সঙ্গীর মৃত্যুতে কাঁদছে হাতি, অঙ্গ কাটছে মানুষ: পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপমৃত্যু ও নৃশংসতা

লংগদুতে পড়ে থাকা হাতির ছবি অবলম্বনে এআই জেনারেটেড ছবি

রাঙামাটির লংগদুর বনভূমিতে পড়ে আছে বিশালদেহী এক বন্য হাতির নিথর দেহ। টানা দুদিন ধরে সেই মৃতদেহ ঘিরে চক্কর কাটছে তার সঙ্গী স্ত্রী হাতিটি। কখনো সে শুঁড় দিয়ে মৃত সঙ্গীকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে, কখনো ধুলো ছিটিয়ে দিচ্ছে তার গায়ে। সঙ্গীর মৃত্যুতে এক অবলা প্রাণীর এমন শোক স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো হলেও, সেখানে উপস্থিত কিছু মানুষ মেতে উঠেছিল নিষ্ঠুর উল্লাসে। শোকে কাতর স্ত্রী হাতিটিকে তারা ঢিল ছুড়ে উত্ত্যক্ত করেছে। নির্দয়তার এখানেই শেষ নয়। রোববার রাতে স্ত্রী হাতিটি বনে ফিরে গেলে এবং নিরাপত্তার অভাবে বনকর্মীরাও সরে পড়েন। এই সুযোগে রাতের অন্ধকারে মৃত হাতির শুঁড় ও পেছনের একটি পা কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

রাঙামাটির এই ঘটনা যেন বন্য হাতির প্রতি মানুষের চরম নিষ্ঠুরতার এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত। দেশে মানুষের নির্মমতা ও অবহেলায় হাতির এমন অপমৃত্যু কেবল বাড়ছেই। দেশে বন্য হাতির অপমৃত্যু যেন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিশোধমূলক হত্যা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, চোরাশিকার ও ট্রেনের ধাক্কায় একের পর এক হাতির করুণ মৃত্যু হচ্ছে।

১০ বছরে প্রাণ হারিয়েছে ১৫১ হাতি

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে সারা দেশে ১৫১টি বন্য হাতি প্রাণ হারিয়েছে। মৃত্যুর এই হার পুরোনো যেকোনও সময়ের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ।

চলতি বছরেও হাতির মৃত্যুর এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ৪ মাসেই দেশে তিনটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত ৬ এপ্রিল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ডোবা থেকে দুই মাস বয়সী একটি মৃত হস্তীশাবক উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৬ জানুয়ারি সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ট্রেনের ধাক্কায় মারা যায় আরও একটি হাতি। বন বিভাগের গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের তিনটি বাদে গত ৯ বছরে দেশে ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ দেশের প্রধান হাতির আবাসস্থল হলেও সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রামেই ১০২টি হাতির মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৬টি, গুলিতে পাঁচটি, দুর্ঘটনায় ১৭টি এবং হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মতো স্বাভাবিক কারণে ৫৩টি হাতি মারা গেছে।

জাতীয়ভাবেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুর হার ভয়াবহ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে মারা যাওয়া ৫৫টি হাতির অর্ধেকই মারা গেছে মানুষের পাতা ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বা অস্ত্রের আঘাতে।

এর আগে ২০০৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে ৬৩টি বন্য হাতি হত্যার শিকার হয়েছিল, এমন তথ্য বন বিভাগের। আবার আইইউসিএনের হিসাবে, ২০২০ সালের আগের ১৭ বছরে মানুষের হাতে হত্যার শিকার হয়েছিল ৯০টি হাতি। অথচ শুধু ২০২০ সালেই মেরে ফেলা হয় ১১টি হাতিকে। এর আগে ২০১০ সালে মানুষের হাতে চারটি এবং ২০১৪ সালে সাতটি হাতি মারা পড়েছিল। অর্থাৎ, গত এক দশকের ব্যবধানে দেশে হাতি হত্যার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

হাতির পাশাপাশি হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে মানুষেরও প্রাণহানি বাড়ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাতির আক্রমণে অন্তত তিনজন মানুষ মারা গেছেন। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই হাতির আক্রমণে ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অন্তত ৩৩ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৩৮২টি পরিবারের।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণী বিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ড টিমের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বছর এরই মধ্যে তিনটি হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও হাতির মৃত্যু বাড়তির দিকে। হাতির পাশাপাশি মানুষেরও মৃত্যু ঘটছে। এই সংখ্যা ও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

কেন মারা পড়ছে হাতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন প্রকল্পে বনভূমি অধিগ্রহণ, বনভূমির অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে এশীয় হাতির অস্তিত্ব আজ চরম সংকটে। ২০১৮ সালের পর থেকে হাতির মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, বিশেষ করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বনভূমি এলাকায়।

হাতির আবাসস্থল ধ্বংসের বড় একটি কারণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প। এই রেললাইনটি হাতি চলাচলের ২১টি পথের (করিডর) ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বনের ভেতর টানা হয়েছে বিদ্যুতের লাইন। ফলে ফাঁসিয়াখালী, চুনতি ও মেধাকচ্ছপিয়া বনভূমিতে হাতির চলাচলের পথ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, রেলপথ নির্মাণের আগে ওইসব এলাকায় বছরে তিন থেকে সাতটি হাতি মারা পড়ত, যা নির্মাণ চলাকালে গড়ে ১১টিতে পৌঁছায়।

এর বাইরে হাতির বিচরণক্ষেত্রে মানুষের আগ্রাসন বেড়েছে। ২০১৭ সালে হাতির অন্যতম বিচরণ এলাকা টেকনাফ ও উখিয়ায় বিশাল এলাকাজুড়ে রোহিঙ্গা শিবির গড়ে তোলা হয়। ফলে হাতি কার্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। এর আগে রামুতে হাতির দুটি করিডর এলাকায় নির্মাণ করা হয় সরকারি স্থাপনা।

এশীয় হাতি বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, ‘হাতির আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বন খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে। হাতির খাবার মানুষ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকটে পড়ে হাতি লোকালয়ে আসছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে।’

জরিপহীন এক দশক ও উদাসীনতা

গত শতাব্দীর শেষের দিকেও দেশে বন্য হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। কিন্তু এরপর থেকে তা কেবলই কমেছে। বন বিভাগ সর্বশেষ হাতির জাতীয় জরিপ করেছিল ২০১৬ সালে। আইইউসিএন ও বন বিভাগের ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট হাতির সংখ্যা ছিল ২১০ থেকে ৩৩০টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ২৬৮টি হাতি দেখা যায়।

তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৬ সালের পর গত এক দশকে নতুন করে আর কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। দেশে হাতির সংখ্যা বেড়েছে নাকি কমেছে— তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সরকারি এই সংস্থার কাছে নেই।

দীর্ঘদিন ধরে হাতির কোনো জরিপ না হওয়া এবং সরকারের উদাসীনতার সমালোচনা করে অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, ‘ভারতে প্রজেক্ট টাইগার বা প্রজেক্ট এলিফ্যান্টের মতো বড় মেগা প্রজেক্ট আছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত ৫০ বছরেও হাতি নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প নেই। বন বিভাগ প্রকল্প দিলেও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যারা বসে আছেন, তারা এর গুরুত্ব বোঝেন না। তারা মনে করেন— হাতি দিয়ে কী হবে!’

আইন কী বলছে

বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ অনুসারে, হাতি হত্যা জামিন অযোগ্য অপরাধ। আইনের নবম অধ্যায়ের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া প্রথমবার হাতি হত্যা করলে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। এছাড়া পারমিট না নিয়ে হাতির দেহাংশ (ট্রফি) সংরক্ষণ করলে ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন দিয়ে হাতি হত্যা ও নৃশংসতা বন্ধ করা যাবে না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক—সব মহলে সচেতনতা জরুরি।

এখন তবে কী করা যায়

হাতির সঙ্গে মানুষের বেশ কিছু মিল রয়েছে। মানুষকে যেমন সমাজবদ্ধ প্রাণী বলা হয়, হাতিও তাই। হাতি বাঁচে মানুষের মতোই ৬০ থেকে ৭০ বছর। হস্তিনী সন্তান জন্ম দেওয়া শুরু করে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সে।

অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, ‘হাতি মানুষের মতোই অনেক বেশি আবেগপ্রবণ এবং স্মৃতিকাতর প্রাণী। সঙ্গীর মৃত্যুতে তারা শোক প্রকাশ করে। এটা প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মানুষ আবেগের জায়গাটা বোঝে না। এটা মানুষের অজ্ঞতা।’

এমন পরিস্থিতিতে হাতি সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রথমত উচ্চপর্যায়ে সচেতনতা। শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হাতি সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বাজেটসহ ‘মেগা প্রজেক্ট’ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বন বিভাগের মাঠকর্মীদের সক্ষমতা ও জনবল বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। বলছেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বনকর্মীদের সুসম্পর্ক ও সমন্বয় গড়ে তোলার কথা।

হাতির চলাচলের পথে বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের কথাও বলছেণ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রেললাইনে হাতি পারাপারের জন্য যেসব আন্ডারপাস করা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে বিশালদেহী হাতি পার হতে পারে না। চুনতি, মেধাকচ্ছপিয়া বা ফাঁসিয়াখালীর মতো বনাঞ্চলে রেল ও সড়কের ওপর ফ্লাইওভার বা ওভারপাস তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত প্রাকৃতিক বনভূমি রক্ষা করে বনের ভেতর হাতির পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা; যাতে তারা লোকালয়ে আসতে বাধ্য না হয়।

সম্পর্কিত