উঁচু ট্রাক-তারের ঝুঁকি এড়িয়ে বন্যপ্রাণীর ঝুলন্ত পথ

Multiple Authors
স্ট্রিম প্রতিবেদক ও স্ট্রিম সংবাদদাতা
টাঙ্গাইল

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০০: ০৩
টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে মহাসড়ক পারাপারে বন্যপ্রাণীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এমন পাঁচটি ঝুলন্ত পথ। ছবি: সংগৃহীত

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে মহাসড়ক পারাপারে বন্যপ্রাণীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি ঝুলন্ত পথ বা রোপওয়ে। তবে বনের ওপর দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তার ও নিচ দিয়ে চলা মালবাহী ট্রাকের ঝুঁকি এড়িয়ে এই পথ তৈরি করাটা খুব সহজ ছিল না।

বন বিভাগ বলছে, আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু হয়েছে। বন্যপ্রাণীরাও ধীরে ধীরে অভিনব এই ঝুলন্ত পথে অভ্যস্ত হচ্ছে।

উন্নত মানের নাইলনের দড়ি দিয়ে তৈরি এই রোপওয়েগুলো গত জুনে বনের টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অংশে স্থাপন করা হয়। মূলত দ্রুতগতির গাড়ির চাপায় বানর, হনুমানসহ বন্যপ্রাণীর মৃত্যু কমাতে এই উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ।

রোপওয়ে নির্মাণের কারিগরি দিক নিয়ে টাঙ্গাইল বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব স্ট্রিমকে জানান, মহাসড়কের দুই পাশের দূরত্ব প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিটার। এত দীর্ঘ একটি দড়ি শূন্যে টান টান করে বেঁধে রাখা বেশ কঠিন। এর মধ্যে রয়েছে নানামুখী ঝুঁকি।

তিনি বলেন, ‘বনের ওপর দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন গেছে। আবার নিচ দিয়ে মালবাহী উঁচু ট্রাক চলে। রোপওয়ে বেশি নিচু হলে ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগার ঝুঁকি থাকে। আবার ওপরে রয়েছে তারের বিপদ। এসব হিসাব-নিকাশ করে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় রোপওয়েগুলো বাঁধা হয়েছে।’

রানা দেব জানান, দড়ি যেন একদিকে কাত হয়ে না যায়, সেজন্য একটি গাছের বদলে কয়েকটি গাছের সঙ্গে মিলিয়ে এগুলো শক্তভাবে বাঁধা হয়েছে।

গত জুনে বসানোর পর প্রাণীরা এই পথ কতটা ব্যবহার করছে–প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু প্রাণী ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তবে এটি পুরোপুরি অভ্যস্ততার ব্যাপার। বানর বা অন্য প্রাণীদের তো আর প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। ওরা নিজে নিজেই লাফিয়ে বা হেঁটে দড়ির ওপর দিয়ে চলতে শিখছে। নিজেদের জন্য নিরাপদ মনে করলে এর ব্যবহার আরও বাড়বে।’

এক সময় মধুপুরের বনটি প্রায় ৬২ হাজার একরে বিস্তৃত ছিল। মধুপুর বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। বন উজাড়, খাবারের সংকট ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বহু বন্যপ্রাণীর জীবন সংকটে।

মহাসড়কে গাড়িচাপায় ঠিক কত বন্যপ্রাণী মারা গেছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বন বিভাগের কাছে নেই বলে জানান রানা দেব, ‘বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি মৃত্যুর ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। মূলত প্রাণহানি কমাতেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে ‘মধুপুর শালবন পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ প্রকল্পের আওতায় ঝুলন্ত পথগুলো তৈরি করা হয়েছে।’

বন বিভাগ সূত্র জানায়, বন্যপ্রাণীর জন্য রোপওয়ে নির্মাণের ঘটনা দেশে এটিই প্রথম নয়। এর আগে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে এমন রোপওয়ে ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গেছে।

রোপওয়ের দড়িগুলো সাধারণত দুই বছর পর্যন্ত টিকতে পারে। মধুপুরের উদ্যোগ নিয়ে রানা দেব আরও বলেন, ‘আপাতত এই পাঁচটি পরীক্ষামূলক হিসেবে করা হয়েছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি কী পরিমাণ প্রাণী এটি ব্যবহার করছে এবং এর স্থায়িত্ব কেমন হয়। সুফল পেলে ভবিষ্যতে এমন আরও রোপওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হবে।’

‎টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এস এম সাইফুল্লাহ জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের রোপওয়ে করিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে। তা থেকে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।

এক সময় মধুপুরের বনটি প্রায় ৬২ হাজার একরে বিস্তৃত ছিল। মধুপুর বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। বন উজাড়, খাবারের সংকট ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বহু বন্যপ্রাণীর জীবন সংকটে। এই রোপওয়ে নির্মাণের ফলে কিছুটা হলেও, তাদের অবাধ বিচরণ নিরাপদ হবে বলে আশা করা যায়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত