এই ক্ষোভ আমরা কোথায় রাখব?

মারুফা কলি
মারুফা কলি

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১৩: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাব যে সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষই প্রতিদিন এক ধরনের চাপ, অসহায়ত্ব ও অবদমিত ক্ষোভের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। একজন মানুষ সকালবেলা ঘর থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে রাতে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত যত ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—যেসব বিষয় স্বাভাবিক ও সহজ হওয়ার কথা, সেগুলোই তার জন্য প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে।

ধরা যাক একজন সাধারণ অফিসগামী চাকরিজীবীর কথা। সকালে তিনি অফিসে যাওয়ার জন্য একটি লোকাল বাসে উঠলেন। সেই বাস তাকে কতটুকু সেবা দিচ্ছে, সেটি বিবেচনার বিষয়। শুধু বাহ্যিক অবস্থা নয়, তিনি যে অর্থ ব্যয় করে এই সেবা কিনছেন, সেই অর্থের বিনিময়ে কতটুকু মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন, সেটিও প্রশ্ন।

একটি চল্লিশ সিটের বাসে যখন আশিজন মানুষ যাতায়াত করেন, যখন বাসের অবস্থা নাজুক, যখন ড্রাইভার, হেল্পার কিংবা সুপারভাইজারের আচরণ প্রায়শই অশোভন হয়, তখন প্রতিটি যাত্রাই মানুষের ভেতরে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি করে। কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশ করার কোনো নিরাপদ বা কার্যকর জায়গা নেই। বাস কোম্পানির কাছে নয়, ড্রাইভারের কাছে নয়, হেল্পারের কাছেও নয়। কারণ পরদিন আবার সেই বাসেই তাকে অফিসে যেতে হবে। ফলে যতটুকু ঝামেলা এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, মানুষ সেটুকুই চেষ্টা করে।

এরপর শুরু হয় হাঁটার সংগ্রাম। বাস থেকে নেমে অফিস যদি পাঁচ মিনিট দূরেও হয়, সেই পাঁচ মিনিটের পথটুকুও নির্বিঘ্ন নয়। ঢাকা শহরের খুব কম ফুটপাতই দখলমুক্ত। অধিকাংশ ফুটপাতই এমনভাবে ভরাট থাকে যে সেগুলোকে অনেক সময় অস্থায়ী শপিং মল বললেও অত্যুক্তি হয় না। হাঁটার জন্য যে জায়গা থাকার কথা, সেখানে দোকান, স্টল, ভিড় আর বিশৃঙ্খলার দখল।

ফুটপাত ব্যবহার করা না গেলে মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়। অথচ সেই রাস্তাও নিরাপদ নয়। কোথাও হকারের দখল, কোথাও অবৈধ যানবাহনের আধিপত্য, কোথাও নিয়মের তোয়াক্কা না করে চলা গাড়ি। একজন মানুষ তার কর্মস্থলে পৌঁছানোর আগেই বারবার অনুভব করেন যে শহরটি যেন তার জন্য তৈরি নয়।

খাবারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। টাকা দিয়ে খাবার কিনেও একজন সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হতে পারেন না যে সেটি নিরাপদ বা বিষমুক্ত। উৎপাদন পর্যায়ে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সময় নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান, অপরিষ্কার পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সব মিলিয়ে খাবারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব, বৈষম্য, অবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। যখন মানুষ তার ক্ষোভ প্রকাশের বৈধ ও কার্যকর পথ খুঁজে পায় না, তখন সেই ক্ষোভ কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে, কখনো সামাজিক আচরণে, কখনো আবার প্রত্যক্ষ সহিংসতার মধ্য দিয়ে বিকৃত রূপে প্রকাশ পায়।

একই অবস্থা পানির ক্ষেত্রেও। যে দেশে পানি সহজলভ্য হওয়ার কথা, সেখানে মানুষকে পানি কিনে খেতে হয়। অথচ অর্থ ব্যয় করেও সেই পানি কতটা নিরাপদ, সে নিশ্চয়তা নেই।

দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। পোশাক কেনার সময় বোঝা কঠিন কোনটি আসল, কোনটি নকল, কোনটি আমদানি করা, কোনটি নয়। বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা নেই, মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপস্থিতি নেই। প্রসাধনী বা কসমেটিকসের ক্ষেত্রেও একই অনিশ্চয়তা। বড় সুপারশপ থেকে উচ্চমূল্যে কেনা পণ্যও অনেক সময় ভেজাল বা নিম্নমানের হওয়ার অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়।

ফলে একজন সাধারণ মানুষ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এক ধরনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতারণার আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকেন। কিন্তু এই ক্ষোভ তিনি কোথায় রাখবেন? কার কাছে গিয়ে বলবেন? কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যায়বিচার চাইবেন?

এই ক্ষোভ প্রতিদিন জমা হয়। প্রতিদিন মানুষ সেটি গিলে ফেলতে শেখে। কিন্তু মানুষ কতদিন, কতখানি ক্ষোভ নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে? সেই ক্ষোভ তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে? সেই প্রশ্ন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না।

আমার জানতে ইচ্ছে করে—এই ক্ষোভের কতটুকু আমরা নিজের মধ্যে হজম করছি, আর কতটুকু আমরা আমাদের চারপাশের মানুষের ওপর ঝেড়ে ফেলছি? অফিসে সহকর্মীর ওপর, অধস্তন কর্মচারীর ওপর, পরিবারের সদস্যদের ওপর, ঘনিষ্ঠ মানুষের ওপর, প্রতিবেশীর ওপর—নাকি আরও দুর্বল কারও ওপর?

সমাজ আমাদের এই সহিংসতা থেকে মুক্তি দিতে পারছে না। কারণ ক্ষোভ তৈরির যে কাঠামো, যে যন্ত্র, যে ব্যবস্থা—সেটি অক্ষত রয়েছে। মানুষ প্রতিদিন অপমানিত হচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে, অসহায় বোধ করছে; কিন্তু সমস্যার উৎসে পৌঁছানোর বা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

ফলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে সহিংসতা শুধু অপরাধের ঘটনায় নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ভেতরেই ছড়িয়ে আছে? যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিটি ধাপই এক ধরনের মানসিক নির্যাতন? আর যদি তা-ই হয়, তাহলে এই জমে থাকা ক্ষোভ ও অবদমনের শেষ কোথায়?

কিন্তু এই ক্ষোভ কি কেবল মানুষের ভেতরেই জমা থাকে? নাকি একসময় তা সহিংসতার রূপ নেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা কি আমরা করছি?

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, যৌন সহিংসতা, খুন ও অপহরণের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। বিশেষ করে মেয়ে শিশু ও ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা এবং সেগুলোর নৃশংসতা আমাদের বাধ্য করে ভাবতে—এই সহিংসতার উৎস কোথায়? কারা এই সহিংসতার জীবাণু বহন করছে? কোন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে?

আমরা কি এই ঘটনাগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখব, নাকি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করব?

বাংলাদেশের গত দুই বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের বিরুদ্ধে যে গণঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল একটি অভ্যুত্থানমুখী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সুবিধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে দেশ এগিয়ে যাবে। মানুষ ভেবেছিল, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই জনপ্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে? নাকি সেই জনপ্রত্যাশা ক্রমশ জনহতাশায় পরিণত হচ্ছে?

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অধিকাংশই মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের গভীর সংকেত বহন করে। গণপিটুনি, ধর্ষণ, বলাৎকার, খুন, অপহরণ, সামাজিক নিপীড়ন—প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদের সামাজিক কাঠামোর গভীরে থাকা অসুস্থতাকে প্রকাশ করছে।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব, বৈষম্য, অবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। যখন মানুষ তার ক্ষোভ প্রকাশের বৈধ ও কার্যকর পথ খুঁজে পায় না, তখন সেই ক্ষোভ কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কে, কখনো সামাজিক আচরণে, কখনো আবার প্রত্যক্ষ সহিংসতার মধ্য দিয়ে বিকৃত রূপে প্রকাশ পায়।

রাষ্ট্রেরও এখানে দায় আছে। কারণ রাষ্ট্র কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে না, রাষ্ট্র একটি সামাজিক পরিবেশও তৈরি করে। যদি সেই পরিবেশে মানুষ প্রতিনিয়ত অপমানিত, বঞ্চিত ও অনিরাপদ বোধ করে, তবে সেই ক্ষোভও রাষ্ট্রের নির্মিত বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সেগুলোকে এমনভাবে প্রতিপালন করে যে একটি ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ঘটনা সামনে এসে দাঁড়ায়। একটির ভয়াবহতা অন্যটির ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে যায়।

রাষ্ট্রেরও এখানে দায় আছে। কারণ রাষ্ট্র কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে না, রাষ্ট্র একটি সামাজিক পরিবেশও তৈরি করে। যদি সেই পরিবেশে মানুষ প্রতিনিয়ত অপমানিত, বঞ্চিত ও অনিরাপদ বোধ করে, তবে সেই ক্ষোভও রাষ্ট্রের নির্মিত বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সেগুলোকে এমনভাবে প্রতিপালন করে যে একটি ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ঘটনা সামনে এসে দাঁড়ায়। একটির ভয়াবহতা অন্যটির ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে যায়।

একটি ধর্ষণের ঘটনার পর আরেকটি ধর্ষণ, একটি খুনের পর আরেকটি খুন, একটি গণপিটুনির পর আরেকটি গণপিটুনি—এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষের পক্ষে প্রতিটি ঘটনার প্রতি সমান সংবেদনশীল থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

মানুষ হিসেবে আমাদের এই ভয়াবহতাগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এত বেশি ঘটনা, এত দ্রুত, এত ঘন ঘন ঘটছে যে মানুষ নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখার তাগিদেই অনেক সময় সেগুলোকে উপেক্ষা করে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় মানুষ সাময়িক মুক্তির জন্য আশ্রয় খুঁজছে প্রযুক্তির জগতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু সেখানেও মুক্তি কোথায়?

একটি সংবাদ পড়তে গিয়ে চারটি সংবাদ সামনে আসে, যার তিনটিতেই থাকে সহিংসতা, ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন কিংবা অমানবিকতার গল্প। আমরা বিশ্রাম খুঁজতে গিয়ে আবারও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছি। ফলে আমাদের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে আরও পুষ্ট হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও অনেক সময় এই নেতিবাচকতাকে আরও বিস্তৃত করে। ক্ষোভ, ভয়, উত্তেজনা ও বিদ্বেষ মানুষের মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করে বলে সেসব বিষয়ই বেশি দৃশ্যমান হয়। ফলে সমাজে এক ধরনের স্থায়ী উত্তেজনা, অবিশ্বাস এবং নেতিবাচকতার আবহ তৈরি হয়। এই আবহ আবার নতুন সহিংসতার জন্য সামাজিক অনুমোদন বা নীরব সমর্থনের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।

ফলে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—আমরা কি কেবল সহিংসতার ঘটনাগুলো দেখছি, নাকি সেই সহিংসতার উৎপাদনকারী সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও দেখছি? আমরা কি কেবল অপরাধীকে খুঁজছি, নাকি সেই পরিবেশটিকেও বিশ্লেষণ করছি, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ক্ষোভ, বঞ্চনা, অপমান ও অসহায়ত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে?

সম্ভবত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে না পারলে আমরা সহিংসতার লক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত থাকব, কিন্তু সহিংসতার উৎসকে কখনোই স্পর্শ করতে পারব না।

  • মারুফা কলি: প্রকল্প ব্যবস্থাপক, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত