ইরানের পানি শোধনাগারে মার্কিন হামলা, ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্য

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৬: ৫৪
ইরানের একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট। ছবি : তেহরান টাইমস

ইরানের একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার ভোরে দেশটির হরমোজগান প্রদেশের উপকূলীয় বুনজি গ্রামে চালানো এই হামলায় একটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন অন্তত ১০ হাজার মানুষ।

মার্কিন হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টেও আগুন লাগে। পরপর এই দুই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত পানি সরবরাহ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার হরমোজগান ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্ট ওয়াটার কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর বরাতে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানায়, মার্কিন হামলায় তাদের একটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে ২০টি গ্রামের সুপেয় পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তীব্র পানি সংকটে পড়েছে।

অন্যদিকে কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ভোরে ইরানের হামলার পর একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের অংশে আগুন লাগে। পরে জরুরি পরিকল্পনা চালু করে বিদ্যুৎ গ্রিড ও প্ল্যান্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

উপসাগরের লাইফলাইন ‘পানি সরবরাহব্যবস্থা’

উপসাগরীয় অঞ্চলে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট শুধু শিল্প স্থাপনা নয়, বরং কোটি মানুষের জীবনধারণের প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের ১০টি বৃহত্তম ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে আটটিই আরব উপদ্বীপে অবস্থিত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমানসহ পুরো অঞ্চলে ৪০০-এর বেশি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো বিশ্বের মোট বিশুদ্ধ করা লবণাক্ত পানির প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষ দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে এসব প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল।

কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানের ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের প্রায় ৭০ শতাংশ সুপেয় পানি আসে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে। মরু জলবায়ু, অল্প বৃষ্টিপাত ও সীমিত ভূগর্ভস্থ পানির কারণে এসব স্থাপনা অঞ্চলটির জন্য অপরিহার্য।

পুরোনো শঙ্কা, নতুন বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের পানি সরবরাহ অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলো রক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সেই ঝুঁকি কমেনি। ২০১৯ ও ২০২২ সালে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর, সৌদি আরবের আল-শুকাইক ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

ইরান তুলনামূলকভাবে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের ওপর কম নির্ভরশীল হলেও দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের বড় একটি জনগোষ্ঠীর পানির প্রধান উৎস এসব স্থাপনা। এমন সময় এই হামলা হলো, যখন দেশটি আগে থেকেই তীব্র পানি সংকটে রয়েছে। ফলে পানি অবকাঠামোতে হামলা ইরানের মানবিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি সরবরাহ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে ইরান। সে ক্ষেত্রে এর প্রভাব শুধু অঞ্চলটির অর্থনীতিতেই বিপর্যয় ডেকে আনবে না, বরং পুরো অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতির ওপরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত