ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননে ধ্বংস ‘শিক্ষার্থী প্রজন্ম’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৩: ১৮
লেবাননের বৈরুতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খেলছে শিশুরা। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট চরমে পৌঁছেছে। পড়ালেখার সুযোগ বঞ্চিতদের মাধ্যমে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যাদের মধ্যে নেই কোনো ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। এই সংকট জাতীয় ঐক্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে বহু বিদ্যালয় ধ্বংস করেছে ইসরায়েল। হামলায় ঘরবাড়ি ধ্বংসে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত। শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হচ্ছে।

লেবানন কর্তৃপক্ষ অনলাইনসহ বিকল্প মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীই এই ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকছে। শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়ে জোর দিলেও মানবিক নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার বিষয় থাকছে উপেক্ষিত।

শিক্ষা গবেষক কার্লোস নাফাহ বলেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ হলো যোগ্য ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলা। ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে। সন্তানেরা কিছুই শিখছে না। আমরা স্বীকার না করলেও একটি প্রজন্ম হারিয়ে ফেলেছি।

বাস্তুচ্যুত ৫ লাখ শিক্ষার্থী

বছর দুয়েকের মধ্যে দ্বিতীয়বার লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু এর মধ্যেও ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে দাবি দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর।

ইউনেস্কোর তথ্যে, গত মার্চে ইসরায়েল আবার লেবাননে হামলা শুরু করে। এতে এখন দেশটির ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ স্কুলশিক্ষার্থী। হামলায় অনেক বিদ্যালয় এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নেই।

ইউনেস্কোর তথ্যে, লেবাননের ৩৩৯টি বিদ্যালয় যুদ্ধের ভয়াবহতার সাক্ষী। ঝুঁকিতে শতাধিক বিদ্যালয়। অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র। এতে প্রায় আড়াই লাখ শিশুর শিক্ষাজীবনে সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানেরা আর্থিক কারণে এই ব্যবস্থায় পড়তে পারছে না। ২০১৯ সাল থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দার পর এখন আবার যুদ্ধের কারণে শিক্ষাজীবনে বিঘ্ন ঘটেছে।

আসফারি ইনস্টিটিউট ফর সিভিল সোসাইটি অ্যান্ড সিটিজেনশিপের জ্যেষ্ঠ গবেষক তালা আবদুলঘানি বলেন, হাইব্রিড শিক্ষাই এখন লেবাননের স্বাভাবিক পদ্ধতি। কিন্তু ইন্টারনেটের অপ্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ সংকট, ডিভাইসের অভাব ও অনিরাপদ জীবনযাপনের কারণে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীরা এই পদ্ধতির বাইরে রয়েছে।

ইউনেস্কোর জ্যেষ্ঠ শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ মাইসুন শেহাব বলেন, শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জীবন, বন্ধুত্ব ও স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে। তারা মানসিক আঘাত, উদ্বেগ, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। একইসঙ্গে শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে বাড়ছে।

লেবানিজ সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজের তথ্যে, ২০১১ সালে দেশটির আয়বৈষম্য ০ দশমিক ৩২, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ০ দশমিক ৬১ হয়েছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় লেবাননকে বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে।

আবদুলঘানি বলেন, যুদ্ধের প্রভাব দেশের সবখানে সমান নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্ধারণ করছে কোন শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে, কে পাবে না।

চাপে শিক্ষকরা

যুদ্ধের প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদের জীবনেও ফেলছে। কম বেতন ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষক অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের আয় প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

মাইসুন শেহাব বলেন, শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে এই খাতের ৩০ শতাংশ মানুষ দেশ ছেড়েছেন বা পেশা বদলেছেন। যুদ্ধের কারণে অনেক শিক্ষক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং জীবনহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি দক্ষ ব্যক্তি। তবে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও মানবিক সহায়তার ঘাটতির মতো কাঠামোগত সমস্যার কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেমন উদ্যোগ প্রয়োজন, তা তিনি পাচ্ছেন না।

আবদুলঘানির ভাষ্যে, জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। লেবানন পুরো একটি প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো থেকে হারিয়ে ফেলবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত