ট্রাম্পের জ্বালানি অবরোধ

এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বার অন্ধকারে কিউবা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

গত সোমবার কিউবায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্যে মালেকন উপকূলে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবরোধের মধ্যে কিউবায় এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টায় দেশজুড়ে বিদ্যুৎ চলে যায়। সারারাত অন্ধকারে ডুবে ছিল পুরো দ্বীপ। খবর আলজাজিরার।

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা ইউনিয়ন ইলেক্ত্রিকা দে কিউবা জানিয়েছে, বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে (২০:৩০ জিএমটি) বিভ্রাট শুরু হয়। তবে কেন এই বিভ্রাট, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

এর আগে সোমবারও দেশটি জুড়ে একই ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছিল। চলতি বছরে এ নিয়ে চারবার পুরো কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলো। এর মধ্যে মার্চ মাসেই ঘটেছিল দুটি বড় বিপর্যয়।

কিউবায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুন নয়। দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বড় অংশই ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে নির্মিত। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই ব্যবস্থায় মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হয়েছে মার্কিন জ্বালানি অবরোধ। জানুয়ারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে কার্যত বিদেশি তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেন।

কিউবা বর্তমানে আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। ১৯৬০ এর দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরের দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এর সঙ্গে বর্তমান কড়া নিষেধাজ্ঞা কিউবার অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারের পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে হাভানার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তুলে আসছে তার দেশ।

এর মধ্যে গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন দেন ট্রাম্প। ওই অভিযানে কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়। সেখানে মাদক ও অস্ত্র–সংক্রান্ত মামলায় কারাবন্দী আছেন তিনি।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলা আর কিউবায় তেল ও অর্থ পাঠাবে না। তাঁর প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণও ধরে রেখেছে।

২৯ জানুয়ারি ট্রাম্প আরেকটি নির্বাহী আদেশে কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একসঙ্গে কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী যেকোনো দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়।

এরপর থেকে মাত্র একটি রুশ তেলবাহী জাহাজ কিউবায় পৌঁছেছে। সেটিও মার্চ মাসে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কিউবা নিজেদের চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ তেল উৎপাদন করেছিল। বাকি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির এই সংকট সাধারণ মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। পরিবহনের মতো জনসেবামূলক খাতও ব্যাহত হচ্ছে।

জুনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিউবায় শিশু মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এক বিবৃতিতে তুর্ক বলেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে জ্বালানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ এবং সাম্প্রতিক অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে কিউবার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের অভাবে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এ সংকটের জন্য কিউবা সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছে।

মার্চে আলজাজিরাকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে তারা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি।

জ্বালানি অবরোধের আগে কিউবা সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছিল। পরে চীন থেকে আমদানি করা সৌর প্রযুক্তির সহায়তায় সেই রূপান্তরের গতি বাড়ানো হয়।

তবে ২০২২ সালের হিসাবে কিউবার মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র ১৮ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে দেশটির। তবে তা দিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত