সামাজিক মাধ্যমে পর্নো কারবার, নেই প্রতিকার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সামাজিক মাধ্যমে সিক্রেট গ্রুপ খুলে চলছে পর্ন কারবার। স্ট্রিম গ্রাফিক
সামাজিক মাধ্যমে সিক্রেট গ্রুপ খুলে চলছে পর্ন কারবার। স্ট্রিম গ্রাফিক

সামাজিক মাধ্যমে ‘এক্সপোজ’– এর নামে খোলা পাবলিক গ্রুপে বিক্রি হচ্ছে নারী-শিশুর হাজারো ছবি-ভিডিও। টাকা দিয়ে টেলিগ্রাম চ্যানেলে সদস্য হলেই মিলছে এসব দেখার সুযোগ। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি চললেও নির্বিকার প্রশাসন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের নজরে যেসব আসে, তার ব্যপারে আমরা চেষ্টা করি। এটা তো একটা নিষিদ্ধ জিনিস, গোপনীয় জিনিস। যারা করে, তারা তো চেষ্টা করে যেন আমাদের নজরে না আসে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কমাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও কঠোর আইন করতে হবে। নতুন করে ন্যাশনাল নীতিমালা করতে হবে, কঠোর হতে হবে। আর একক পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এসব রোধ করা সম্ভব না। এতে সমাজের নীতি-নৈতিকতার ব্যাপার আছে। পারিবারিক শিক্ষার বিষয় আছে। এসব নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।’

যেভাবে চলে পর্নোগ্রাফি

স্ট্রিম আগেই একাধিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ফেসবুকে অন্তত ১৫টি ‘এক্সপোজ পেজ’ রয়েছে। এসব গ্রুপে বিভিন্ন নারীদের খোলামেলা ছবি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, আরও ছবি-ভিডিও দেখতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হোন। আর এসব চ্যানেলে টাকা দিয়ে যুক্ত হয়ে অন্যের ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দেখা যায়।

এসব সামাজিক মাধ্যম যারা পরিচালনা করছেন, তারা ব্যক্তির নাম গোপন রেখে অন্যকে এক্সপোজ করার আহ্বান জানিয়েও পোস্ট দেন। সেখানে সাড়া দিয়ে অনেকে নিজের সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার ছবির সামনে নিয়ে আসেন। অন্তত ১০টি টেলিগ্রাম চ্যানেলে স্ট্রিম টাকার বিনিময়ে শিশু নিপীড়ন ও ধর্ষণের ভিডিও বিক্রির অফার দেখতে পেয়েছেন। চ্যানেল পরিচালনাকারীরা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় সাবস্ক্রিপশনের সুযোগ দেন।

আইনে কী আছে, যা বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

বাংলাদেশের আইনে পর্নোগ্রাফি বহন, বিনিময় ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। পর্নোগ্রাফির উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ বা শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর জ্ঞাত-অজ্ঞাতে ছবি-ভিডিও ধারণ অপরাধ। এই আইন ভাঙলে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা দণ্ডের বিধান রয়েছে। একইসঙ্গে পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে সম্মানহানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা ইন্টারনেটে ছড়ানোর সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের জেলসহ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।

এ ছাড়া শিশুদের ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, বিতরণ এবং বিজ্ঞাপনও আইনে অপরাধ। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এই আইনে সংঘটিত অপরাধে জড়িত কিংবা সহায়তাকারীকেও একই সাজা ভোগ করতে হবে।

ডিএমপির তথ্যে, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে শুধু রাজধানীতে মাসে গড়ে ১৪টি মামলা হয়। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন জানিয়েছেন, গত জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে ১৪, ফেব্রুয়ারিতে ১২ ও মার্চে ১৬টি মামলা হয়েছে।

সিআইডির তথ্যে, ২০২৫ সালে সিআইডির সাইবার সাপোর্ট সেন্টার পর্নোগ্রাফি, অন্যের গোপন ছবি-ভিডিও ফাঁস-সংক্রান্ত ৪৮০টি অভিযোগ নেয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এসেছে ২৩৭টি।

এদিকে, গত ১১ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ‘ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার’ সুমাইয়া সাঈদসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ। তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় পরে গ্রেপ্তার দুজনসহ মোট ছয়জনের নামে রমনা থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়। মামলায় সুমাইয়া সাঈদের বাবাও আসামি। ডিবির ভাষ্য, সুমাইয়া সাঈদের বাবা মেয়ের অনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে জেনেও, উপার্জনে সম্মতি দেন এবং অর্থ নেন।

এ ব্যাপারে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম জানান, চক্রটি সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পর্নোগ্রাফির বিজ্ঞাপন দেয় এবং নির্দিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলে অর্থের বিনিময়ে এসব বিক্রি করে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। ডিবি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গ্রেপ্তার করেছে।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করি। অভিযোগ পেলে আমরা বিভিন্ন উপায়ে অপরাধীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করি। কোনো ভিকটিম সাইবার সাপোর্ট চাইলে তা দিই।’

তবু সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধ কমছে না কেন– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা নিয়মিত অপরাধের ধরন পাল্টায়। সিআইডির সাইবার ইউনিটে জনবল কম। আমরা বারবার বলেছি, সাইবার পুলিশিং বাড়াতে হবে। আমাদের অথরিটি সেটা দেখবেন। আপাতত আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত