নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের নেপথ্যে কী ছিল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় একে একে ভেসে ওঠে মরদেহ। ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দিনে-দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে অপহৃত হয়েছিলেন সাতজন ব্যক্তি। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে ভেসে ওঠে তাদের মরদেহ। দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সেই ‘সাত খুনের আজ ১২ বছর বা এক যুগ পূর্ণ হচ্ছে।

ওই হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডল চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। চার্জশিট ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী জানা যায়। তদন্ত অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সঙ্গে ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল এই খুনের মূল কারণ। নূর হোসেন ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল সিটি করপোরেশনের একটি রাস্তা প্রশস্ত করা নিয়ে নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের ফুফাতো ভাই মোবারকের বাদানুবাদ থেকে। এ ঘটনায় মোবারক বাদী হয়ে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সেই মামলায় আদালত থেকে জামিন নিয়ে ঢাকার দিকে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করে র‍্যাব-১১-এর সদস্যরা।

র‍্যাবকে ব্যবহারের অভিযোগ ও ৬ কোটির বিতর্ক

এই হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের সরাসরি সম্পৃক্ততা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। অপহরণের পরপরই নজরুলের শ্বশুর শহীদ হোসেন জনসমক্ষে অভিযোগ করেন, নূর হোসেনের কাছ থেকে ৬ কোটি টাকা নিয়ে র‍্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সেই ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নূর হোসেন পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে র‍্যাবকে ব্যবহার করেছিল। আমি আমার স্বামীকে বাঁচাতে তারেক সাঈদের পায়ে পর্যন্ত ধরেছিলাম, কিন্তু র‍্যাব সাতটি মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়।’

আইনজীবী চন্দন সরকার কেন বলি হলেন

আলোচিত এই ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুলের পাশাপাশি প্রাণ হারান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন জানান, চন্দন সরকার নজরুলকে অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাঁকেসহ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চন্দন সরকার ও নজরুলসহ সাতজনকে উদ্ধারের জন্য আমরা র‍্যাব ও পুলিশের দপ্তরে গেলেও তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। এরপর আমরা টানা ৫৮ দিন আদালত বর্জন ও রাজপথে আন্দোলন করি। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।’

পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত র‍্যাব-১১–এর সাবেক তিন কর্মকর্তা (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এম এম রানা, সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে আসামিপক্ষের আপিলে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট নূর হোসেন, র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রাখেন আদালত।

সাত খুন মামলার সর্বশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে বলেন, সাত খুনের মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) পর্যায়ে রয়েছে।

এ ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব, এই মামলার শুনানি সম্পন্ন করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করব।’

সম্পর্কিত