leadT1ad

খাগড়াছড়ি-২৯৮: আঞ্চলিক ভোটব্যাংকের প্রভাবে জাতীয় দলগুলোর নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খাগড়াছড়ি

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ৪৯
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। স্ট্রিম গ্রাফিক

খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রভাবাধীন ভোটব্যাংক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি দেখে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর আচরণবিধির কারণে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা এখনো শুরু হয়নি। তবে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা বিভিন্ন কৌশলে ভোটারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি মাঠে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ আসনে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোরও দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বাস্তবতাও বরাবরের মতো এবার ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আগের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপি দুইবার, জাতীয় পার্টি একবার এবং আওয়ামী লীগ পাঁচবার জয়ী হয়েছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আঞ্চলিক সংগঠন সমর্থিত বা স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী এখনো বিজয়ী হতে পারেননি। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাঁদের জয়ের নজির রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে এবার অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একটি অংশ সমন্বিত অবস্থানে আসার চেষ্টা করছে বলে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর দুটি গ্রুপ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর মধ্যে যোগাযোগ চলছে।

দীঘিনালা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ধর্মজ্যোতি চাকমাকে একক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন দেওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। তবে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে ধর্মজ্যোতি চাকমা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “কে কাকে সমর্থন দেবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াব না। পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যেই আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা বলেন, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আস্থা কমেছে। তাঁর ভাষায়, “ক্ষমতায় যাওয়ার আগে একরকম কথা বলা হয়। ক্ষমতায় গিয়ে ভিন্ন আচরণ দেখা যায়। এবার জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

বিএনপি প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, অতীতে সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি পাহাড়ি ও বাঙালি—সব সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করেছেন। বিগত সরকারের সময়ে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও এবার তিনি মাঠে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করেন। তিনি আশ্বাস দেন, নির্বাচিত হলে বৈষম্যহীন উন্নয়ন করবেন।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. এয়াকুব আলী জানান, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তিনি মাঠে কাজ করছেন। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. কাউছার বলেন, ধর্মভিত্তিক দল হলেও তাঁরা সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে চান। নির্বাচিত হলে পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না বলেও তিনি জানান।

খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন এবং নারী ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন ভোটার রয়েছেন। ভৌগোলিক কারণে অ-উপজাতি ও উপজাতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভোটার সংখ্যা প্রায় সমান। ভোটের মাঠে প্রার্থীদের মধ্যে ৬ জন অ-উপজাতি ও ৭ জন উপজাতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সদস্য।

জেলায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি)-এর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এর মধ্যে ৬৩টিকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ধরা হয়েছে। জেলা নির্বাচন কার্যালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সর্বশেষ হিসাবে দলীয় ৯ জন এবং ৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর মো. এয়াকুব আলী, জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. কাউছার। আরও আছেন বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির ঊশেপ্রু মারমা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম, খেলাফত মজলিসের মাওলানা আনোয়ার হোসেন মিয়াজী এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তফা।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেন সমীরণ দেওয়ান, জিরুনা ত্রিপুরা, ধর্মজ্যোতি চাকমা ও সোনারতন চাকমা। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন মোট ১৫ জন প্রার্থী। যাচাই-বাছাইয়ে প্রথম দফায় ৭ জনের মনোনয়ন বৈধ এবং ৮ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে আপিলের মাধ্যমে ধাপে ধাপে আরও ৬ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বোধিসত্ত্ব দেওয়ানের সভাপতিত্বে জেলার বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ১১ সদস্যের নাগরিক কমিটির পাশাপাশি কয়েকজন সমর্থনপ্রত্যাশী প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী জানান, কাউকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে নাগরিক কমিটির কার্যক্রম বিলুপ্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি নির্বাচনি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন। তিনি সাবেক খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসনবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ৬২ হাজার ৯৭৭ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। সে সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা ১ লাখ ২২ হাজার ৮০৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত