পাকিস্তানের মধ্যস্থতা

শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, তেহরানে আনন্দ মিছিল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

যুদ্ধবিরতির খবরে ইরানে সাধারণ নাগরিকদের সড়কে আনন্দ মিছিল। ছবি: আলজাজিরা

শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুক্তিবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি তখনই কার্যকর হবে, যখন ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে’ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে জানিয়েছে তিনি বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি– ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’

যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় উভয়পক্ষ স্বাগত জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উভয় দেশ যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছে, আমি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। এই উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতায় দুপক্ষই অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।

শাহবাজ শরীফ জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনার জন্য’ ১০ এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে একটি বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। সেখানে উভয়পক্ষের প্রতিনিধি দলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি, ইসলামাবাদ আলোচনা টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও সুসংবাদ জানাতে ইচ্ছুক।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিতে রাজি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।

ট্রাম্প আরও লেখেন, এই স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হচ্ছে– ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

অন্যদিকে, ইরান সরকার ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এটিকে শাসকগোষ্ঠীর একটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এসএনএসসিআই) থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান এই যুদ্ধে তার প্রায় সব লক্ষ্যই অর্জন করেছে এবং শত্রুপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সরাসরি অনুমোদনেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির খবরে ইরানে সাধারণ নাগরিকদের সড়কে আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে।

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছেড়া পতাকার সঙ্গে যুদ্ধের শুরুর দিকে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির গত জানুয়ারির একটি বিবৃতিতে শেয়ার করেছে।সেখানে আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসাব।’

ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে ভয়াবহ হামলার যে হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন ট্রাম্প, সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নাটকীয় মোড় নেয় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, দাবি না মানলে ‘পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। তবে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে নাটকীয়ভাবে তেহরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

যে শর্তে যুদ্ধবিরতি

ট্রাম্প জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তের এই সমঝোতার প্রধান শর্ত হলো– হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে ইরানের দেওয়া অবরোধ স্থগিত করা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তেহরান পাল্টা আক্রমণ বন্ধ রাখবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে ইরানের ওপর ইতোমধ্যে হামলা বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মধ্যস্থতায় পাকিস্তান

এই যুদ্ধবিরতির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিত জানিয়েছেন, সরাসরি আলোচনার বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। তবে প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।

যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল

ট্রাম্পের ঘোষণার পর এবার ইসরায়েলও ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রথম এই তথ্য জানায়, যা পরে ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ‘কান’ও প্রচার করেছে।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের সূত্র জানিয়েছে, ইরান যখনই আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।

তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। এমনকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ভেতরেও এখন পর্যন্ত ‘হামলা বন্ধ’ রাখার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করা হয়নি বলে জানা গেছে।

তেলের বাজারে প্রভাব

যুদ্ধবিরতির খবর আসার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১৭ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

সম্পর্কিত