নতুন টার্গেট ইরানের সেতু-রেলপথ, কী চাইছে যুক্তরাষ্ট্র

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২৩: ২৭
আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এটি প্রকাশ করে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সামরিক ও বেসামরিক সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল করতে সেতু, টানেল ও রেলপথে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাই এসব হামলার উদ্দেশ্য।

সেন্টকম ইরানের নজরদারি চৌকি, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই এসব অভিযান হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে নৌ অবরোধ বজায় রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

কেন সেতু ও টানেল

দুর্গম-পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর সঙ্গে দেশটির অন্যান্য শহরের যোগাযোগ মূলত অল্পসংখ্যক সেতু ও টানেলের ওপর নির্ভরশীল। এসব সংযোগ ধ্বংস করা গেলে সীমিত সামরিক শক্তি ব্যবহার করেই বড় এলাকা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে আলাদা হামলা চালানোর পরিবর্তে একটি সড়ক বা রেলওয়ে জংশন অচল করে দিলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত করা যায়। এতে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়।

ইরান জানিয়েছে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী হরমোজগান প্রদেশে ছয়টি সেতু এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো এই পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। ইরানের সরবরাহলাইন ব্যাহত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে দেশটির প্রভাব সীমিত করাই মূল উদ্দেশ্য।

সর্বশেষ হামলার ক্ষয়ক্ষতি

ইরানের হরমোজগান প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শহীদ মিরজায়ি টানেল উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দর আব্বাস–সিরজান সড়কের রুদখানেহ শুর সেতু এবং মিনাব–রুদান সংযোগ সড়কের আরও দুটি সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে, বন্দর আব্বাসকে ফার্স প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা খামির সেতুসহ হরমোজগানের তিনটি সেতুতে হামলা হয়। হামলার সময় সেতুগুলো দিয়ে বেসামরিক যান চলাচল করছিল। এতে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

কারাজে নির্মাণাধীন বি১ সেতুতেও হামলা চালানো হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘ সেতু এবং তেহরান থেকে পশ্চিমমুখী একটি গুরুত্বপূর্ণ বহির্গমন পথ। এ ছাড়া দেশটির উত্তরে তাবরিজ–জানজান সড়কের একটি সেতু এবং মধ্য ইরানের কাশানের কাছে একটি রেলসেতুও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

অর্থনৈতিক দিক: হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি বাজার

যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলার এই অভিযান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৃহত্তর লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার।

জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার পর এক দিনের লেনদেনেই তেলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন ১ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, এমন পরিস্থিতি তেলের বাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক’ ঘোষণা করে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ নিরাপত্তা ফি আরোপ করেন। এ সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব সরাসরি সামরিক অভিযানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে এবং ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট আক্রমণকারী নৌযান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালায়।

ইরানের প্রতিরোধ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি

তেহরান দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং বিকল্প পথ ব্যবহারের মাধ্যমে হামলার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সরাসরি হামলা থেকে অস্ত্রভাণ্ডারের একটি অংশ রক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্র টানেল ও বাঙ্কারের মতো ভূগর্ভস্থ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

একই সময়ে ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশ কুয়েত ও ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। ইরানের দাবি, দেশটির বিরুদ্ধে হামলায় যেসব দেশ নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সেতু, টানেল ও রেলপথ লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান একটি সুস্পষ্ট সামরিক কৌশলের প্রতিফলন। ভৌগোলিক সংকীর্ণ সংযোগপথগুলোতে আঘাত হেনে সবচেয়ে কম হামলায় সর্বোচ্চ প্রভাব তৈরি করাই এ কৌশলের উদ্দেশ্য।

সূত্র: ভয়েস অব এমিরেটস

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত