে রাখা। আমরা ঘুরে ঘুরে রাতের হুইটবি দেখতে লাগলাম। পুরো শহর ঘুরে দেখতে এক ঘন্টারও কম সময় লাগল।
রাতে থার্টি ফার্স্ট নাইটের যেরকম আয়োজন কল্পনা করেছিলাম, সেরকম কিছু হলো না। স্থানীয়দের কাছে জানতে পারলাম, কোভিড মহামারির পর থেকে আয়োজন অনেক কমে গেছে। তাই বলে কিছুই হয়নি তা না। ঘন্টাখানেক ধরে সমুদ্রের আকাশ নানা রঙের আলোয় আলোকিত করে ফায়ারওয়ার্কস চলল। তাতেই উপস্থিত ট্যুরিস্টদের হাততালি আর কোরাস গানে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো হুইটবি শহর।

পরের দিন দুপুরে আমরা ছুটলাম হুইটবির মূল আকর্ষণ হুইটবি অ্যাবেতে। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সেটি। মোট ১৯৩টি খাড়া সিঁড়ি বেয়ে অ্যাবেতে উঠতে হয়। আমরা উঠলাম। এটি মূলত ৬৫৮ সালে রাজা অসভিউর আমলে অ্যাবেস হিল্ড দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ৬৬৪ সালে এখানে বিখ্যাত ‘সিনড অব হুইটবি’ অনুষ্ঠিত হয়, যা ইংল্যান্ডের চার্চের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে যে বিশাল ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, তা মূলত ১৩শ শতাব্দীতে নির্মিত। হেনরি অষ্টমের আমলে ১৫৩৯ সালে অ্যাবেটি ভেঙে ফেলা হয়। দর্শনার্থীদের জন্য এখানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখার পাশাপাশি ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমৃদ্ধ একটি মিউজিয়াম রয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত আছে ব্রাম স্ট্রোকারের লেখা বিখ্যাত ভৌতিক উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ।
হুইটবি অ্যাবের গা ছমছমে পরিবেশই আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকারকে তাঁর বিখ্যাত গথিক হরর উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’ (১৮৯৭) লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ১৮৯০ সালের গ্রীষ্মকালে এক ক্লান্তিকর থিয়েটার ট্যুর শেষে ব্রাম স্টোকার হুইটবি শহরে ছুটিতে আসেন।
অ্যাবের ঠিক পাশেই অবস্থিত সেন্ট মেরি চার্চের প্রাচীন কবরস্থানে স্টোকার প্রায়ই হাঁটতেন। সেখানকার সমাধিফলকগুলো খুঁটিয়ে দেখে তিনি বেশ কিছু স্থানীয় নাম ডায়েরিতে টুকে নেন। এর মধ্যে ‘মিস্টার সোয়ালস’ নামটি তিনি উপন্যাসে কাউন্ট ড্রাকুলার প্রথম শিকার হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই কবরস্থানের একটি বেঞ্চে বসেই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র লুসি ওয়েস্টেনরা প্রথম ড্রাকুলার আক্রমণের শিকার হয়। ১৮৮৫ সালে হুইটবি উপকূলে ‘দিমিত্রি’ নামক একটি রুশ মালবাহী জাহাজ ভয়াবহ ঝড়ের মুখে পড়ে সৈকতে আটকে গিয়েছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে এই গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে স্টোকার উপন্যাসে ড্রাকুলার লন্ডন আসার পথ তৈরি করেন।
উপন্যাসে ড্রাকুলাকে বহনকারী ‘ডিমিটার’ নামক জাহাজটি একইভাবে হুইটবি উপকূলে এসে তীব্র ঝড়ে ভেঙে পড়ে এবং কাউন্ট ড্রাকুলা একটি বিশাল কালো কুকুরের রূপ নিয়ে জাহাজ থেকে লাফিয়ে নেমে বিখ্যাত ১৯৯টি সিঁড়ি বেয়ে হুইটবি অ্যাবের দিকে ছুটে যায়।

হুইটবিতে আসার আগে স্টোকার তাঁর রক্তচোষা প্রধান চরিত্রের নাম রাখার কথা ভেবেছিলেন ‘কাউন্ট ওয়্যাম্পায়ার’। কিন্তু হুইটবির স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে গবেষণার সময় তিনি ১৫ শতকের ওয়ালাচিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) নিষ্ঠুর শাসক ভ্লাদ তেপেস (ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার)-এর ইতিহাস জানতে পারেন। সেখানে তিনি উল্লেখ পান যে ভ্লাদের পরিবারকে ‘ড্রাকুলা’ বলা হতো, যার অর্থ শয়তান বা ড্রাগন। এই নামটি পছন্দ হওয়ায় তিনি তাঁর উপন্যাসের নাম বদলে ‘ড্রাকুলা’ রাখেন।
আজও হুইটবি শহর এবং হুইটবি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষ ড্রাকুলার ভক্ত ও গথিক সংস্কৃতির অনুসারীদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর এখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘হুইটবি গথ উইকেন্ড’ উদযাপিত হয়। ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসের মূল পটভূমি এই হুইটবি শহর হওয়ায়, গথ উপসংস্কৃতির মানুষদের জন্য এটি একটি অন্যতম প্রধান মিলনমেলা।
উৎসবের দিনগুলোতে পুরো হুইটবি শহর যেন একটি জীবন্ত ক্যাটওয়্যাকে পরিণত হয়। অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহ্যবাহী গথিক লুকে কালো লেস ও মখমলের পোশাক, ভিক্টোরিয়ান যুগের রাজকীয় পোশাক, স্টিমপাঙ্ক (Steampunk) গিয়ার, সাইবারগথ বা হরর ও ফ্যান্টাসি চরিত্রের মতো অসাধারণ সব মেকআপ ও পোশাকে সেজে শহরের রাস্তায় ও হুইটবি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষের চারপাশে ঘুরে বেড়ান।
হুইটবি অ্যাবের ভিতর ও বাইরেটা দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। শীতের দিনে এখানে বিকেলেই সন্ধ্যা নামে। অ্যাবেতে ঢোকার সময় টিকিটে লেখা ছিল বিকেল ৪টা পর আর অ্যাবের চত্বরে থাকা যাবে না, এমনকি প্রবেশদ্বারের কর্মরত রক্ষীরাও তা মনে করিয়ে দিয়েছিল। তাই আমরা সময় মেপে হুইটবি অ্যাবের এলাকা থেকে ফিরে এসেছিলাম।
কে জানে, হয়ত রাত নেমে এলে ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলা রক্তের নেশায় অ্যাবের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে জীবন্ত মানুষ খুঁজতে থাকে।
বাস থেকে নেমে, বিপত্তি বাধলো হোটেলের রিসিপশনে এসে। বিপত্তি না বলে ‘বিপদ’ বলা ভালো—‘মহা বিপদ’। রিসিপশনিস্ট ছেলেটা জানাল, তাদের হোটেলে আজকের তারিখে আমার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই।
আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। মোবাইলে এই হোটেলের রিজার্ভেশন কনফার্মেশনের ইমেইল আছে, এমনকি দুই রাতের হোটেল রুম রেন্ট পেইড। আমি ছেলেটাকে আবার আমার নাম বললাম, হোটেলের নামও বললাম। ছেলেটা আরেকবার তার কম্পিউটারের মনিটরে ভালো করে খুঁজে-টুজে ফাইনাল জানিয়ে দিলো—‘না, নেই। নো রিজার্ভেশন।’
বিকেল তখন সাড়ে ৪টার মতো বাজে। শীতের সময়। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হোটেল রুম দোতলায়, নিচতলায় তাদের পাব। রিসিপশন নিচতলাতেই, পাবের কাউন্টারের পাশে। সেদিন, ২০২৩ সালের থার্টি ফাস্টের রাত। পুরো পাবের একটি চেয়ারও খালি নেই। মানুষের কোলাহলে আর গ্লাসের টুং-টাং শব্দে মুখরিত। ওদিকে আমাদের মুখ শুকিয়ে কাঠ। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক তখন হোটেলের ম্যানেজার, একজন বয়স্ক নারী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
‘তোমাদের হোটেল রিজার্ভেশন নিয়ে বোধহয় সমস্যা হয়েছে। রিজার্ভেশন কপিটা আমাকে আরেকবার দেখাতে পারো?’

আমি তড়িঘড়ি মোবাইল থেকে কপিটা বের করে ভদ্রমহিলার হাতে দিলাম। তিনি নিজেই কম্পিউটারের মনিটরে বসলেন এবং কিছুক্ষণ পর চেক করে বললেন—
‘তুমি হোটেল রুম বুক করেছো, জানুয়ারির ৩১ তারিখ। আজ ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ।’
আমি আঁতকে উঠলাম। বলে কী? ম্যানেজার ভদ্রমহিলা ততক্ষণে আমার মোবাইল আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজেই মোবাইল থেকে দেখলাম, আসলেই তাই। আমি দুদিনের জন্য হোটেল বুক করেছি জানুয়ারি ৩১ তারিখ থেকে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সম্ভবত ভুলে ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারিতে ক্লিক করে ফেলেছিলাম। আমি অসহায়ের মতো ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এখন উপায়?’
ম্যানেজার জানালেন, কিছুই করার নেই তাঁর পক্ষ থেকে। কারণ তাদের হোটেলে কোনো ফাঁকা রুম নেই। থাকার কথাও না। থার্টি ফার্স্ট নাইট—নতুন বছর উদযাপন করতে সব হোটেল এবং এয়ার বিএনবি কয়েক মাস আগে থেকেই বুকড হয়ে ছিল। এবার মহাবিপদটা টের পেলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমে এল।
আমরা হোটেলের ভিতর থেকে বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। ভাবতে লাগলাম, কী করা যায়! আমার ভ্রমণসঙ্গী বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করব এখন?’ সে শুধু সংক্ষেপে উত্তর দিলো, ‘আগে দেখি, কোনো হোটেল ফাঁকা আছে কিনা।’ এই বলে সে মোবাইলে একটার পর একটা হোটেল বুকিং সাইট ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলো।
আমি শুধু একটার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে লাগলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, যদি হোটেল পাওয়া না যায়, তাহলে মার্কেট থেকে একটা তাঁবু কিনে ফেলব। রাস্তার ধারে তাঁবু ফেলে, তাতেই রাত কাটাব। কারণ আমাদের ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। থার্টি ফার্স্ট নাইট বলে, ছোট এই শহর থেকে সন্ধ্যার পর আর কোনো ফেরার বাস নেই।

হুইটবি (Whitby) ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের সমুদ্রতীরবর্তী ছোট একটি শহর ও বন্দর। উত্তর সাগরের তীরে এস্ক (Esk River) নদীর মোহনায় শহরটি অবস্থিত। শহরের পূবদিকে, সমুদ্রতীর ঘেঁষে একটি পাথুরে পাহাড়ের খাড়া চূড়ায় একটি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যেটি হুইটবি অ্যাবে (Whitby Abbey) নামে পরিচিত। এটি এই শহরের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে বিশিষ্ট নিদর্শন, যা ছিল ৭ম শতকের (প্রতিষ্ঠাকাল ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ) একটি খ্রিস্টান মনেস্ট্রি। এখন তাঁর পুরোটাই একটা ধ্বংসাবশেষ। সমুদ্র তীরবর্তী এস্ক নদীর মোহনা, জেলে পাড়ার ফিশ অ্যান্ড চিপস এবং হুইটবি অ্যাবের জন্য শহরটি ট্যুরিস্টদের খুব বেশি আকর্ষণ করে।
অবশেষে বন্ধুটি চিৎকার করে উঠলো, ‘পেয়েছি’।
আমি আরও জোরে চিৎকার করে জানতে চাইলাম, ‘কী?’
সে কোনো উত্তর না দিয়ে হনহন করে হাঁটা দিল উল্টো দিকে। আমিও পিছু নিলাম তাঁর। গুগল ম্যাপ ধরে অনেক অলি-গলি পেরিয়ে একটা পুরানো হোটেল খুঁজে পাওয়া গেল। যদিও জীর্ণ হোটেল, তাও তো পেলাম। কিন্তু দুই রাতের জন্য ভাড়া গুনতে হয়েছিলো তিন গুণ। আমরা তাতেই রাজি! উঠে গেলাম হোটেলে।
কিছুক্ষণ পর হাতে-মুখে পানি ছিটিয়ে বের হলাম শহর দেখতে। ছোট ছিমছাম একটি শহর। ছোট একটা নদীর অংশ দিয়ে শহরটি দুই ভাগে বিভক্ত। ওপারে পুরানো শহর, এপারে নতুন। শহরজুড়ে মানুষের আনাগোনা—বুঝলাম, সকলেই ট্যুরিস্ট।
হুইটবি শহরটি সমুদ্র তীরঘেঁষা বলে এখানকার স্থানীয় মানুষের অধিকাংশের পেশা মাছ ধরা। এখন শীতকাল, এটা মাছ ধরার মৌসুম নয়। ফলে জেলেদের নৌকাগুলো সমুদ্র থেকে শহরের ভেতরে যে নদীর অংশ ঢুকে গেছে, সেখানে বেঁধে রাখা। আমরা ঘুরে ঘুরে রাতের হুইটবি দেখতে লাগলাম। পুরো শহর ঘুরে দেখতে এক ঘন্টারও কম সময় লাগল।
রাতে থার্টি ফার্স্ট নাইটের যেরকম আয়োজন কল্পনা করেছিলাম, সেরকম কিছু হলো না। স্থানীয়দের কাছে জানতে পারলাম, কোভিড মহামারির পর থেকে আয়োজন অনেক কমে গেছে। তাই বলে কিছুই হয়নি তা না। ঘন্টাখানেক ধরে সমুদ্রের আকাশ নানা রঙের আলোয় আলোকিত করে ফায়ারওয়ার্কস চলল। তাতেই উপস্থিত ট্যুরিস্টদের হাততালি আর কোরাস গানে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো হুইটবি শহর।

পরের দিন দুপুরে আমরা ছুটলাম হুইটবির মূল আকর্ষণ হুইটবি অ্যাবেতে। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সেটি। মোট ১৯৩টি খাড়া সিঁড়ি বেয়ে অ্যাবেতে উঠতে হয়। আমরা উঠলাম। এটি মূলত ৬৫৮ সালে রাজা অসভিউর আমলে অ্যাবেস হিল্ড দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ৬৬৪ সালে এখানে বিখ্যাত ‘সিনড অব হুইটবি’ অনুষ্ঠিত হয়, যা ইংল্যান্ডের চার্চের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে যে বিশাল ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, তা মূলত ১৩শ শতাব্দীতে নির্মিত। হেনরি অষ্টমের আমলে ১৫৩৯ সালে অ্যাবেটি ভেঙে ফেলা হয়। দর্শনার্থীদের জন্য এখানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখার পাশাপাশি ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমৃদ্ধ একটি মিউজিয়াম রয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত আছে ব্রাম স্ট্রোকারের লেখা বিখ্যাত ভৌতিক উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ।
হুইটবি অ্যাবের গা ছমছমে পরিবেশই আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকারকে তাঁর বিখ্যাত গথিক হরর উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’ (১৮৯৭) লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ১৮৯০ সালের গ্রীষ্মকালে এক ক্লান্তিকর থিয়েটার ট্যুর শেষে ব্রাম স্টোকার হুইটবি শহরে ছুটিতে আসেন।
অ্যাবের ঠিক পাশেই অবস্থিত সেন্ট মেরি চার্চের প্রাচীন কবরস্থানে স্টোকার প্রায়ই হাঁটতেন। সেখানকার সমাধিফলকগুলো খুঁটিয়ে দেখে তিনি বেশ কিছু স্থানীয় নাম ডায়েরিতে টুকে নেন। এর মধ্যে ‘মিস্টার সোয়ালস’ নামটি তিনি উপন্যাসে কাউন্ট ড্রাকুলার প্রথম শিকার হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই কবরস্থানের একটি বেঞ্চে বসেই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র লুসি ওয়েস্টেনরা প্রথম ড্রাকুলার আক্রমণের শিকার হয়। ১৮৮৫ সালে হুইটবি উপকূলে ‘দিমিত্রি’ নামক একটি রুশ মালবাহী জাহাজ ভয়াবহ ঝড়ের মুখে পড়ে সৈকতে আটকে গিয়েছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে এই গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে স্টোকার উপন্যাসে ড্রাকুলার লন্ডন আসার পথ তৈরি করেন।
উপন্যাসে ড্রাকুলাকে বহনকারী ‘ডিমিটার’ নামক জাহাজটি একইভাবে হুইটবি উপকূলে এসে তীব্র ঝড়ে ভেঙে পড়ে এবং কাউন্ট ড্রাকুলা একটি বিশাল কালো কুকুরের রূপ নিয়ে জাহাজ থেকে লাফিয়ে নেমে বিখ্যাত ১৯৯টি সিঁড়ি বেয়ে হুইটবি অ্যাবের দিকে ছুটে যায়।

হুইটবিতে আসার আগে স্টোকার তাঁর রক্তচোষা প্রধান চরিত্রের নাম রাখার কথা ভেবেছিলেন ‘কাউন্ট ওয়্যাম্পায়ার’। কিন্তু হুইটবির স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে গবেষণার সময় তিনি ১৫ শতকের ওয়ালাচিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) নিষ্ঠুর শাসক ভ্লাদ তেপেস (ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার)-এর ইতিহাস জানতে পারেন। সেখানে তিনি উল্লেখ পান যে ভ্লাদের পরিবারকে ‘ড্রাকুলা’ বলা হতো, যার অর্থ শয়তান বা ড্রাগন। এই নামটি পছন্দ হওয়ায় তিনি তাঁর উপন্যাসের নাম বদলে ‘ড্রাকুলা’ রাখেন।
আজও হুইটবি শহর এবং হুইটবি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষ ড্রাকুলার ভক্ত ও গথিক সংস্কৃতির অনুসারীদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর এখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘হুইটবি গথ উইকেন্ড’ উদযাপিত হয়। ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসের মূল পটভূমি এই হুইটবি শহর হওয়ায়, গথ উপসংস্কৃতির মানুষদের জন্য এটি একটি অন্যতম প্রধান মিলনমেলা।
উৎসবের দিনগুলোতে পুরো হুইটবি শহর যেন একটি জীবন্ত ক্যাটওয়্যাকে পরিণত হয়। অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহ্যবাহী গথিক লুকে কালো লেস ও মখমলের পোশাক, ভিক্টোরিয়ান যুগের রাজকীয় পোশাক, স্টিমপাঙ্ক (Steampunk) গিয়ার, সাইবারগথ বা হরর ও ফ্যান্টাসি চরিত্রের মতো অসাধারণ সব মেকআপ ও পোশাকে সেজে শহরের রাস্তায় ও হুইটবি অ্যাবের ধ্বংসাবশেষের চারপাশে ঘুরে বেড়ান।
হুইটবি অ্যাবের ভিতর ও বাইরেটা দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। শীতের দিনে এখানে বিকেলেই সন্ধ্যা নামে। অ্যাবেতে ঢোকার সময় টিকিটে লেখা ছিল বিকেল ৪টা পর আর অ্যাবের চত্বরে থাকা যাবে না, এমনকি প্রবেশদ্বারের কর্মরত রক্ষীরাও তা মনে করিয়ে দিয়েছিল। তাই আমরা সময় মেপে হুইটবি অ্যাবের এলাকা থেকে ফিরে এসেছিলাম।
কে জানে, হয়ত রাত নেমে এলে ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলা রক্তের নেশায় অ্যাবের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে জীবন্ত মানুষ খুঁজতে থাকে।

কেবল ভালো মানের ফোন থাকলেই চমৎকার ছবি পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন কিছু কৌশল আর সৃজনশীলতা। কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনার সাধারণ স্মার্টফোন দিয়েই এই ঈদে প্রফেশনাল মানের সব ছবি তোলা সম্ভব।
৩৬ মিনিট আগে
কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
৪ ঘণ্টা আগে
কলম আমার বয়সী মানুষের কাছে খুব পছন্দ আর শখের বস্তু। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মই চক বা পেন্সিল থেকে শুরু করে বলপেন হয়ে স্মার্টপেনের বিবর্তন দেখতে পেয়েছে। এর আগে ঘড়ি নিয়ে আমার একটা লেখা সম্পর্কে অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কলম নিয়ে লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সে সূত্রে আজ বলা যাক কলমের গল্প।
৫ ঘণ্টা আগে
বারিধারার এই ডুপলেক্স ভবনের দক্ষিণের মাস্টার বেডরুমটা বুড়ো আমজাদ সাহেবের এখন স্থায়ী ঠিকানা। পাশের ঝকঝকে টয়লেট আর লেক ভিউ বারান্দাটাও তার। শরীর আর মনের যে অবস্থা, তাতে জুম্মার নামাজে মসজিদে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তিনি। জায়নামাজে বসে তসবিহ গোনা আর শেলফের উপরে রাখা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি
৫ ঘণ্টা আগে