দ্য ইনডিপেন্ডেন্টের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কেন প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসকেরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির তথ্য জানিয়ে তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের দাবি তুলেছেন ৩৬ জন মার্কিন চিকিৎসক। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং অসংলগ্ন আচরণের জেরে তাঁরা এই জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষ করে ইরান পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর অসংলগ্ন আচরণ এবং সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি অদ্ভুত সব মিম শেয়ার করার প্রবণতা নীতিনির্ধারক ও চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সম্প্রতি চীন সফরের আগমুহূর্তে ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ অ্যাকাউন্টে বেশ কিছু বিতর্কিত ছবি পোস্ট করেন। একটি ছবিতে দেখা যায় বারাক ওবামা, জো বাইডেন এবং ন্যান্সি পেলোসি ময়লা ও আবর্জনার পুকুরে সাঁতার কাটছেন, যার ক্যাপশনে লেখা ‘ডেমোক্র্যাটরা পয়ঃনিষ্কাশন পছন্দ করে’। অন্য একটি ছবিতে ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিৎজকারকে ফাস্ট ফুড খেতে দেখা যায়, যেখানে ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি শিকাগোকে নিরাপদ রাখার চেয়ে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বেশি ব্যস্ত। এর আগে ট্রাম্প নিজেকে যিশু খ্রিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করে ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

অসংলগ্ন বক্তব্য ও নীতিনির্ধারকদের অস্বস্তি

প্রকাশ্য সভায় বা টেলিভিশনে প্রচারিত ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের অসংলগ্ন কথাবার্তা এখন নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বাস্তব প্রমাণ ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার কথা বললেও, ট্রাম্প জোর দিয়ে দাবি করেন, অবরোধ সফল। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাথরের মতো নিশ্চল মুখ দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—তাঁরা কি তাঁদের কমান্ডারের এই পতন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন? একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন রিয়ার অ্যাডমিরাল মন্তব্য করেছেন, ‘ট্রাম্প এখন অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাল্পনিক জগতে বাস করছেন।’

চিকিৎসকদের জরুরি হস্তক্ষেপের ডাক

গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন নোবেলজয়ী চিকিৎসকসহ ৩৬ জন শীর্ষস্থানীয় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের অবিলম্বে অপসারণ দাবি করেন। এই বিবৃতি যুক্তরাষ্ট্রের দাপ্তরিক ‘কংগ্রেসনাল রেকর্ড’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দিনকে দিন জনসাধারণের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠা একজন প্রেসিডেন্ট থেকে আপনাদের সতর্ক করছি।’

প্রখ্যাত ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ব্যান্ডি এক্স লি দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, ‘ট্রাম্পের এখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। একজন সাধারণ মানুষের কাছেও তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের পতন চোখে পড়বে।’ ড. লি ২০১৬ সালে ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন।

২৫তম সংশোধনীর দাবি

গত ১১ মে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রালফ নাডার কংগ্রেসের কাছে পাঠানো খোলা চিঠিতে ২৫তম সংশোধনী কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই সংশোধনী অনুযায়ী শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম কোনো প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেস অপসারণ করতে পারবে। চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, ‘এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে ট্রাম্পের উপস্থিতি মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে জুয়া খেলার মতো।’ চিঠিতে তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং মন্ত্রিসভার প্রধান কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ডিক্টেটরসুলভ (একনায়কাতান্ত্রিক) আচরণে মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।

শারীরিক পতনের প্রমাণ ও অনিদ্রা

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে ট্রাম্প নয়বার চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন অথবা জেগে থাকার লড়াই করছিলেন। এর আগে অন্য একটি অনুষ্ঠানে তিনি ২০ মিনিট যাবৎ নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। হোয়াইট হাউস অবশ্য এই বিশ্লেষণে ক্ষুব্ধ হয়ে একে স্রেফ ‘চোখ পিটপিট করা’ বলে দাবি করেছে।

‘দ্য ডেইলি বিস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে গভীর রাত বা শেষ রাতে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করার হার ছিল নজিরবিহীন। পুরো মাসে মাত্র ৫ দিন তিনি পর্যাপ্ত ঘুমাতে পেরেছেন। তাঁর পোস্টগুলোর এক-তৃতীয়াংশই আসে রাতের বেলায়। ড. লি-র মতে, ঘুমের এই ভয়াবহ ঘাটতি মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: ‘সাইকোটিক স্পাইরাল’

ড. ব্যান্ডি লি ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থাকে ‘সাইকোটিক স্পাইরাল’ বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প নিজেকে ঈশ্বর বা যিশুর মতো ভাবছেন এবং সারাক্ষণ বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব পোস্ট করছেন। এগুলো আসলে তাঁর অসহায়ত্ব লুকানোর মরিয়া প্রচেষ্টা। ড. লি আরও দুটি বিশেষ লক্ষণের কথা উল্লেখ করেন: ‘ডিসইনহিবিশন’ (আবেগ ও উগ্রতা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা) এবং ‘পারসিভারেশন’ (একই চিন্তার বারবার পুনরাবৃত্তি)। তাঁর মতে, ট্রাম্প যখনই সমালোচনার মুখে পড়েন, তখনই তিনি দ্বিগুণ শক্তিতে আক্রমণ করেন।

রবার্ট রাইখের ভবিষ্যদ্বাণী ও রাজনৈতিক সমীকরণ

মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার রবার্ট রাইখের মতে, আগামী চার মাসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরাই তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে রিপাবলিকান ভোটাররাই ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। রাইখের মতে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালে জে ডি ভ্যান্স এবং মার্কো রুবিও ২৫তম সংশোধনী ব্যবহার করে ট্রাম্পকে অপসারণের গোপন চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন।

মজার বিষয় হলো, এমন চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা একসময় জো বাইডেনের বিরুদ্ধেও উচ্চারণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত জ্যাক ট্যাপার এবং অ্যালেক্স থম্পসনের বইয়ে দাবি করা হয়েছিল, বাইডেনের চারপাশের লোকজন তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বিষয় গোপন রাখার চেষ্টা চালিয়েছিল।

তবে ড. লি এবং তাঁর সহযোগী চিকিৎসকদের মতে, ট্রাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি বাইডেনের চেয়েও জটিল। তাঁরা কংগ্রেসকে ‘বিশেষ বডি’ বা কমিটি গঠন করে ট্রাম্পের ডিমেনশিয়া বা অন্য কোনো মানসিক রোগ আছে কি না, তা পরীক্ষা করার কথা বলেছেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি এখন কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, আর কতদিন বিশ্ব এই বিপদের সাইরেন শুনেও নীরব থাকবে?

(দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত