যুদ্ধে ৪২ টাকা বেড়েও ইরানে ডিমের হালি ৭৪, বাংলাদেশে ৫০

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৪৯
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে দ্রব্যমূল্যের দাম এখন চড়া। ইরানি ইন্টারন্যাশনাল থেকে নেওয়া ছবি

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে দ্রব্যমূল্যের দাম এখন চড়া। বিভিন্ন ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশটির বর্তমান অবস্থা। দাম হু হু করে বাড়ছে, জিনিসপত্রের দাম চলে গেছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই চরম অসন্তোষ।

অন্যদিকে, ইরান থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার পরেও বাংলাদেশের বাজারের চিত্র কিছুটা এমনই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে। যুদ্ধ চলছে ইরান-আমেরিকার মধ্যে। সেই আগুনের আঁচ এসে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।

ইরানের বাজারের অবস্থা

ইরান ইন্টারন্যাশনালের ৩১ মার্চের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশটির নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে তেল ও চর্বিজাতীয় পণ্যের দাম। এক বছরে বেড়েছে ২১৯ শতাংশ। একই সময়ে রুটি ও খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে ১৪০ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য হওয়ায় সরাসরি জীবনযাত্রার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

মাংসের বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রেড মিট ও পোল্ট্রি মিলিয়ে মাংসের দাম বেড়েছে প্রায় ১৩৫ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্য (দুধ, পনির, ডিম) দাম বেড়েছে ১১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলমূলের দাম বেড়েছে ১০৪ দশমিক ২ শতাংশ, আর শাকসবজি ও ডালের মতো তুলনামূলক কম দামের খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, খাদ্যতালিকার প্রায় সব স্তরেই মূল্যস্ফীতি বিস্তৃত হয়েছে।

বর্তমানে ইরানে একটি ডিমের দাম ২ লাখ রিয়াল বা ১২ সেন্ট। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১৮ টাকা। যুদ্ধের আগে ইরানে একটি ডিমের দাম ছিল আনুমানিক ৯০-৯৫ হাজার রিয়ালের মধ্যে, বাংলাদেশি টাকায় যার দাম আট টাকা।

এই পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। ইরান ইন্টারন্যাশনালের ২৩ এপ্রিলের আরেক প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের জাহেদান শহরের এক বাসিন্দার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যা বলা হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বেড়েছে। ভোজ্য তেল পাওয়াই এখন কঠিন। সস্তা প্রোটিন হিসেবে ডিমও সাধারণ মানুষের পাত থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।’

বর্তমানে ইরানে একটি ডিমের দাম ২ লাখ রিয়াল বা ১২ সেন্ট। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১৮ টাকা। যুদ্ধের আগে ইরানে একটি ডিমের দাম ছিল আনুমানিক ৯০-৯৫ হাজার রিয়ালের মধ্যে, বাংলাদেশি টাকায় যার দাম আট টাকা।

রেস্তোরাঁ খাতেও এই মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট। একটি সাধারণ চিকেন বিরিয়ানির প্লেটের দাম এখন ৩০ থেকে ৪০ লাখ রিয়াল, যা বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ২৮০ থেকে ৩৭০ টাকার মধ্যে পড়ে। কয়েক বছর আগেও যা ছিল অনেক কম, সেটিই এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বাজারের চিত্র

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে একসঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সম্প্রতি আবারও ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

সরকারি সংস্থা টিসিবির দৈনিক বাজারদরের প্রতিবেদনেও এই মূল্যবৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়। বর্তমানে খোলা চিনির দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনি কেজিপ্রতি ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের বাজারও গত এক সপ্তাহ ধরে বেশ চড়া। আগে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। পাড়ার অনেক দোকানে এক হালি ডিম ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলা তেল কিনতে হচ্ছে। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮২-১৯০ টাকা আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা।

ব্রয়লার মুরগীর দাম কেজিতে ১৮০-২০০ টাকা এবং দেশী মুরগীর দাম ৫৫০-৬৫০ টাকা। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৮০-৮০০ টাকা এবং খাস্যার মাংস প্রতি কেজি ১১০০-১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কেন দেশে যুদ্ধ না হয়েও প্রতিবার দাম বাড়ে

বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই অর্থনীতি বা বাণিজ্যের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্বের এক প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে তার আঁচ অন্য প্রান্তের দেশগুলোতেও লাগে। যুদ্ধের প্রভাব এমন সব দেশেও পৌঁছায়, যাদের সঙ্গে ওই সংঘাতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশে পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হয়। এর পেছনে কাজ করে বাজার সিন্ডিকেট। পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং বাজার তদারকির অভাবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি অতীতে অসংখ্যবার হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলা যায়। ২০২২ সালে এই দুটি দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ খাদ্য সংকট দেখা যায়। মিশর, লেবানন বা সোমালিয়ার মতো দেশগুলো গমের জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। আবার মধ্যপ্রাচ্যে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। এর ফলে তেল আমদানিকারক এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিপাকে পড়ে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সব দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। কিন্তু এই ক্ষতির মাত্রা সব দেশের জন্য সমান নয়। একেক দেশের ওপর এর প্রভাব একেক রকম। উন্নত দেশগুলো তাদের শক্তিশালী অর্থনীতির কারণে এই ধাক্কা দ্রুত সামলে নিতে পারে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল বা আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নিজস্ব সম্পদের ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা এই ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছে। সরাসরি কোনো যুদ্ধে না জড়িয়েও বিশ্বের যেকোনো বড় সংঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খেসারত দিতে হয়। এর পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ হলো জ্বালানি নির্ভরতা। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানা সচল রাখতে জ্বালানি তেল ও এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। তখন বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে দেশের ভেতরে পণ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচলের রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন জাহাজের ভাড়া এবং বিমা খরচ বাড়ে। আমদানি করা কাঁচামাল বা নিত্যপণ্য দেশে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগে এবং খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বাজারের সাধারণ জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয় কারণ হলো একক পণ্যের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা। বাংলাদেশের আয়ের বড় একটি অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ইউরোপ বা আমেরিকায় যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক চাপ বা মূল্যস্ফীতি তৈরি হলে সেখানকার মানুষ পোশাক কেনা কমিয়ে দেয়।

আরেকটি কারণ, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস হলো মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। ওই অঞ্চলে কোনো সংঘাত তৈরি হলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তখন দেশে রেমিট্যান্স আসা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়।

এ ছাড়া যেকোনো যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটে ডলারের দাম বেড়ে যায়। যার ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। বাংলাদেশকে অনেক খাদ্যপণ্য ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বেশি দামে ডলার কিনে পণ্য আনতে গিয়ে দেশের বাজারে সেই জিনিসের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

এর বাইরে আরো একটি বিষয় খুব আলোচিত। সেটি বাজার সিন্ডিকেট। বাংলাদেশে পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হয়। এর পেছনে কাজ করে বাজার সিন্ডিকেট। পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং বাজার তদারকির অভাবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি অতীতে অসংখ্যবার হয়েছে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি ও বাজার অব্যবস্থাপনা বেশি দায়ী বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

সম্পর্কিত