পাহাড়ধসে লাশের সারি, দায় কি কেবলই বৃষ্টির

টানা বৃষ্টিতে জনপদ, সড়ক ও রেললাইন তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাটির ধারণক্ষমতা হারিয়ে একের পর এক পাহাড় ধসে পড়ছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

আষাঢ়ের প্রথম ২০ দিন বৃষ্টির দেখা সেভাবে মেলেনি। এরপর হঠাৎ যেন আকাশ ফুটো হয়ে নামল ঢল। গত চার-পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

একদিকে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ, হাজার কোটি টাকার রেললাইন ও সড়ক। অন্যদিকে মাটির ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে পাহাড়। গত মাত্র তিন দিনেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড় ও দেয়ালধসে অন্তত ২৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের বড় অংশই শিশু।

প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের দায় কি শুধুই অতিবৃষ্টির, নাকি অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর মানুষের লোভেরও—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ ও সমাজ বিশ্লেষকেরা।

পাহাড়ের পাদদেশ যেন মৃত্যুফাঁদ

পাহাড়ের ঢালে বসবাস কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলোতে। বান্দরবানের লামায় মিশনপাড়া এলাকায় গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ধসে পড়ে পাহাড়। মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় দুই পরিবারের পাঁচজন।

একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়ায়, যেখানে পাহাড় ধসে প্রাণ গেছে ঘুমন্ত দুই চাচাতো ভাই-বোনের। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। সেখানে পাহাড়ের খাদে নির্মিত একটি মহিলা মাদ্রাসার দেয়াল ধসে পাঁচ শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জুলাইয়ের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই মারা যান আরও ১০ জন। আর গত তিন দিনে প্রাণ গেল আরও ২৯ জনের। বছর না ফুরোতেই এত মৃত্যু পাহাড়ের এই অভিশপ্ত চক্রকে আবারও সামনে এনেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১৪টি পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৪৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার মিলিয়ে ১৬২ জনের মৃত্যু ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

দায় কি শুধুই বৃষ্টির?

টানা এই মৃত্যুর দায় কার—এমন প্রশ্নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, ‘অতিবৃষ্টি প্রাকৃতিক বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন চরম আবহাওয়া আমরা দেখছি। কিন্তু পাহাড়ধসের মূল দায় মানুষের কর্মকাণ্ডের। আমরা পাহাড় ধ্বংস করে ফেলছি। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, গাছ কাটা এবং অবৈজ্ঞানিকভাবে বসতি স্থাপনের কারণেই পাহাড়গুলো তার স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়েছে।’

তাঁর কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘প্রত্যাশী’র উপসহকারী পরিচালক ও ভূ-গবেষক ড. নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়গুলো মূলত বেলেমাটির তৈরি। স্বাভাবিক অবস্থায় মাটির কণাগুলো একে অপরকে শক্ত করে ধরে রাখে। কিন্তু টানা তিন দিনে ১২০ থেকে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।

সরকারি পাহাড় দখল হয় কীভাবে?

পাহাড় মূলত সরকারি সম্পত্তি। তারপরও সেখানে কীভাবে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠে—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইকবাল সরোয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যথেষ্ট আইন ও নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাহাড় কেটে যারা অবৈধ বসতি বানাচ্ছে, তাদের ঘরেই আবার সরকারি পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে! দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই এই দখলদারিত্ব বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

শহর ও গ্রামের পাহাড় দখলের ভিন্ন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন ড. নাসির উদ্দিন। তাঁর মতে, শহরের টাইগারপাস বা বাটালী হিলের মতো এলাকার পাহাড়গুলো প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের দখলে। তারা বস্তি বানিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দেয়। আর দুর্গম অঞ্চলে দারিদ্র্যের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকে।

উন্নয়নের খেসারত ও পানিবন্দী জনপদ

পাহাড়ধসের পাশাপাশি এবার বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের একাংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। সাজেক ভ্যালিতে আটকা পড়েছেন প্রায় ৬০০ পর্যটক।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সমালোচনা করে অধ্যাপক ইকবাল সরোয়ার বলেন, ‘বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে রেললাইনের মতো স্থাপনা নির্মাণের কারণে ওই এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলেই এখন আমরা পাহাড়ি ঢল বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখছি।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সংকট

বিপর্যয়ের আরেক নাম কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ড. নাসির উদ্দিন জানান, সেখানে প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি উজাড় করে পাহাড়ের ঢালে ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। মাটির কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে ধস নামছে।

সমাধান কোন পথে?

এই মৃত্যুকূপ থেকে বের হতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন ড. ইকবাল সরোয়ার। তিনি বলেন, পাহাড় কাটা রোধে ড্রোন বা সিসিটিভি ক্যামেরার মতো প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আইনের যুগোপযোগী সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, দুর্যোগ মোকাবিলায় এফএও-এর সহায়তায় কক্সবাজারে ‘ল্যান্ডস্লাইড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (এলইডব্লিউএস)’ বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে পাঁচ দিন আগেই ভূমিধসের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন বিভাগ, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় না থাকলে এই পূর্বাভাস কাজে আসবে না। যতদিন পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ না হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন না হবে, ততদিন প্রতি বর্ষায় আমাদের কেবল লাশের সারিই গুনতে হবে। পাহাড়ের এই কান্না থামাতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত