কাঠমুন্ডু পোস্টের প্রতিবেদন

বাংলাদেশ হয়ে নেপালে স্টারলিংকের সুযোগ, তবে বাধা নীতিমালায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

নেপালে সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে স্টারলিংকের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে নীতিগত বাধা। এআই দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে নেপালের বাজারে প্রবেশের প্রযুক্তিগত সুযোগ তৈরি হয়েছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংকের। তবে নেপালে সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে নীতিগত বাধা।

বাংলাদেশ সম্প্রতি ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংককে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। তবে নেপালে সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে মুখোমুখি হতে হবে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ও কিছু নীতিগত বাধার।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বাংলাদেশভিত্তিক অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমান্ত-পেরিয়ে ইন্টারনেট ট্রাফিক পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে স্টারলিংককে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় স্টারলিংক বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ গ্রহণ করতে পারবে। এরপর নিজেদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা প্রতিবেশী দেশের ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় দেশটি ‘র ব্যান্ডউইথ’ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে।

বাংলাদেশের স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা মাহমুদ হোসেন বলেন, নেপাল সরকারের অনুমোদনই এখন প্রধান বিষয়। নেপাল সরকার অনুমতি দিলে দেশটির ব্যবহারকারীরা সহজেই স্টারলিংক সেবা ব্যবহার করতে পারবেন।

তার ভাষ্য, নেপালের কোনো গ্রাহকের বাড়িতে স্থাপিত স্টারলিংক ডিশ থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার ওপরে থাকা স্যাটেলাইটে সংকেত পাঠানো হয়। নেপালের ভেতরে ব্যবহারকারীর টার্মিনাল ছাড়া অতিরিক্ত কোনো গেটওয়ে, সার্ভার বা হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন হয় না।

স্টারলিংক গত কয়েক বছর ধরে নেপালের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রেবেকা হান্টার কাঠমান্ডু সফর করে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি নেপালে সেবা চালুর আগ্রহের কথা জানান। তবে আইনি ও নীতিগত জটিলতার কারণে অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় হতাশাও প্রকাশ করেন।

এর আগে স্টারলিংকের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় নেপালে সেবা দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। এমনকি এভারেস্টের চূড়াতেও স্টারলিংকের সংযোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

এদিকে নেপালের হিমালয় অঞ্চলে স্টারলিংক টার্মিনাল অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি ট্র্যাকার ও অভিযাত্রীদের মধ্যে এই ধরনের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নেপাল টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের (এনটিএ) সহকারী মুখপাত্র প্রদীপ পৌডিয়াল বলেন, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া স্টারলিংক সরাসরি নেপালের গ্রাহকদের সেবা দিতে পারবে না। নেপালে ইন্টারনেট সেবা বিক্রি বা স্যাটেলাইট সংকেত ডাউনলিংক করার আগে প্রতিষ্ঠানটিকে নেপালে নিবন্ধিত হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।

তবে নেপালের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো অনুমোদিত আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট অপারেটরের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে পারে বলে জানান তিনি। কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ নেওয়া হবে, তা অপারেটরদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বর্তমানে নেপালে দুটি প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল মোবাইল পারসোনাল কমিউনিকেশনস বাই স্যাটেলাইট (জিএমপিসিএস) লাইসেন্স নিয়ে কাজ করছে। এগুলো হলো সানেপাভিত্তিক কনস্টেলেশন প্রাইভেট লিমিটেড এবং কামালাদিভিত্তিক আইফোর টেকনোলজি। কনস্টেলেশন ২০০২ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক থুরাইয়া স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেবা দিয়ে আসছে।

কনস্টেলেশনের সনাতন গজুরেল বলেন, অবৈধ স্যাটেলাইট যোগাযোগের কারণে বৈধ অপারেটররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার দাবি, এভারেস্ট অঞ্চলের কিছু এলাকায় অবৈধ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করা হচ্ছে।

নেপাল টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ বলছে, স্টারলিংককে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে হলে স্থানীয়ভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে অথবা অনুমোদিত নেপালি অপারেটরের সঙ্গে অংশীদার হতে হবে।

স্টারলিংকের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে নেপালের বিদেশি বিনিয়োগ নীতি। দেশটির বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ মালিকানা রাখতে পারেন। বাকি ২০ শতাংশ স্থানীয় অংশীদারের থাকতে হবে। তবে স্টারলিংক স্থানীয় কার্যক্রমে শতভাগ বিদেশি মালিকানা চায়।

কর্মকর্তাদের মতে, এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স পাওয়ার পথে অন্যতম প্রধান বাধা। তবে রেবেকা হান্টার জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের বর্তমান স্যাটেলাইট সেবার তুলনায় স্টারলিংকের প্রযুক্তিগত সুবিধা বেশি। দেশটির প্রচলিত জিএমপিসিএস সেবা ভূ-স্থির স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা ধীরগতির ও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে স্টারলিংকের নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট কম ল্যাটেন্সি ও কম খরচে সেবা দিতে পারে।

দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনা বলেন, নেপালের আইন মেনে চলতে প্রস্তুত এমন যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে তারা স্বাগত জানাবে। শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আইন পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে আগ্রহী সব প্রতিষ্ঠানকে স্বাগত।

তিনি দুর্গম এলাকায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের গুরুত্ব স্বীকার করলেও পুরো নেপালে এর ব্যাপক ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, অবৈধ স্যাটেলাইট সেবার কারণে সরকার কর রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, বিদেশ থেকে কেনা ডিভাইস নেপালের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করলেও আয় চলে যাচ্ছে অন্য দেশে।

গত বছর একই ধরনের অভিযোগের পর নেপাল টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ বিদেশি স্যাটেলাইট যোগাযোগযন্ত্রের অননুমোদিত ব্যবহার বন্ধে সতর্কতা জারি করেছিল।

এনটিএ বলছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কারণে অবৈধ স্টারলিংক ব্যবহার তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে যাবে না। তবে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা স্টারলিংকের কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে এখনো নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত সুযোগ তৈরি করলেও নেপালে স্টারলিংকের সেবা চালুর তারিখ এখনো অনির্ধারিত। ফলে প্রযুক্তির চেয়ে নীতিগত বাধাই দেশটিতে স্টারলিংকের প্রবেশের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত