রাতে গর্জে ওঠে ড্রেজার, যাদুকাটায় বিলীন ঘর-সড়ক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জ

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

সুনামগঞ্জে যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা থামছেই না। রাত নামলেই নদীর তীরে এবং পার্শ্ববর্তী ভিটেয় ড্রেজার বসিয়ে যত্রতত্র তোলা হচ্ছে বালু। এতে নদী ভাঙন বেড়ে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, ঘর থেকে শুরু করে সড়কও।

সম্প্রতি জেলার তাহিরপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে যাদুকাটার ভাঙন তীব্র হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ঘাগটিয়া গ্রাম। এরই মধ্যে সেখানকার অর্ধশতাধিক বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়েছেন এলাকা ছাড়তে।

অথচ ভূমিহীনদের পুনর্বাসনে প্রায় তিন দশক আগে এই গ্রামের নদীতীরে খাসজমিতে গড়ে তোলা হয় ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রাম প্রকল্প। অসহায় পরিবারগুলো ঘরের পাশাপাশি নদীতীরে চাষাবাদের জমিও পায়। বালুখেকোদের কারণে এই প্রকল্পের বেশির ভাগ এলাকায় এখন নদীগর্ভে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে আতঙ্কের নাম স্থানীয় বাদাঘাট ইউপি সদস্য মোশাহিদ হোসেন রানুর ‘কালা বাহিনী’। এই বাহিনী আগে নদীতীরে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলত। এতে ভাঙন বেড়ে প্রথমে ফসলি জমি এবং পরে প্রকল্পের ঘর-বাড়ি বিলীন হওয়া শুরু করে। তবে তারা থামেনি। বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও সামান্য টাকা দিয়ে এখন বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করছে বাহিনীটি। এরপর সেই ভিটায় ড্রেজার বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু।

তারা জানান, রানু মেম্বার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত চন্দ্র সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যাদুকাটার পাড়ে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তার প্রভাব কমেনি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে এখনও সমানে বালু উত্তোলন করছেন।

আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আকাশ মিয়া বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকারের সময় আশ্রয়হীন হিসেবে আমরা এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিলাম। এই গ্রাম রক্ষার জন্য অনেক প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। উল্টো মারধরের শিকার হয়েছি। কালা বাহিনীর ড্রেজারের অত্যাচারে ১৫ দিন আগে আমার বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।’

ভিটার জন্য সামান্য কিছু টাকা পেয়েছেন জানিয়ে আকাশ মিয়ার স্ত্রী রাজেনা বেগম বলেন, বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন ধীরে ধীরে বসতবাড়ির কাছাকাছি চলে আসে। তখন সেটি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। একজনের বাড়ির জমিতে ড্রেজার দিয়ে বালু তুললে পাশের বাড়িটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।

পাকা সড়কের একাংশও গেছে নদীতে। স্ট্রিম ছবি
পাকা সড়কের একাংশও গেছে নদীতে। স্ট্রিম ছবি

ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল জানান, তার আশপাশের প্রায় সব বসতভিটা তাহিরপুরের কয়েকজন কিনে নেন। তারা ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় পাশের জমিগুলোও নদী ভাঙনের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ভিটা বিক্রি করতে বাধ্য হন।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া জানান, ১২ লাখ টাকার জমি বাধ্য হয়ে তিন থেকে চার লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন গ্রামবাসী। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। জোর করে গ্রামবাসীকে জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে সম্প্রতি তারা মানববন্ধন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কালা বাহিনীর হুমকিতে পারেননি।

বাদ যাচ্ছে না দর্শনীয় স্থানও

ঘাগটিয়া গ্রামের পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ১১ বিঘা জমিতে বিশাল একটি বাঁশঝাড় ছিল কয়েক মাস আগেও। জমির মালিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মোশাহিদ তালুকদার বছরখানেক আগে পুরো বাঁশঝাড়টি কয়েকজনের কাছে বিক্রি করে দেন।

মোশাহিদ স্ট্রিমকে বলেন, বাঁশঝাড়টি আর রক্ষা করতে পারব না বুঝে নিরুপায় হয়েই বিক্রি করে দিই।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে এখন আর বাঁশঝাড়ের অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা ফাঁকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, বাঁশঝাড়টি কেনার পরই সেখানে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসানো শুরু হয়।

এই এলাকাতেই রয়েছে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শিমুল বাগান। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে এই বাগানও এখন হুমকিতে। বাগানের সামনে কিছু জায়গা রেখে বাকি অংশে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলায় এখানেও নদী ভাঙছে।

বাগানে আসা পর্যটক ঢাবি শিক্ষার্থী আরশাদ হাসান বলেন, ‘শিমুল বাগানের সামনে এই পরিবর্তন দেখে আমি হতাশ হয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান হয়তো আর দেখতে পাব না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

এ বিষয়ে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, যাদুকাটা নদীর ভাঙনে তীরবর্তী গ্রামগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে নদীর তীরবর্তী এলাকাকে দ্রুত পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা প্রয়োজন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

নিজের নামে সব অভিযোগই অবশ্য অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য মোশাহিদ হোসেন রানু। উল্টো অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি তাঁর। রানু বলেন, ‘আমরা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু ইজারাদার বলে আমরা প্রতিবাদ করার কে?’

তারা শুধু নিজেদের জমি থেকে বালু তুলে বিক্রি করছেন বলেও দাবি করেন রানু। গ্রামবাসীর জমি জোর করে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি বলেন, ‘শুধু আমি না, আরও অনেকের কাছে গ্রামের মানুষ জমি বিক্রি করছে। কেউ তাহিরপুরের, কেউ বাদাঘাটের, কেউ সুনামগঞ্জের। কেউ জোর করে জমি নেইনি।’

তবে যাদুকাটা বালুমহাল-১-এর ইজারাদার নাছির মিয়া এবং বালুমহাল-২-এর ইজারাদার শাহ রুবেলের দাবি ভিন্ন। শাহ রুবেল বলেন, বিআইডব্লিউটিএ আমাদের ড্রেজারের মাধ্যমে নির্ধারিত স্থান থেকে বালু তোলার অনুমতি দিয়েছে। সেই নির্দেশনা মেনেই বালু তুলছি। কিন্তু নদীর তীর থেকে বালু তুলছে আরেকটি চক্র। তাদের অপতৎপরতা বন্ধে গত দুই মাসে জেলা প্রশাসকের কাছে ১০টির মতো আবেদনও করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, বালুমহালের ইজারাদারদের জন্য সরকার নির্ধারিত শর্ত রয়েছে। এসব শর্ত ভাঙলে ইজারা বাতিল কিংবা জামানত বাজেয়াপ্তের সুযোগ রয়েছে। ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেই কর্তৃপক্ষ ইজারা দেয় তাদের। তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সমস্যার ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, এলাকাটি দুর্গম ও দূরবর্তী। সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি কিংবা স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি না থাকলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও ড্রেজার ব্যবহার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত