leadT1ad

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা সমঝোতায় যা আছে, কে কী পেল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ১১: ০০
সংগৃহীত ছবি

সাড়ে তিন মাসের সংঘাতের পর অবশেষে প্রাথমিক একটি সমঝোতায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। বৃহস্পতিবার প্রথম প্রহরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এতে সই করেন।

চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা হিসেবে সমঝোতা স্মারকটিতে ১৪টি দফা রয়েছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড়ের মতো বিষয় রয়েছে।

তবে ইংরেজিতে ৮০০ শব্দেরও কম এই ১৪ দফার খসড়া চুক্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর ইস্যু। একসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ইরানের তেল বিক্রির সুযোগ, বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ ফিরে পাওয়া এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের কথাও রয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বুধবার এই খসড়া সমঝোতার দফাগুলো পাঠ করে শোনান। এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোন দেশ কি পেল এবং দফাগুলোর সম্ভাব্য সংকট নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বর্তমান যুদ্ধে তাঁদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে সই করছে, যাতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রমের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করা যায়। একই সঙ্গে উভয়পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার, শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার এবং লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই দফার বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে।

পর্যালোচনা: এখানে ‘তাদের মিত্রদের’ কথা বলা হলেও ইসরায়েল বা হিজবুল্লাহর নাম সরাসরি বলা হয়নি। যদিও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই শান্তি প্রচেষ্টাকে জটিল করেছে। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সহযোগিতা কিংবা সম্ভাব্য আপত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিএনএন–এর জেক ট্যাপারকে বলেন, এই দফার অর্থ হলো, ইরানকে সহিংস সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।

২. একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।

পর্যালোচনা: প্রতীকী দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি শাসন পরিবর্তনের নীতি থেকে সরে আসছে বলে এর মাধ্যমে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তাঁদের মুক্তির সময় এসে গেছে। বর্তমান অবস্থান সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না।

৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং তা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে উভয়পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

সমালোচনা: মূলত এই এমওইউ নিজেই একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে অন্তর্বর্তী সমঝোতা। ট্রাম্প ও মাসউদ পেজেশকিয়ান ১৭ জুন এতে সই করেছেন। সে হিসেবে ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ১৬ আগস্ট। অবশ্য প্রয়োজন হলে তা বাড়ানো সম্ভব।

এর মধ্যে ইরানের ক্যালেন্ডারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ রয়েছে, যা আলোচনার গতি বা সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আশুরা (২৫ জুন) এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েক দিনব্যাপী দাফন অনুষ্ঠান এর মধ্যে রয়েছে। খামেনির দাফন-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা ৪ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে।

৪. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও সেনা সরানোর অঙ্গীকার

এই সমঝোতা সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য বিঘ্ন বা বাধা অপসারণ শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে পুরো নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। এ সময় জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের অবস্থার অনুপাতে পুনরুদ্ধার করা হবে, যা ইরান বাস্তবায়ন করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে তার বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

পর্যালোচনা: একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখানে নেই—হরমুজ প্রণালির ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা। একই সঙ্গে আশপাশের এলাকা থেকে বাহিনী প্রত্যাহারের যে উল্লেখ রয়েছে, তা সম্ভবত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে বোঝায় না। বরং যুদ্ধ চলাকালে মোতায়েন করা অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্যকে নির্দেশ করতে পারে।

৫. হরমুজ প্রণালিতে অবাধ বাণিজ্যিক চলাচল

সমঝোতা সইয়ের পর ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীতমুখী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবে। প্রযুক্তিগত ও সামরিক বাধা অপসারণ এবং ইরানের মাধ্যমে মাইন অপসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চলাচল পুনরায় শুরু হবে।

একই সঙ্গে ইরান ওমানের সঙ্গে সংলাপ করবে, যাতে অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার কাঠামো নির্ধারণ করা যায়। এই কাঠামো আন্তর্জাতিক আইন এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

পর্যালোচনা: ইরান ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচলে কোনো বাধা বা ফি আরোপ করবে না। তবে ভবিষ্যতে ইরান, ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর নতুন ফি আরোপের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে, যা বাস্তবায়িত হলে ইরানের জন্য নতুন রাজস্ব উৎস হয়ে উঠতে পারে।

৬. ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চূড়ান্ত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। এ–সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, অব্যাহতি ও অনুমতি যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

পর্যালোচনা: এর অর্থ, গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ ইরান অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। এটি এমন একটি অঙ্ক, যা ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের মূল্য কিংবা হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য জাহাজ চলাচল ফি থেকে বহু বছরের আয়ের তুলনায়ও অনেক বেশি।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থায়ন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো থেকে আসতে পারে। তবে এটি ইরানের তেল বিক্রি থেকে সম্ভাব্য আয়ের বাইরে একটি পৃথক অর্থায়ন পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

৭. সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি

যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবনা, সব একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা।

চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই স্বীকার করেছে যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত এ নিয়ে আলোচনা শুরু করে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

পর্যালোচনা: ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে ইরান শুধু তেল রপ্তানির সুযোগই পাবে না, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গেও নতুনভাবে যুক্ত হতে পারবে।

এই পদক্ষেপ জেসিপিওএ–এর চেয়েও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কারণ, ওবামা প্রশাসনের সময়কার সেই চুক্তিতে মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি–সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাগুলোই প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

বর্তমান নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশে বাধা দেয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নিষেধাজ্ঞা এমন গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেগুলোকে ওয়াশিংটন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। এর মধ্যে হিজবুল্লাহও রয়েছে। ফলে এই দফা বাস্তবায়িত হলে তা অত্যন্ত বিস্তৃত একটি ছাড় হিসেবে বিবেচিত হবে।

৮. পারমাণবিক অস্ত্র নয়, তবে পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ অনির্ধারিত

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা অর্জন না করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা একটি পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। সপ্তম দফায় বর্ণিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইএইএ–এর তত্ত্বাবধানে প্রয়োজন হলে সাইটেই তা ডাউন–ব্লেন্ড করা হবে।

ইরানের পারমাণবিক চাহিদা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং এ–সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই স্বীকার করেছে যে পারমাণবিক ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।

পর্যালোচনা: ট্রাম্পের জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে একটি সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হবে। কারণ এতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করাা প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে ইরান যুক্তি দিতে পারে, তারা এর আগেই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরের মাধ্যমে একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবে বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অনির্ধারিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরান ভবিষ্যতে কী পরিমাণে পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারবে, তা এই সমঝোতায় স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া, ইরান কোথাও পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের অঙ্গীকারও করেনি।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বহাল

চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনীও মোতায়েন করবে না।

পর্যালোচনা: বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা দখলের চেষ্টা করছে না। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র একাধিক নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল সম্পদ ও জাহাজ চলাচল নেটওয়ার্ক।

১০. ইরানের তেল রপ্তানির জন্য অব্যাহতি

সমঝোতা সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট সব সেবা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অব্যাহতি দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

পর্যালোচনা: এর ফলে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালেই ইরান নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেল বিক্রির সুযোগ পাবে। এটি ইরানের অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখতে পারে।

১১. অবরুদ্ধ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে এই সমঝোতা বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের অবরুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। কী প্রক্রিয়ায় এসব অর্থ ছাড় করা হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবে দুই দেশ। তবে যেখানেই এই অর্থ রাখা থাকুক বা স্থানান্তর করা হোক না কেন, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাকে মনোনীত করবে, তার কাছে অর্থ করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

পর্যালোচনা: এটি মোটেও ছোট কোনো পদক্ষেপ নয়। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সিএনএনকে বলেছিলেন, ইরান ২৪ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল।

তবে চূড়ান্ত অঙ্ক আরও অনেক বড় হতে পারে। ইরানি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ১২৪ বিলিয়ন থেকে ১৬৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এসব অর্থের বড় অংশ সম্ভবত বিদেশ থেকে পণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় আমদানি খাতে ব্যয় হবে।

১২. বাস্তবায়ন তদারকির জন্য পৃথক ব্যবস্থা

এই সমঝোতার সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে চূড়ান্ত চুক্তির শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

পর্যালোচনা: দুই দেশ এমন একটি কাঠামো নির্ধারণ করবে, যার মাধ্যমে চুক্তির বাস্তবায়ন যাচাই করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে অতীতের জেসিপিওএ একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হতে পারে, যদিও ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি বাতিল করেছিলেন এবং পরে ইরানও তা কার্যত ত্যাগ করে।

১৩. ধাপে ধাপে চূড়ান্ত আলোচনায় অগ্রগতি

এই সমঝোতা সইয়ের পর এবং প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম, দশম ও একাদশ দফার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পরই বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইরানকে তার অবরুদ্ধ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। একই সময়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার পরই বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জেডি ভ্যান্স এ বিষয়ে বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে এগোবে এবং প্রতিটি পক্ষের কার্যসম্পাদনের ওপর নির্ভর করবে।

তার ভাষায়, তাঁরা যদি তাঁদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আমরা তাঁদের বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বাগত জানানোর সক্ষমতা রাখি। আমাদের এই ক্ষমতাও আছে যে আমরা বলতে পারি, আপনি যদি আপনার দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে আপনি কিছুই পাবেন না।

১৪. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন

চূড়ান্ত চুক্তি একটি বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

পর্যালোচনা: এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমঝোতা স্মারকটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হলেও চূড়ান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে পুরো নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে।

এর অর্থ, চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন প্রয়োজন হবে।

এ ধরনের অনুমোদন চুক্তিটিকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত করবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন বা ইরানি সরকারের জন্য চুক্তি থেকে সরে আসা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত