ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ

যুদ্ধের ট্রমা থেকে তরুণ প্রজন্মকে বের করে আনার চেষ্টা ইউক্রেনের

রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ইউক্রেনের একের পর এক শহর ধ্বংস হচ্ছে, এর অগোচরেই দেশটির ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরী হচ্ছে বড় একটি সংকট। যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে না, গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করছে শিশু-কিশোরদের মনে। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় শিশুদের জোরপূর্বক পরিচয় বদল এবং মা - বাবা হারিয়ে একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যুদ্ধের ট্রমা নিয়ে।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক
ঢাকা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ০৪
ইউক্রেনের খারকিভের একটি ভূগর্ভস্থ স্কুলের করিডোরে শিক্ষার্থীরা খেলছে। সংগৃহীত ছবি

রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের অগোচরে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরি হচ্ছে বড় একটি সংকট। ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি যুদ্ধের গভীর মানসিক ক্ষত ও পরিচয় হারানোর ট্রমা (গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট) নিয়ে বেড়ে উঠছে দেশটির শিশুরা।

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর বিপুলসংখ্যক ইউক্রেনীয় শিশু রুশ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাদের কেউ দখলকৃত ইউক্রেনেই রয়েছে, আবার কাউকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাশিয়ায়। সেখানে তাদের রুশ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ঢুকিয়ে রাশিয়াপন্থী প্রচারণার মুখোমুখি করা হচ্ছে। তাদের চিন্তা ও পরিচয় বদলে এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যাতে একসময় তারা নিজেদের দেশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়।

রুশ দখলদারত্বের মধ্যে থাকা ইউক্রেনীয়দের সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা ‘সেভ ইউক্রেন’-এর প্রধান আইন বিশেষজ্ঞ মিরোস্লাভা খারচেঙ্কো বলেন, ‘শিশুদের শুরুতেই বোঝানো হয় যে তাদের বাবা-মা আর কখনো তাদের নিতে আসবেন না। ফলে একসময় তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নিজেদের দেশ ও পরিবারের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই। সময়ের সঙ্গে এ প্রচারণা আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে।’

রুশ দখলদারত্বের মধ্যে থাকা ইউক্রেনীয়দের সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা ‘সেভ ইউক্রেন’-এর প্রধান আইন বিশেষজ্ঞ মিরোস্লাভা খারচেঙ্কো বলেন, ‘শিশুদের শুরুতেই বোঝানো হয় যে তাদের বাবা-মা আর কখনো তাদের নিতে আসবেন না। ফলে একসময় তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নিজেদের দেশ ও পরিবারের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই। সময়ের সঙ্গে এ প্রচারণা আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে।’

রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ফিরে আসা অনেক শিশুই জানিয়েছে, শিক্ষকেরা তাদের বলেছেন যে ন্যাটোর সঙ্গে ভবিষ্যতে যুদ্ধ হবে এবং সেই যুদ্ধের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কিছু শিক্ষক পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথাও বলেছেন।

রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলে বর্তমানে কতজন ইউক্রেনীয় শিশু রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এসব শিশুর মধ্যে কেউ অপহৃত, আবার কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে সেখানেই বাস করছে। কতজন সেখানে জন্মেছে, কতজন পালিয়ে এসেছে কিংবা মারা গেছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব করা এখন সম্ভব নয়। তবে ইউক্রেনের ভেতরে থাকা শিশুদের জীবনও স্বাভাবিক নয়; অনেকেই বাবা-মাকে হারানোর বেদনা নিয়ে বেড়ে উঠছে।

বাবাকে হারিয়ে বদলে গেল সোফিয়ার জীবন

সোফিয়া হ্রোমাকোভার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর, যখন ইউক্রেনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার বাবা নিহত হন। ততদিনে মারিউপোল রুশ দখলে চলে গেছে। পরে পরিবারটি ইংল্যান্ডে চলে যায় এবং সেখানে আবার পড়াশোনা শুরু করেন সোফিয়া। যুদ্ধের সেই ধাক্কার পর জীবন গুছিয়ে নিতে তাকে সহায়তা করে ইউক্রেনীয় দাতব্য সংস্থা ‘চিলড্রেন অব হিরোস’।

ইউক্রেন ছেড়ে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা মনে করে সোফিয়া বলেন, ‘স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কেউ যখন জিজ্ঞেস করত “তুমি মায়ের সঙ্গে এখানে, তোমার বাবা কোথায়?”, তখন আমি কেঁদে ফেলতাম। অন্য সহপাঠীরা যখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমাকে ভাবতে হতো আমার বাবার মরদেহ কোথায়।’

‘চিলড্রেন অব হিরোস’-এর যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ইউলিয়া সোৎসকা জানান, তাদের সংস্থায় প্রতিদিন গড়ে ১৫টি শিশু নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সম্মতি নিয়ে আমরা সবার গল্প সংরক্ষণ করি, কারণ আমরা চাই না এসব গল্প হারিয়ে যাক এবং বিশ্ব যেন তাদের ভুলে না যায়।’

ইউক্রেন ছেড়ে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা মনে করে সোফিয়া বলেন, ‘স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কেউ যখন জিজ্ঞেস করত “তুমি মায়ের সঙ্গে এখানে, তোমার বাবা কোথায়?”, তখন আমি কেঁদে ফেলতাম। অন্য সহপাঠীরা যখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমাকে ভাবতে হতো আমার বাবার মরদেহ কোথায়।’

এক মেয়ের কথা বলতে গিয়ে সোৎসকা জানান, মেয়েটি তার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে এবং বেঁচে আছে শুধু তার কুকুরটি। নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে মেয়েটি এতটাই স্বাভাবিকভাবে বলছিল যেন বই পড়ে শোনাচ্ছে, তার কথায় কোনো আবেগ ছিল না। সোৎসকা জানান, অনেক সময় গভীর মানসিক আঘাতের কারণে শিশুরা এভাবেই অনুভূতি প্রকাশ থেকে দূরে সরে যায়।

দ্বিতীয় প্রজন্মেও যুদ্ধের প্রভাব

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশুদের মধ্যেও পড়ছে। সোৎসকা বলেন, ‘আমাদের এমন শিশু আছে, যাদের বাবা-মা ২০১৪ সালে নিজেদের বাবা-মাকে হারানোর পর সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের সন্তানদের নিয়েও আমাদের কাজ করতে হচ্ছে।’

এদিকে এতিম ও পরিবারহীন শিশুদের সহায়তাকারী সংস্থা ‘রিদনি ফাউন্ডেশন’ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ইউক্রেনের বিভিন্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৬ হাজার শিশু বাস করছিল। তবে এসব শিশুর সবাই এতিম নয়; তাদের একটি অংশের অন্তত একজন বাবা অথবা মা জীবিত রয়েছে। পরিবার সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় অনেক শিশুকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকতে হচ্ছে।

যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব দ্রুত শেষ হবে না বলে মনে করছে শিশুদের নিয়ে কাজ করা এ সংস্থাটি। তাদের মতে, যুদ্ধের স্মৃতি ও স্বজন হারানোর ক্ষত নিয়ে বেড়ে ওঠা এ প্রজন্মকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে নিরাপদ পরিবেশ ও মানসিক পুনর্বাসন প্রয়োজন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত