সফট সেভিং কী, সঞ্চয়ের এই নতুন নীতিতে কেন মজেছে জেন-জিরা

মনে রাখবেন, টাকা জমানো আর জীবন উপভোগ করার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। নির্দিষ্ট সীমা মেনে চললে আজকের দিনটাও সুন্দর হবে। আবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১৪: ০৮
সফট সেভিং-এর মূল কথা হলো বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করা। স্টিম গ্রাফিক

‘আগে টাকা জমাও, পরে খরচ করো।’ বা ‘এখন কষ্ট করলে শেষ বয়সে সুখে থাকবে।’—বড়দের কাছে এই উপদেশ শোনেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। তাঁরা বলেন, কঠোর পরিশ্রম ও সঞ্চয় আর্থিক নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কিন্তু এই যুগের বাস্তবতায় নিয়মটা কি ঠিকঠাক কাজ করছে?

বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। মাস শেষে সংসার চালানোই যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। যে ভবিষ্যতের জন্য কষ্ট করছি, সেই ভবিষ্যৎ কি আদৌ সুখের হবে?

এসব ভেবে তরুণ প্রজন্মের সঞ্চয়ের ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। তারা ভবিষ্যতের সুখের আশায় বর্তমানকে হেলাফেলা করতে চান না। সঞ্চয় করলেও তা কঠোরভাবে নয়। এই ধারণাকেই পশ্চিমা বিশ্বে ‘সফট সেভিং’ বলা হয়।

সফট সেভিং আসলে কী

সফট সেভিং-এর মূল কথা হলো বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করা। ধরুন, আপনার বেতন খুব বেশি না। আপনি হয়তো সব শখ বাদ দিয়ে ডিপিএস করতে পারতেন। কিন্তু সফট সেভিংয়ে বিশ্বাসী কেউ হলে, এ থেকে কিছুটা টাকা জমাবেন। কিন্তু বেতনের বড় অংশ জীবনমান উন্নত করতে খরচ করবেন। মাসে একবার ভালো রেস্তোরাঁয় খাবেন। পাহাড়ে বা সমুদ্রে ঘুরতে যাবেন। মানসিক শান্তির জন্য নিজের পছন্দের কাজ করবেন।

বর্তমানে প্রজন্ম বা জেন-জিদের কাছে এই প্রবণতা বাড়ার কিছু বাস্তব কারণ আছে। এ ব্যাপারে বিশ্লেষক ব্রি শেলিটো বলেন, ‘জেন-জিদের অনেকেই বড় হয়েছে মহামারি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট কিংবা চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো কঠিন সময়ে। তাদের অনেকের কাছেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত একটা বিষয়। তাই বর্তমানের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি যৌক্তিক মনে হচ্ছে।’

ব্রি শেলিটোর মতে, জেন-জি দেখছে যে মিলেনিয়ালরা সবকিছু ঠিকঠাক করার পরও বাড়ি কিনতে, সন্তান বড় করতে কিংবা মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। প্রশ্ন আসছে, পুরোনো নিয়ম যদি কাজই না করে, তাহলে কেন সেগুলো মেনে চলতে হবে?

শেলিটো আরও বলেন, দিন শেষে মানসিক শান্তি জরুরি। তাই বেড়াতে যাওয়া বা নতুন অভিজ্ঞতার পেছনে খরচ করতে তরুণরা এখন দ্বিধা করেন না।

এখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরও বড় প্রভাব রয়েছে। ফেসবুকে মানুষের জীবনযাপন দেখে তরুণদের মধ্যে ‘ভালো থাকার’ আকাঙ্ক্ষা বাড়ে। শেলিটোর মতে, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনযাপনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এটি মানুষের চাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তাই অন্যদের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে খরচের প্রবণতাও বাড়ছে।

সফট সেভিংয়ের খারাপ দিকও আছে

সফট সেভিং মানুষকে বর্তমানে বাঁচতে শেখায়। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। অনেক সময় অবসরের পর সেই জমানো টাকা উপভোগ করার সময় ও বয়স থাকে না।

সফট সেভিং এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচায়। নিজের মানসিক শান্তির জন্য কিছু টাকা খরচ করলে কাজেও মনোযোগ বাড়ে। মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে।

সফট সেভিংয়ের কিছু খারাপ দিকও আছে। এগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। যেমন বিনিয়োগের লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। সঞ্চয় কম করলে দীর্ঘমেয়াদে জমানো টাকার পরিমাণ অনেক কমে যায়।

আরেকটি সমস্যা হলো, আর্থিক দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি। আয় বুঝে ব্যয় না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। শেলিটোর মতে, ‘আর্থিক নিরাপত্তা আমাদের মানসিক শান্তি দেয়। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অবহেলা করলে উল্টো মানসিক শান্তি নষ্ট হতে পারে।’

সঞ্চয় কম থাকলে জরুরি সময় টাকার অভাব হতে পারে। যেমন অনেক সময় চাকরি হারানোর ঝুঁকিও থাকে। হঠাৎ বড় অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ সময় আপৎকালীন টাকা না থাকলে সমস্যায় পড়তে পারেন।

সফট সেভিংস করার সঠিক উপায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, সফট সেভিং মানে বেহিসাবি খরচ নয়। শেলিটো বলেন, সফট সেভিংয়ের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা।

বেতন পাওয়ার পর আগের মাসের সঞ্চয়ের টাকা সরিয়ে রাখুন। এরপর বাকি টাকার ভেতর থেকেই নিজের শখ মেটান। অন্যের দামি জিনিস দেখে প্রভাবিত হবেন না। আয় অনুযায়ী ব্যয় করার মানসিকতা রাখুন।

মনে রাখবেন, টাকা জমানো আর জীবন উপভোগ করার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। নির্দিষ্ট সীমা মেনে চললে আজকের দিনটাও সুন্দর হবে। আবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

  • রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত