এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন

আরাকান আর্মির হত্যাযজ্ঞ: ২ বছরেও প্রতিকার পাননি রোহিঙ্গারা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ১০: ৩৩
মিয়ানমারের রাখাইনের বুথিডংয়ে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের রূপ ছিল এমন নৃশংস। ছবি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সৌজন্যে

মিয়ানমারের রাখাইনে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি শত শত রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিলে অনেক আহত হন এবং প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনার দুই বছর পরেও জীবিতরা গ্রামে ফিরতে পারেননি। বেশির ভাগ রোহিঙ্গারা কার্যত বন্দিদশায় জীবন কাটাচ্ছেন।

২০২৪ সালের ২ মে রাখাইনের বুথিডংয়ের হোইয়ার সিরি গ্রামে আরাকান আর্মির এই হত্যাযজ্ঞের ঘটনাকে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’ উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। যদিও মিয়ানমারের প্রত্যন্ত গ্রামটিতে চালানো এ হত্যাযজ্ঞের দায় কখনো স্বীকার করেনি আরাকান আর্মি।

‘স্কেলেটনস অ্যান্ড স্কালস স্ক্যাটার্ড এভরিহোয়ার: আরাকান আর্মি ম্যাসাকার অব রোহিঙ্গা মুসলিমস ইন হোইয়ারসিরি, মিয়ানমার’ শীর্ষক ৫৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন গতকাল সোমবার থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২ মে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়। লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে গ্রামবাসীরা প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যাওয়ার সময় গোলাগুলির মুখে পড়েন। প্রাণে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন পরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। এরপর হত্যাযজ্ঞের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। ততদিনে বছর খানেক সময় গড়িয়ে গেছে।

ওই গ্রাম থেকে পালিয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন রোহিঙ্গা ওমর আহমদ। পরে তাঁর ঠাঁই হয় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। তিনি ওই হত্যাযজ্ঞের বিশদ বিবরণ দেন।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান’ হোইয়ার সিরিতে বেসামরিক মানুষকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও বেঁচে যাওয়া স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগ, রাখাইনে থাকার সময় আরাকান আর্মি ভুক্তভোগীদের অনেককেই জোর করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এলাকাটি সফর করেন। তখনো ভুক্তভোগীদের ভিডিওতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বয়ান, স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার যাচাই করা ছবি ও ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ঘটনাস্থলে বেসামরিক মানুষদের ক্ষতি থেকে রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি তারা যুদ্ধ আইন লঙ্ঘনও করে থাকতে পারে। অন্যদিকে, আরাকান আর্মি সেখানে বেসামরিক মানুষদের হত্যা ও সম্পত্তি ধ্বংস করে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’ করেছে।

বেসামরিক মানুষদের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা, হত্যা, বেআইনি আটক, হেফাজতে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার, অগ্নিসংযোগ ও বেসামরিক সম্পত্তি ধ্বংস, লুটপাট ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসহায়তা দিতে ব্যর্থতা– এমন নানা অপরাধ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আরাকান আর্মির সদস্যরা শুরুতে ওই গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়া বেসামরিক মানুষদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালায়। তখন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ সাদা পতাকা নাড়াচ্ছিলেন। ভুক্তভোগী একজন বলেন, ওরা প্রথমে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর আমার স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে, শেষে আমার আরেক মেয়েকেও গুলি করে।

বেঁচে ফেরা একজন নারী জানান, আরাকান আর্মির যোদ্ধারা কয়েকজন গ্রামবাসীকে মসজিদের পাশে ধানখেতে জড়ো করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। তিনি বলেন, কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি। আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হন। আরাকান আর্মির সদস্যরা যখন দেখল, তিনি তখনো বেঁচে আছেন; তখন আরও কাছ থেকে কয়েক দফা গুলি চালায়।

এইচআরডব্লিউর তালিকা অনুযায়ী, ১৭০ জনের বেশি গ্রামবাসী নিহত হয়েছেন বা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে ৯০ শিশু রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ২০২৪ সালে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির শত শত রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিককে হত্যা এবং গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতকে নিষ্ঠুরতার এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা কার্যত আরাকান আর্মির কাছে বন্দি। তারা কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি।

২০২৩ সালের নভেম্বরে রাখাইনে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হয়। বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং বেআইনিভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য উভয়পক্ষই দায়ী বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

গত এক দশকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধন, গণহত্যাসহ অন্যান্য নৃশংসতা চালিয়েছে। ফলে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলছে, হোইয়ার সিরির গণহত্যা প্রমাণ করে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রাখাইনে ফিরে যাওয়া এখনো নিরাপদ নয়।

মীনাক্ষী আরও গাঙ্গুলী বলেন, ২০২৪ সালে হোইয়ার সিরিতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের দুর্দশার প্রতি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উদাসীন ছিল। জান্তা তাদের ব্যাপক মানবাধিকারের উদ্বেগগুলো সমাধানের জন্য কিছুই করেনি। বিশ্বের সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর উচিত, অবিলম্বে মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মি– উভয়পক্ষকেই রাখাইনের সমস্ত সম্প্রদায়ের অধিকারকে সম্মান করার জন্য চাপ দেওয়া।

সম্পর্কিত