সাতক্ষীরায় সার সংকট/চাহিদা প্রাক্কলন অর্ধেক, কমেছে বরাদ্দও, ঘাটতি অস্বীকার কৃষি কর্মকর্তার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাতক্ষীরা

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ৫৭
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

সাতক্ষীরায় চলতি আমন মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষক ও ঘেরের মৎস্যচাষিরা। কোথাও কোথাও গোপনে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে তাদের।

সার নিয়ে এই হাহাকারের মধ্যেই সরকারি নথিতে উদ্বেগজনক একটি তথ্য উঠে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে জেলায় সামগ্রিক সারের চাহিদা প্রাক্কলন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে কমানো হয়েছে বরাদ্দ। অথচ এ সময়ে জেলায় কৃষিজমির পরিমাণ কিংবা মাছের ঘেরের সংখ্যা কমেনি।

অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে চাহিদা আগের মতোই আছে, কিন্তু সরকারি প্রাক্কলন ও বরাদ্দ কমেছে। এদিকে কৃষি কর্মকর্তার দাবি, মাঠে সারের কোনো ঘাটতি নেই।

প্রাক্কলন ও বরাদ্দ কমা নিয়ে প্রশ্ন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রোপা আমন মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। পাশাপাশি চিংড়ি ও সাদা মাছের প্রায় ৬৬ হাজার ৭৬০টি নিবন্ধিত ঘের রয়েছে। এসব ঘেরের আইল বা পাড় ও তলদেশে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়।

অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সাতক্ষীরায় প্রধান চার ধরনের সারের (ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) মোট চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৪ হাজার ৫৪২ টন। আগের অর্থবছরে চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৮২ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চাহিদা প্রাক্কলন ৯৭ হাজার ৪০ টন কমানো হয়েছে।

চাহিদার বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাতক্ষীরায় মোট সারের বরাদ্দ ছিল ৮৯ হাজার ৪৪৫ টন। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮ হাজার ৬১৩ টন। অর্থাৎ বরাদ্দ কমেছে ৮৩২ টন।

এক বছরের ব্যবধানে সরকারি নথিতে চাহিদা প্রাক্কলনের এই বিশাল পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কৃষিজমির পরিমাণ ও ঘেরের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে চাহিদা এতটা কমে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষক ও ডিলাররা।

প্রয়োজন অনুযায়ী মিলছে না সার

পাটকেলঘাটার কৃষক আবুল হোসেন জানান, ‘সারের বিভিন্ন দোকান ঘুরেও চাহিদামতো সার পাচ্ছি না। দুইদিন ঘুরে দুই ডিলারের কাছ থেকে ১০ কেজি করে মোট ২০ কেজি ইউরিয়া পেয়েছি।’

তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষক মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমন মৌসুমে ইউরিয়া সার সবচেয়ে বেশি দরকার। কিন্তু ডিলারের কাছে গেলে এক বস্তা সারও মিলছে না। খোলাবাজারে গিয়ে বস্তাপ্রতি দুই-তিনশ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।’

সাতক্ষীরা সদরের গাভা গ্রামের কৃষক অমল কুমার সরকার বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে সারের দোকানে দোকানে ঘুরছি। তারা বলছে সার নেই। সঠিক সময়ে সার দিতে না পারলে ক্ষেতের ধান রোদে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে।’

দেবহাটার পারুলিয়ার ঘেরচাষি আজিবুর রহমান বলেন, ‘ঘেরের আইলে সবজি চাষের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া ও পটাশ সার ডিলারের কাছে মিলছে না।’

কৃষকরা জানান, ২৭ টাকা কেজি দরের টিএসপি সার বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকায়। ডিএপি সারও বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে।

স্বীকার করলেন ডিলাররা, মানতে নারাজ কৃষি কর্মকর্তা

কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ধুলিহর বাজারের সাব-ডিলার মো. মোখলেছুর রহমান। তিনি জানান, সরকার থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে মাঠের চাহিদা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ কম বলেই কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

একাধিক সার ডিলারের দাবি, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই তিন মাসে সাতক্ষীরায় প্রায় ২৭ হাজার টন সারের চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ১১ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ১৬ হাজার টন কম। অনেক ডিলার পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য জেলা থেকে বেশি দামে সার নিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। ফলে তারা যেমন বাধ্য হচ্ছেন বেশি দাম রাখতে, তেমনি কৃষকরাও ক্ষেতের ফসল বাঁচাতে বাধ্য হচ্ছেন বাড়তি দামেই সার কিনতে।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশেন (বিএফএ) সাতক্ষীরা জেলার সভাপতি শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাতক্ষীরায় ধানের পাশাপাশি মাছের ঘেরে প্রচুর সার লাগে। কিন্তু সরকারি নীতিমালায় ঘেরের জন্য আলাদা কোনো সার বরাদ্দ থাকে না। ফলে কৃষির বরাদ্দ থেকেই ঘেরে সারের জোগান দিতে হয়। নতুন করে বাস্তবভিত্তিক জরিপ চালিয়ে কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতের চাহিদা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা দরকার।’

তবে চাহিদা-বরাদ্দের অসংগতি ও মাঠে সারের ঘাটতির কথা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, ‘জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। বিসিআইসি ও বিএডিসির ১৯৭ জন ডিলার ও ৬৪২ জন সাব-ডিলারের মাধ্যমে সরকারি নিয়মে সার বিতরণ হচ্ছে। কোথাও কৃত্রিম সংকট বা চড়া দামে সার বিক্রির প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত