২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকার সরাসরি ইরান অভিমুখে সামরিক অভিযান বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেহরানের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার বিপরীতে ইরানের বিধ্বংসী ‘ডিরেক্ট কাউন্টার-অ্যাটাক’ এবং হরমুজ প্রণালিকে সার্বভৌম ঘোষণা করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা পরাশক্তিদের দীর্ঘদিনের দাবার চালকে সম্মুখ সমরে নিয়ে এসেছে।
একদিকে ওয়াশিংটন তার ন্যাটো মিত্রদের অনীহা এবং ট্রাম্পের ‘ন্যাভাল ব্লকেড’ নীতির মাধ্যমে হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারে মরিয়া, অন্যদিকে মস্কোর উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা কবচ ইরানকে এক দুর্ভেদ্য রাজনৈতিক প্রাচীর দান করেছে। আব্বাস আরাঘচির নিপুণ ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ এবং তুরস্কের এরদোয়ানের ভারসাম্য রক্ষা ও নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে যে, এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আর একক কোনো শক্তির হাতে নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর এবং চীনের কৌশলগত অনড় অবস্থান বিশ্বকে এক বহুমুখী ক্ষমতার মেরুকরণের দিকে ধাবিত করেছে, যেখানে তেল, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত হিসেবি। হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে জাতিসংঘের ভেটো পর্যন্ত প্রতিটি চালে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের ত্রিমুখী প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক মহাকাব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা সরাসরি সংঘাত
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ভোরে ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ বিমান হামলা ইরানের কৌশলগত পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এক প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির সূচনা করে। তবে ইরানের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার নজিরবিহীন ‘ডিরেক্ট কাউন্টার-অ্যাটাক’ বিশ্বশক্তিগুলোকে স্তম্ভিত করে দেয়। তেহরানের নিক্ষিপ্ত নির্ভুল ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত আল-উদাইদ ও আইন আল-আসাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একই সঙ্গে ইরানের শ্যাডো বাহিনীগুলোর সমন্বিত প্রক্সি হামলায় ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিবের প্রধান সামরিক অবকাঠামো এবং আয়রন ডোম সিস্টেমগুলো কার্যত বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এই পাল্টা আঘাত কেবল আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। এরফলে কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধটি এক ভয়াবহ সরাসরি সংঘাতের রূপ নেয় যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করে।
হরমুজ প্রণালি: ইরানের ‘সভরেইন’ ঘোষণা এবং আমেরিকার ন্যাভাল ব্লকেড
সংঘাত চরম রূপ নিলে ইরান কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে তাদের পূর্ণ ‘সার্বভৌম এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই ঘোষণার পরপরই তেহরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ ও শুল্ক আরোপের নতুন রেগুলেশন জারি করে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলোতে কঠোর ‘ন্যাভাল ব্লকেড’ বা নৌ-অবরোধ আরোপ করলে পারস্য উপসাগর কার্যত এক দুর্ভেদ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ট্রানজিট পারমিশন
ইরানের নতুন নীতি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো বিদেশি জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের বিশেষ কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি বা ‘ট্রানজিট পারমিশন’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সাথে, এই জলপথ ব্যবহারকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজ থেকে মোটা অঙ্কের টোল আদায়ের ঘোষণা বিশ্ব বাণিজ্যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজার তাৎক্ষণিকভাবে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছায় এবং এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয়। ইরান এই অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে পশ্চিমাদের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করে।
ডাবল ব্লকেড: ট্রাম্পের নৌ-অবরোধ বনাম ইরানের হরমুজ হুঙ্কার
ইরানের কঠোর অবস্থানের জবাবে ২০২৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বন্দরগুলোর ওপর সর্বাত্মক ‘ন্যাভাল ব্লকেড’ বা নৌ-অবরোধের নির্দেশ দেন। এরফলে পারস্য উপসাগরে এক উত্তপ্ত ‘ডাবল ব্লকেড’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে একদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়, অন্যদিকে আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ইরানের আমদানি-রপ্তানি সম্পূর্ণ অচল করে দেয়। এই পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধানতম সমুদ্রপথটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন স্থবিরতা নিয়ে আসে। সাগরে দুই শক্তির এমন মুখোমুখি অবস্থান কেবল জ্বালানি নয়, বরং বৈশ্বিক খাদ্য ও শিল্পজাত পণ্যের বাজারেও চরম অচলাবস্থা তৈরি করে।
ন্যাটোর দ্বিধা ও তুরস্কের কৌশলগত ভারসাম্য
২০২৬ সালের এই ভয়াবহ সংকটে ওয়াশিংটন তার মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সামরিক সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়, যা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটলকে স্পষ্ট করে তোলে। একদিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দেয়, অন্যদিকে তুরস্ক তার ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে এক জটিল ভারসাম্যের রাজনীতি শুরু করে। এই ত্রিভুজমুখী কূটনৈতিক অবস্থানে একদিকে রাশিয়ার প্রভাব এবং অন্যদিকে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও অনিশ্চিত সমীকরণে দাঁড় করায়।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন সমীকরণ
এই যুদ্ধে আমেরিকার অন্যতম মিত্ররা বিশেষ করে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো শুরুতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে অনীহা প্রকাশ করে। যুক্তরাজ্যের কিছু সহায়তা থাকলেও ফ্রান্স ও জার্মানি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেয়। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নেয়, যখন ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে।
ফ্রান্স ও জার্মানি শুরুতে সরাসরি সংঘাতের বিরোধিতা করলেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১২ মে ২০২৬ তারিখে ফ্রান্স তাদের অত্যাধুনিক রণতরী ‘চার্লস ডি গল’ পারস্য উপসাগরের অভিমুখে পাঠানোর ঘোষণা দেয়। এর ঠিক দুদিন আগে, ১০ মে ২০২৬ তারিখে যুক্তরাজ্য তাদের রয়্যাল নেভির অতিরিক্ত দুটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করে, যা মূলত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং প্রণালি উন্মুক্ত রাখার মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জার্মানিও পিছিয়ে নেই, ১৭ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে বার্লিন তাদের নৌ-কমান্ডো ও লজিস্টিক সাপোর্ট ভেসেল পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর এই রণতরী পাঠানোর পদক্ষেপটি একদিকে যেমন আমেরিকার ওপর সরাসরি নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ইরানের সাথে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের আগাম প্রস্তুতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। মূলত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ভয়ে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য তাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করে এই সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। এই নতুন সামরিক মেরুকরণ মে ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা যেকোনো সময় বড় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
আঙ্কারার ভারসাম্য রক্ষা: এরদোয়ানের মধ্যস্থতা ও নতুন আঞ্চলিক জোট
২০২৬-এর এই উত্তাল সময়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান কেবল হামলার তীব্র নিন্দাই জানাননি, বরং তুরস্কের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কৌশলগত অবস্থানে অনড় থেকে তুরস্ক একই সাথে রাশিয়ার সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি গোপন কূটনৈতিক ‘ছায়া পথ’ সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঙ্কারা ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও কাতারসহ অন্যান্য প্রভাবশালী আরব দেশগুলোর সাথে সামরিক ও কূটনৈতিক সমঝোতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ‘সুন্নি-শিয়া’ সংহতির আভাস দিচ্ছে।
এর বিপরীতে ইসরায়েলের সাথে তুরস্কের দীর্ঘদিনের অম্ল-মধুর সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বা তলানিতে এসে ঠেকেছে, যেখানে আঙ্কারা তেল আবিবকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করছে। তুরস্কের এই বহুমুখী চাল একদিকে যেমন ন্যাটোর সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ইরানকে একপাক্ষিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে একটি আঞ্চলিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। তুরস্কের এই ভারসাম্য রক্ষার নীতিই হয়তো বৃহত্তর পারমাণবিক সংঘাত রোধের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়াবে।
আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ: পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে নতুন অক্ষশক্তি
২০২৬ সালের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তেহরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে বিরতিহীন ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ শুরু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা সামরিক জোটের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অক্ষশক্তি গড়ে তোলা। বাহরাইন ও পাকিস্তান থেকে শুরু করে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও বেইজিং পর্যন্ত তার প্রতিটি সফর ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। বিশেষ করে বেইজিংয়ে অবস্থানকালে তিনি সৌদি আরবের সাথে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপচারিতার মাধ্যমে রিয়াদ-তেহরান সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন।
তবে পাল্টাপাল্টি চাল হিসেবে ১২ মে ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তিন দিনের এক জরুরি সফরে বেইজিং পৌঁছান। এই সফরের মূল এজেন্ডা ছিল ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে চীনকে রাজি করানো এবং বেইজিং-তেহরান কৌশলগত অংশীদারিত্বে ফাটল ধরানো। কিন্তু আরাগচি তার আগেই মস্কো ও ইসলামাবাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা আলোচনা সেরে ফেলায় ওয়াশিংটনের এই পরিকল্পনা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সফরের লক্ষ্য ছিল চীনের মধ্যস্থতায় একটি নতুন জ্বালানি নিরাপত্তা চুক্তি করা, যা প্রকারান্তরে ইরানকে বাদ দিয়েই সাজানো।
কিন্তু আরাগচি বেইজিংকে বোঝাতে সক্ষম হন যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের স্থিতিশীলতা না থাকলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এই কূটনৈতিক যুদ্ধের ফলে ২০২৬ সালের সংঘাত কেবল পারস্য উপসাগরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সরাসরি কূটনৈতিক দ্বৈরথে রূপ নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আরাঘচির এই নিপুণ দৌড়ঝাঁপ আমেরিকার একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞাকে অকার্যকর করার পাশাপাশি ইরানকে একটি দুর্ভেদ্য রাজনৈতিক প্রাচীর দান করেছে।
পরাশক্তিদের অবস্থান: রাশিয়া ও চীনের নীরব কিন্তু শক্তিশালী চাল
২০২৬ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে মস্কো ও বেইজিং সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও পর্দার আড়ালে তাদের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপগুলো আমেরিকার রণকৌশলকে বারবার থমকে দিয়েছে। একদিকে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা তথ্য এবং অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিরক্ষা কবচ ইরানকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। পরাশক্তিদের এই দ্বিমুখী চাল মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার জানান দিচ্ছে।
মস্কোর সামরিক ঢাল: ইরানের প্রতিরক্ষা ও রাশিয়ার কৌশলগত প্রত্যাবর্তন
রাশিয়া ইরানকে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ডাটা এবং রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব অটুট রাখে। বিশেষ করে ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলা ঠেকাতে রাশিয়ার উন্নত ‘ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম’ তেহরানকে এক শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় প্রদান করে। মস্কোর এই পরোক্ষ অথচ কার্যকর সামরিক সহযোগিতা ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরিকল্পনাকে বারবার ব্যর্থ ও জটিল করে তোলে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই সক্রিয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে রাশিয়ার শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনকে নিশ্চিত করেছে, যা পশ্চিমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেইজিংয়ের কূটনৈতিক ঢাল: জ্বালানি নিরাপত্তা ও ট্রাম্পের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
চীন তার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অবকাঠামোগত চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি আমেরিকার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বেইজিং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রস্তাবের বিপক্ষে ভেটো প্রয়োগ অথবা ভোটদান থেকে বিরত থেকে ইরানের জন্য এক শক্তিশালী ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
উদ্ভূত সংকটের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; যেখানে তিনি বেইজিংকে ইরান থেকে দূরে রাখতে প্রলোভন ও চাপ—উভয় নীতিই ব্যবহার করেন। তবে চীন তার নিজস্ব ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহের স্বার্থে ইরানের সাথে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বে অটল থাকে। ট্রাম্পের এই সফরের মূল এজেন্ডা ছিল চীনকে দিয়ে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করানো, যা বেইজিং অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রত্যাখ্যান করে।
এই দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করে যে, এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ এখন ওয়াশিংটনের যেকোনো সামরিক হুমকির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। চীনের এই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিরক্ষা কবচই ইরানকে বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা থেকে রক্ষা করে এক বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার ভিত মজবুত করেছে।
২০২৬ সালের এই নজিরবিহীন সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের একক নিয়ন্ত্রক হিসেবে আমেরিকার দিন ফুরিয়ে আসছে এবং বিশ্ব এক চূড়ান্ত বহুমুখী মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ইরান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বকীয় কূটনীতি এবং পরাশক্তি হিসেবে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত অংশগ্রহণ এই অঞ্চলের সংঘাতের সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দেবে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়তো কোনো সামরিক বিজয়ে নয়, বরং একটি নতুন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব হবে। তবে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং এশিয়ার উদীয়মান শক্তিগুলোর প্রভাব ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনকে তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করবে। যদি এই সংকটের প্রেক্ষাপটে কোনো বৃহৎ শান্তি আলোচনা সফল না হয়, তবে পারস্য উপসাগর হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘস্থায়ী শীতল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু।
পরাশক্তিদের এই দাবার চালে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং যারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের সমন্বয় ঘটাতে পারবে তাদের হাতেই থাকবে আগামীর বিশ্বের চাবিকাঠি। মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিপরীক্ষাই সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীর নতুন আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
- সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক