জগলুল আসাদ

(প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে)
একাডেমিক লেখালেখির প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা কাজের উপর, যাকে বলে ‘ক্রিটিক করা’। কিন্তু ‘ক্রিটিক’ (Critique) শব্দটা একরৈখিক কোনো অর্থ বহন করে না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন চিন্তা-ঐতিহ্যে ক্রিটিকের ধারণা বিভিন্নভাবে পরিগঠিত হয়েছে। ক্রিটিকের ধারণাগত ইতিহাসটা না জানলে একাডেমিক লেখায় ‘ক্রিটিক’-এর যেসব রূপ পরিলক্ষিত হয় তা স্পষ্ট হবে না। আজকে এই দ্বিতীয় পর্বে প্রথমে সেই ধারণাগত ইতিহাসটা আমরা দেখব, তারপর দেখব এখনকার একাডেমিক লেখায় এই ইতিহাসের বিভিন্ন স্তর কীভাবে বাস্তবে কাজ করে।
সাধারণত ‘ক্রিটিক’ ধারণাটিকে ভালো-মন্দ বা ভুল-ত্রুটি নির্দেশ (fault-finding) অর্থে ব্যবহার করা হয়। ক্রিটিক নামক ধারণার এই অর্থ-সংকোচন নিয়ে রেমন্ড উইলিয়ামস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘Key Words’-এ। থিয়োডর এডোর্নো ক্রিটিক বলতে যেকোনো চিন্তা ও চর্চার ভেতরে যে ‘Constellation of power’ থাকে সেটির উন্মোচনকে বুঝিয়েছেন। হেবারমাস ক্রিটিক বলতে যেকোনো চিন্তার ভিত্তিমূলকে প্রশ্ন করা বুঝিয়েছেন। ক্রিটিকাল এটিচুডকে ফুকো একটা ভার্চু বা গুণ হিসেবে বর্ণনা করতে চান। ফুকোর মতে, ক্রিটিক শুরুই হয় নিরঙ্কুশ আনুগত্যের দাবিকে প্রশ্ন করে এবং প্রশাসনিক সমস্ত বাধ্যবাধকতাকে একটা যুক্তিমূলক ও চিন্তাশীল মূল্যায়নের অধীন করার মধ্য দিয়ে। ক্রিটিক ফুকোর কাছে ‘Desubjugation of the subject’ বা কর্তার বন্ধনমুক্তি।
ক্রিটিসিজম শব্দের উৎপত্তি গ্রীক ক্রিয়াপদ ‘krino’ থেকে, যার অর্থ আলাদা করা, যাচাই করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ইত্যাদি। প্রথম শব্দটি ব্যবহৃত হয় আইনি পরিসরে অভিযুক্ত করা ও রায় দেওয়া দুটো অর্থই বোঝাতে। রাইনহার্ট কোজেলেক তাঁর ‘Critique and Crisis’ গ্রন্থ অনুসরণে বলা যায়, ‘ক্রিটিক’ ব্যাপারটার আদি অর্থের ভেতরে সার্বজনীন কোনো সত্য জয়ের দাবি ছিল না, বরঞ্চ বিশেষ কোনো সংকটকে যথার্থভাবে খোলাসা করা অর্থে এবং একটা বিশেষ জীবনপ্রণালির ভেতরে বিশেষ বিশেষ গুণের শোধন বোঝাতে এই ‘ক্রিটিক’ পদ ব্যবহৃত হতো।
‘ক্রিটিক’ বা বিচার-এর ধারণা ইতিহাসের সব পর্বে এক ছিল না। পশ্চিমে ক্রিটিক বলতে বর্তমানে যে ক্রিটিকাল এটিচুডকে বোঝায়, তার সাথে এনলাইটেনমেন্ট পিরিয়ডের যোগ আছে। আলোকিত হওয়া মানেই একটা ক্রিটিকাল এটিচুড অবলম্বন করা। তালাল আসাদ মিশেল ফুকোর ‘ক্রিটিক কী’ প্রবন্ধের সূত্র ধরে বলেন, ক্রিটিক কি পশ্চিমেরই একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাকি অন্যান্য চিন্তা-ঐতিহ্যেও ক্রিটিক ব্যাপারটা আছে, সে ব্যাপারে ফুকোর প্রবন্ধটি সুস্পষ্ট দিশা দেয় না। ফুকো নিজে চিন্তার ক্ষেত্রে জিনিওলোজিস্ট হলেও এই প্রবন্ধে জিনিয়োলজিকাল পদ্ধতিতে ‘ক্রিটিক’ ধারণার বিবর্তন আলোচনা করেননি বলে তালাল আসাদ যুক্তি দেন। ইরফান আহমদ অবশ্য প্রবন্ধটি পাঠ করেছেন এইভাবে যে, ফুকোর কাছে ‘ক্রিটিক’ ব্যাপারটা মূলত আধুনিক পশ্চিমেরই বৈশিষ্ট্য। অপশ্চিমা সমাজ যে ক্রিটিক করতে সক্ষম, এই প্রসঙ্গ ঘুণাক্ষরেও তোলেননি ফুকো। ফুকোর মতে, প্রোটেস্ট্যান্ট মুভমেন্ট হচ্ছে প্রথম ক্রিটিকাল মুভমেন্ট।
খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ক্রিটিক বলতে বোঝানো হতো ফ্রি স্পিচকে, যাকে বলে পারেশিয়া। পলিটির পরিসরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সত্যকে সরাসরি, অলংকারবিহীনভাবে প্রকাশ করাকেই পারেশিয়া বলা হতো।
লেইট মেডিয়েভল পিরিয়ডে কীভাবে জীবনযাপন করতে হয়, এটা শেখানোও ক্রিটিকের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মূলত ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন ছিল এই সময়ের ক্রিটিক।
সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত সন্দেহবাদী পিয়ের বেইলি মনে করেন, ক্রিটিক হচ্ছে যুক্তিকে ওয়াহি থেকে আলাদা করার কাজ। এই সময় হিস্টোরিকাল ক্রিটিসিজম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রিক ক্লাসিকাল টেক্সট ও স্ক্রিপচারগুলো নিয়ে ব্যস্ততা এই সময়ে বেড়ে যায় বেশ। বেইলি সমস্ত তত্ত্বের ব্যাখ্যায় যুক্তি দাবি করেন এবং মনে করেন যে, যা কিছু যুক্তিশীল বলে ইতোমধ্যেই গৃহীত তাকে ক্রিটিকাল রিজনিং-এর মাধ্যমে নস্যাত করা যেতে পারে।
কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে নত হওয়া ছাড়াই সবাই সমতার ভিত্তিতে একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারে। বেইলি একটা ‘Republic of Letters’-এ আস্থা রাখতেন। এই সতেরো শতকীয় জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতিতে বিচার ও সাক্ষ্যের ভিত্তি ছিল সামাজিক আস্থা আর ভদ্রোচিত কোনো কর্তৃপক্ষ।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকটা কান্টীয় আধিপত্যই প্রধান হয়ে ওঠে। ‘রিপাবলিক অব লেটার্স’ প্রতিস্থাপিত হয় ‘কোর্ট অব রিজন’ দ্বারা। কান্ট প্রচার করেন, রাজনৈতিক ও গির্জার বাঁধা-নিষেধ থেকে স্বাধীনতাই শুধু স্বাধীনতা নয়, প্রকৃতপক্ষে দরকার বিজ্ঞান ও যুক্তির অগ্রগতি। কান্টের পূর্বের এনলাইটেনমেন্ট ফিলোসফারদের কাছে হিউম্যান রিজন ছিল একধরনের সেকুলারাইজড মেটাফিজিক্স, যেটা তাঁরা রাষ্ট্র ও গির্জার ভানভনিতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতো। কান্টের কাছে ক্রিটিক হয়ে ওঠে এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া, যেখানে প্রাইভেট ফেইথ ও পাবলিক রিজনের ডোমেইনকে আলাদা ঘোষণা করা হয়। কান্টীয় ফর্মুলা ক্রিটিককে বৈজ্ঞানিক সত্য অনুসন্ধানের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখে এবং নিজেকে আলাদা করে ফেলে রাজনীতি, এমনকি বিশ্বাস থেকেও। কান্টের ক্রিটিক-ভাবনা প্রাত্যহিক জীবনের চেয়ে ব্যাপৃত থাকে জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে।
হেগেলীয় দর্শন কান্টের এই বিচ্ছিন্নকরণকে প্রশ্নবোধক করে, কান্টের জ্ঞানতত্ত্বকে সরিয়ে রাখে পাশে। হেগেল বলেন, হাজির থাকা এই জগত দ্বন্দ্বে ভরা। চিন্তা ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব আমাদের সত্তাকে বিকশিত করে, ‘হয়ে ওঠার’ উচ্চতর জগতের দ্বন্দ্বমূলক গাঠনিক উপাদান এরা। মার্ক্স হেগেলের দ্বন্দ্বের ধারণা নিলেও বাস্তব দুনিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রাথমিকতার কথা বলেন। দ্রুত শিল্পায়িত বিশ্বে মার্ক্সের কাছে ক্রিটিক ও বিপ্লবী সহিংসতা আবির্ভুত হয় শ্রেণী সংগ্রামের পরিপূরক হিসেবে। এক ফাঁকে বলে রাখি, ‘ইজ ক্রিটিক সেক্যুলার’ বইয়ের ভূমিকায় ওয়েন্ডি ব্রাউন দেখান, মার্ক্স ক্রিটিসিজম ও ক্রিটিকের মধ্যে পার্থক্য করেন। ফয়েরবাখ যখন ধর্মকে illusionary consciousness বলেন, তখন এটা ক্রিটিসিজম, কিন্তু যখন কনক্রিট ম্যাটেরিয়াল কন্ডিশন, অর্থাৎ যে মূর্ত-বস্তুগত শর্তের প্রতিষেধক হিসেবে ধর্ম হাজির হয় তাঁর পর্যালোচনা, মার্ক্সের কাছে, ক্রিটিক। তবে, আসাদ, হেবারমাস, সাইদ ও অন্যান্যরা আলোচনার সুবিধার্থে ক্রিটিসিজম ও ক্রিটিককে অভিন্ন অর্থ ধরেই আগান, ক্রিটিসিজম পদটির সাহিত্য সম্পৃক্ততা মনে রেখেও।
উল্লেখ্য, ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর ‘রিস্টেটিং অরিয়েন্টালিজমঃ আ ক্রিটিক অব মডার্ন নলেজ’ বইতে ক্রিটিক ও ক্রিটিসিজমের মধ্যে চমৎকার করে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্রিটিসিজমের কাজ কোনো বিশেষ ডিসিপ্লিন নিয়ে; আর, ক্রিটিক মূলত কাজ করে সিস্টেম নিয়ে। যেকোনো সিস্টেমের যে ভিত্তিমূলক অনুমান বা ফাউন্ডেশনাল এসাম্পসান সেটিকে ক্রিটিক প্রশ্ন করে, সেটা নিয়ে ‘খেলে’; অন্যদিকে, ক্রিটিসিজম কোনো ডিসিপ্লিনের ভেতর থেকে ডিসিপ্লিনের প্রোটোকল মেনে ডিসিপ্লিনকে শক্তিশালী করে ও ডিসিপ্লিনটির বিভিন্ন অনুষঙ্গের ভাষ্য বা বিশ্লেষণ হাজির করে। ক্রিটিসিজম যেকোনো প্রফেশনালের রুটিন কাজ।
অপরপক্ষে, ক্রিটিক একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্ম, যা পুরো সিস্টেমটার ভেতরকার অনুমানকে সমস্যায়িত করে,প্যাটার্ন উদ্ঘাটন করে ও কোনো কিছুর হয়ে উঠাকে ‘আবিস্কার’ করে। ক্রিটিসিজম একটু রক্ষণাত্মক ব্যাপার, আর ক্রিটিক, বলা যেতে পারে বেশ আক্রমণাত্মক। ক্রিটিক সাধারণত সংকটকালে ভালো কাজে দেয়, অন্যদিকে ক্রিটিসিজম স্বাভাবিক সময়ে কাজ করতেই স্বচ্ছন্দ। ক্রিটিসিজম বিদ্যমান নলেজ সিস্টেমকে মান্য করে আগায়; আর, ক্রিটিক পুরো কাঠামো ও ভিত্তিকে উদ্ঘাটন করে বা ধ্বসায়, বা প্রশ্ন করে।
বিংশ শতাব্দীতে নব্য-কান্টীয়রা হেগেলবাদ ও মার্ক্সবাদের বিরোধিতার নিয়তে আবার ক্রিটিকের ধারণাকে জ্ঞানতত্ত্বে সীমায়িত করে ফেলেন। ক্রিটিকের নীতি হয়ে ওঠে ইউনিভারসাল রিজন। বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয় এমন ব্যাপার হিসেবে যাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করা যায়। যেহেতু, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিশ্বাসভিত্তিক হওয়ায় এগুলোকে ক্রিটিক করা যায়না, তাই এগুলো সায়েন্টিফিক ফ্যাক্টের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে না। কার্ল পপার সহ অন্যান্য মিথ্যাপ্রতিপাদনবাদীরা (ফলসিফিকেশনিস্টরা) জ্ঞানতত্ত্বকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করে ফেলে। তাঁরা বলতে থাকেন, জগৎ সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সীমিত, তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজকে সে অনুযায়ী রূপান্তর করাই যুক্তিসঙ্গত।
এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন, ক্রিটিক হচ্ছে একটা সেক্যুলার এক্সারসাইজ। তাঁর দ্য ‘The World, text and the critic’ বইয়ে তিনি সেক্যুলার ক্রিটিসিজম আর রিলিজিয়াস ক্রিটিসিজমকে আলাদা করেছেন। ক্রিটিক মাত্রই তাঁর কাছে সেক্যুলার, নন-সেক্যুলার সমাজেও যে যুক্তির ব্যবহার আছে সেদিকে তিনি নজর দেননি। হিউম্যানিজমের খুঁত সম্পর্কে সাইদ সজাগ সত্ত্বেও হিউম্যানিজমের সংকট দূর করতে, তাঁর মতে, দরকার আরো বেশি হিউম্যানিজম। যেমন গণতন্ত্রের সংকট দূরীকরণে দরকার আরো বেশি গণতন্ত্র।
সাইদের সেক্যুলার ক্রিটিসিজমের ধারণা পর্যালোচনা করেছেন তালাল আসাদ। সাইদের আইডিয়াসমূহের শক্তি ও সংকট নিয়ে বিশদ আলোচনা পাওয়া যাবে ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘Restating orientalism: A Critique of modern knowledge’ এবং হামিদ দাভাশি'র ‘Post-Orientalism: Knowledge and Power in a time of terror’ বইদ্বয়ে। ‘Is Critique secular: Blasphemy, Injury and free speech’ সংকলনে তালালের প্রবন্ধটিতে অথবা The Immanent frame পত্রিকায় ‘Historical notes on the idea of secular criticism’ পত্রিকায় তালাল আসাদ এডওয়ার্ড সাইদের সেক্যুলার ক্রিটিসিজমের ধারণা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, এবং ক্রিটিক ধারণার বিবর্তনও আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধটির শেষাংশে এসে তালাল দেখান, সেক্যুলার ক্রিটিক একটা মডার্ন থিয়োলজি। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানিটি অলরেডি র্যাশনাল, সেইটার সাপেক্ষেই অন্যান্য ধর্মকে পশ্চিম বিচার করেছে। র্যাশনালিটির সঙ্গে বোঝাপড়া করে খ্রিস্টানিটিকে আগাতে হয়েছে। বাইবেলীয় বিশ্বাস গ্রীক দার্শনিক অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে খ্রীস্টানিটির অবয়ব গঠন করেছে, তা শুধু ইউরোপের জন্যে না, বিশ্ব ইতিহাসেই বিরল বলে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট মনে করেন, তালাল জানান। তাছাড়াও, সেক্যুলার ক্রিটিসিজম, যার সঙ্গে যুক্তি ও স্বাধীনতার ধারণা যুক্ত বলে প্রচার করা হয়, তা হয়ে উঠেছে আধুনিক মানুষের সত্যান্বেষণের ক্রমাগত প্রচেষ্টার স্মারক, এবং অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব! এই অর্থেও সেক্যুলার ক্রিটিককে তালাল আসাদ মডার্ন থিয়োলজি বলেছেন।
ফুকোর ‘What Is Critique?’ প্রবন্ধের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছেন জুডিথ বাটলার। জুডিথ বাটলার বলেন, যা বা যেটিকে ক্রিটিক করা হচ্ছে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বিমূর্ত ও জেনারালাইজড প্র্যাকটিস হিসেবে ক্রিটিককে বিবেচনা করলে ক্রিটিক তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। ক্রিটিক সবসময়ই ডিল করে বিশেষ কোনো চর্চা, প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠিত চিন্তা বা ব্যবস্থা কিংবা বিশেষ কোনো জ্ঞানখণ্ডকে। জুডিথ বাটলার ফুকোর ক্রিটিকের ধারণার কেন্দ্রীয় প্রণোদনাকে চিহ্নিত করেন ‘How Not to Be Governed?’ এই প্রশ্নের মধ্যে। ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে এই প্রশ্নটিই আরো সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করে এই প্রশ্নে যে, ‘What Are the Limits of the Right to Govern?’ ফুকোর সূত্র ধরে জুডিথ বাটলার বলেন, ক্রিটিকের দুটো কাজ। এক. কীভাবে জ্ঞান ও ক্ষমতা মিলে জগতের শৃঙ্খলা গঠন করে এবং সেটি নিজের শর্তেই কী করে গ্রহণীয় হয়ে ওঠে সেটি দেখানো। দুই. সেই ব্রেকিং পয়েন্টও নির্দেশ করা যেটি এই ব্যবস্থার অভ্যুদয় ঘটায় এবং বিলয়ও ঘটাতে পারে।
ক্রিটিকের কোনো একক সংজ্ঞা সম্ভব নয়। এটি একটি ফ্যামিলি কনসেপ্ট। রিলিজিয়াস ক্রিটিক আর সেক্যুলার ক্রিটিক এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে ক্রিটিকের ইতিহাস প্রবাহিত নয়। ক্রিটিক নিজেকে হাজির করতে পারে নানা ফর্মে, নানা সুরত ও হালে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক লেখালেখির অন্যতম কাজ ক্রিটিক করা। এই ক্রিটিকও করা হয় একাডেমিক ও প্রফেশনাল নানাবিধ শর্তাবলি মেনে নিয়েই। ক্রিটিকের একক কোনো অধিক্ষেত্র নেই।
ক্রিটিক নিয়ে আলোচনায় কান্ট অত্যাবশ্যকীয় দার্শনিক। কান্ট ক্রিটিক বলতে বুদ্ধির সীমা-সরহদ্দ, সম্ভাবনা, বৈধতা, শর্ত ও আত্মবিচার বোঝান। কোনো কিছুকে যুক্তি ও বুদ্ধির নির্ণয় হিসেবে হাজির করা। কান্ট তাঁর ‘ক্রিটিক অব পিউর রিজন’-এ অভিজ্ঞতা ছাড়াই (a priori) বা অভিজ্ঞতার পূর্বেই কী জানা সম্ভব, মেটাফিজিক্স আদৌ সম্ভব কিনা, এটা দেখান। এখানে ক্রিটিকের কাজ একধরনের সীমারেখা টানা। এই বইটি প্রথম ক্রিটিক নামে পরিচিত। কান্টের প্রথম ক্রিটিক যদি আলোচনা করে ‘আমরা কী জানতে পারি?’, তাহলে তাঁর দ্বিতীয় ক্রিটিক, অর্থাৎ ‘ক্রিটিক অব পিউর রিজন’ জিজ্ঞেস করে ‘আমাদের কী করা উচিত?’ এই প্রশ্নের উত্তর, অর্থাৎ আমাদের নৈতিক কর্মের নীতি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ থেকে আসবে না, বরং যুক্তির অটোনমি থেকেই আসবে। এই বইয়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত ক্যাটেগরিকাল ইম্পারেটিভ ধারণাটি, অর্থাৎ শর্তহীন আদেশ ও নৈতিকতার সার্বজনীন ‘যৌক্তিক’ নিয়ম এনেছেন।
কোন জিনিসকে কেন আমরা সুন্দর বলি অথচ এর কোনো উপযোগিতা নেই, আমাদের কোনো স্বার্থও নেই, এবং এই নান্দনিক বোধের সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক কী, প্রকৃতিজগতকে কেন আমাদের উদ্দেশ্যময় মনে হয় এইসব বিচারই হচ্ছে কান্টের তৃতীয় ক্রিটিক, অর্থাৎ ‘ক্রিটিক অব জাজমেন্ট’-বইয়ের সারকথা। কান্টের এই তিন ক্রিটিক নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করতে হবে। যাইহোক, কান্ট আদালতের রূপকে তাঁর ক্রিটিক ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করেছেন। বুদ্ধি বা বিচারশক্তি অন্য কোনো কিছুকে বিচার করবার আগে যেন নিজের যোগ্যতাকে যাচাই ও বিচার করে নিচ্ছে। কান্টের ‘ক্রিটিক’-কে ট্রান্সেন্ডেন্টাল ক্রিটিক বলা হয়। এটির কাজ হচ্ছে, কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান অর্জনের পেছনে মনের ভেতরে আগে থেকেই কী শর্ত কাজ করছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা।
কান্টের ট্রান্সেন্ডেন্টাল ক্রিটিক মনের ভেতরকার অপরিবর্তনীয় শর্ত ও উপাদান খোঁজে, আর হেগেলের ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক’ খোঁজে কোনো জ্ঞান বা ব্যবস্থার ভেতরকার দ্বন্দ্ব, স্ববিরোধ ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তাই হেগেলের এই ইমানেন্ট ক্রিটিক বা অভ্যন্তরীণ বিচার বা পর্যালোচনার ধারণাটিও বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এটির অর্থ হচ্ছে, কোনো কিছুকে তার নিজের শর্তেই বিবেচনা করা, কোনো বহিস্থ মানদণ্ড ব্যতিরেকেই। একটা টেক্সট বা কোনো আইডিয়া যে দাবি, প্রতিশ্রুতি ও সঙ্গতি প্রস্তাব করে, তার ভিত্তিতেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করাকে বলা হবে ইমানেন্ট ক্রিটিক। হেগেল কান্টের যে সমালোচনা করেছেন, কেউ কেউ তাকে ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক অব কান্ট’ বলেন।
হেগেলের ‘Aufhebung’ ধারণাটিও বোঝা জরুরি। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ সাব্লেশন। তিনটি অর্থ এটির সঙ্গে যুক্ত—বাতিল করা, সংরক্ষণ করা ও উত্তরণ ঘটানো। আউফহেবং অনুযায়ী বললে একটা ক্রিটিক তিনটি কাজ করে: পূর্ববর্তী কারও বা কোনো অবস্থানকে নাকচ বা অতিক্রম করে, তার ভেতরকার প্রাসঙ্গিক অন্তর্দৃষ্টি ধরে রাখে বা সংরক্ষণ করে এবং একটি অধিকতর সমৃদ্ধ তাত্ত্বিক অবস্থানে উত্তোরিত হয়। কার্ল মার্কস হেগেলের এই ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক’ ও ‘আউফহেবং’ (Aufhebung)-এর ধারণাকে বস্তুগত জগতে প্রয়োগ করেছিলেন। উল্লেখ্য, হেগেলের নামে ‘থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিন্থেসিস’ বলে যে সরলীকৃত ধারণা প্রচার করা হয়, তা হেগেলকে কিছুটা বুঝতে সহায়তা করলেও হেগেল এইভাবে একরৈখিক বর্ণনা দেননি। এই ত্রয়ী মূলত গটলিব ফিখটে ব্যবহার করেছিলেন এবং হাইন্রিশ মরিৎস-এর মাধ্যমে এই ত্রি-বিভাগ জনপ্রিয় হয়। তিনি একে বাতিল করেননি, তবে তাঁর ‘দ্য ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট’ বইয়ে একে ‘লাইফলেস স্কিমা’, ‘মনোটোনাস ফরমালিজম’ বলে অভিহিত করেছেন। এর দ্বারা তিনি শেলিং ও তাঁর অনুসারীদের ইঙ্গিত করেন।
তাই তো মার্কসকে হেগেলের উত্তরসূরি বলা হয়। ইমানেন্ট ক্রিটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কার্ল মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ কীভাবে নিজেই নিজের ধ্বংসের বীজ বহন করে এবং ‘আউফহেবং’ ধারণা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদকে যেমন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাতিল করলেও পুঁজিবাদের যে ভালো দিকগুলো, সেগুলো বিলুপ্ত হবে না, বরং সংরক্ষিত ও রূপান্তরিত হয়ে উচ্চতর ও শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপরে আমরা তত্ত্বীয়ভাবে ক্রিটিকের নানা অর্থ-পরম্পরা আলোচনা ও কিছুটা ঠিকুজি অনুসন্ধান করলাম। এইখানে আমরা ক্রিটিক করবার চারটি পদ্ধতি বা বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
এক। উল্টা দাবি হাজির করা
ক্রিটিক বা ক্রিটিকাল থিংকিং-এর একটা পদ্ধতি হলো, কোনো একটি আইডিয়ার উলটো আইডিয়া হাজির করা, বা যা দাবি করা হচ্ছে, সেটির উলটোটা দাবি করা। প্রথম দাবিটা কোন স্ট্যান্ডপয়েন্ট বা অনুমান (assumption) বা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদগত সেটিকে বুঝে নেওয়া ও প্রশ্ন করা। দরকার হলে, দেখবার নতুন প্রিজম বা মাপকাঠি উপস্থিত করা। তারপর, প্রথম দাবিটা কী কী অগ্রাহ্য করেছে সেটি নজরে আনা। আর অন্য কী কী দিয়ে বা কীভাবে দেখলে দেখাটা পূর্ণ হয় সেটিকেও তুলে ধরা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ক্রিটিক করা ছাড়া, ক্রিটিকালিটি বা ক্রিটিকাল এটিচুড ছাড়া জ্ঞানের কোনো বিকাশ অসম্ভব!
ক্রিটিক কী করে করতে হয় তার নজির বিবেক চিবরের (Vivek Chibber) ‘Edward Said’s Orientalism and its afterlives’ প্রবন্ধসূত্রে এডওয়ার্ড সাইদের দাবির ক্রিটিক থেকে বুঝে নিতে পারি। যেমন, এডওয়ার্ড সাইদ দাবি করলেন ‘Colonialism is justified in advance by orientalism’। অর্থাৎ, প্রাচ্যবাদী জ্ঞান উপনিবেশবাদকে আগেভাগেই ন্যায্য প্রমাণ করে রাখে। তারমানে, প্রাচ্যবাদী বয়ান ও উপনিবেশবাদ একটা কার্যকারণ সম্পর্কে আবদ্ধ, যেখানে উপনিবেশবাদকে বিবেচনা করা হলো ফলাফল হিসেবে। তো, বিবেক চিবর কারণের যে তীর (Causal arrow), সেটিকে উল্টে দিলেন; বললেন, উপনিবেশবাদ ফলাফল না, বরঞ্চ অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সের কারণ। বললেন, অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সকেই জন্ম দিয়েছে কলোনিয়াল প্রজেক্ট বা ঔপনিবেশিক প্রকল্প, উল্টোটা নয়। আবার, যেখানে সাইদ তাঁর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন কালচারাল এনালিসিসের পরিপ্রেক্ষিতে, চিবর নজর দিতে বললেন উপনিবেশবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। বিবেক দাবি করলেন, উপনিবেশবাদের গোড়া ইউরোপীয় সংস্কৃতির ভেতরে নাই, আছে তার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্স না থাকলেও আধুনিক উপনিবেশবাদ অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্স তৈরি করে নিত নিজের বস্তুগত স্বার্থে। তারপর তিনি উল্লেখ করলেন, সাইদ তাঁর ব্যাখ্যায় কী কী মিস করেছেন। সাইদ মিস করেছেন পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ, শ্রেণীস্বার্থ প্রসঙ্গ, রাষ্ট্রের ভূমিকা ইত্যাদি বস্তুবাদী বর্গসমূহ বা materialist categories। কলোনিয়ালিজম নিয়ে কোনো আলোচনায় পুঁজিবাদ আসবে না, এটা হতেই পারে না। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও তার নৃশংসতার উদ্ভব হয়েছে তাদের বস্তুগত স্বার্থ এবং বিশেষ সামাজিক পরিগঠন থেকে।
তাহলে, চিবর ক্রিটিকটা কীভাবে করলেন? সাইদের দাবিকে প্রথমে তিনি প্রবলেমেটাইজ (Problematize) করলেন, পদ্ধতিগত প্রশ্ন তুললেন, সাইদ কী কী জিনিস মিস করে গেছেন সেটি উল্লেখপূর্বক কীভাবে উপনিবেশবাদকে ব্যাখ্যা করতে হবে সেটিরও একটা কাঠামো উল্লেখ করলেন। উপনিবেশবাদের সাথে প্রাচ্যবাদী জ্ঞানতত্ত্বের সম্পর্ককে তিনি বাতিল করলেন না, কিন্তু সম্পর্কসূত্রটিকে উলটে দিলেন এবং নতুন একটি কাঠামোয়, যার নাম পলিটিকাল ইকোনমি, অধিক কার্যকরীভাবে উপনিবেশবাদের গতিধারা বোঝা যাবে বলে দাবি করলেন। বিবেক চিবর আর্গুমেন্ট দিলেন, সাইদ যে ‘পশ্চিম’কে ক্রিটিক করলেন সেই পশ্চিম আসলে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের পশ্চিম। এই পশ্চিমই একমাত্র পশ্চিম নয়, আরও পশ্চিম আছে।
এটিকে সাইদের দাবির মার্ক্সবাদী ক্রিটিক বা বিচার বলতে পারব আমরা। তো, বিবেককেও কিন্তু ক্রিটিক করা যাবে! এখানে খেয়াল করবার বিষয়, যেমনটি আমরা হেগেলের আউফহেবং-এর ধারণায় বলেছি যে, এখানে তিনি সাইদের অবদানকে ক্যান্সেল করছেন না, বরং সাইদের অন্তর্দৃষ্টি ও বক্তব্যকে “প্রিজার্ভ” বা সংরক্ষণ করে আরেকটা মাত্রা যোগ করে তত্ত্বটিকে “এলিভেইট” বা উত্তরণ ঘটাচ্ছেন, যে তিনটি বিষয় হেগেলের এই আউফহেবং বা সাব্লেশন ধারণার ভেতর ক্রিয়াশীল।
২। স্ববিরোধ উন্মোচন
বিভিন্ন জ্ঞানগত দাবিকে ক্রিটিক করা ছাড়াও বিভিন্ন ধারণাকেও ক্রিটিকাল এক্সামিনেশন বা বিচারমূলক বিশ্লেষণের আওতায় আনা যায়। এর একটা পদ্ধতি হলো, প্রশ্ন করা এবং স্ববিরোধ উন্মোচন করা। ধরা যাক, স্বাধীনতার ধারণাটি। লিবারেল তত্ত্বের এটি কেন্দ্রীয় ধারণা ও বহুল প্রশংসনীয় রাজনৈতিক বর্গ।
স্বাধীনতার ধারণাকে ক্রিটিক করতে হলে দুটো কাজ করা যায়। প্রথমত: প্রশ্ন করা যে, কার স্বাধীনতা? দ্বিতীয়ত: স্বাধীনতার ধারণার ভেতরে যে পরাধীনতার স্বভাব আছে বা পরাধীন করার বাসনা আছে, সেটা উন্মোচন করা। যেমন, দাস মালিকদের স্বাধীনতা, পুঁজিবাদের স্বাধীনতা, দখলদার উপনিবেশকদের স্বাধীনতা ইত্যাদি।
এলিজাবেথ আঙ্কার তাঁর Ugly Freedoms বইয়ে ঠিক এই পদ্ধতিতেই আমেরিকান ‘ফ্রিডম’-ধারণাকে ক্রিটিক করেন। বইটি মূলত ‘স্বাধীনতা’র লিবারেল ধারণার ক্রিটিক বা পশ্চিমা লিবারেলিজমের বিচার আকারেও বইটি পড়া যায়। এলিজাবেথ আঙ্কার প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ওয়েন্ডি ব্রাউনের অধীনে পিএইচডি গবেষণা করেছেন।
আঙ্কার বলেন, ‘Torture is a practice of American freedom.’ বইটিতে তিনি দেখান, দাসপ্রথা-পরবর্তী মুক্তির নামে প্রতারণা, নয়া-উদারনৈতিক শোষণ, আর জলবায়ু-ধ্বংস—প্রতিটাই ‘ফ্রিডম’-এর নামে ঘটেছে, ব্যতিক্রম হিসেবে নয়। উপনিবেশকদের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছে। নতুন ভূখণ্ড দখল করার এবং আদিবাসীদের ভূমি-সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার স্বাধীনতাকেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার অংশ বলে বুঝেছে, রাজতন্ত্র থেকে মুক্তির প্রকল্প হিসেবে।
দাসপ্রথাকে দাসমালিকেরা স্বাধীনতার বিপরীত ব্যাপার বলে ব্যাখ্যা করতেন না, বরঞ্চ দাস রাখাকে তাদের স্বাধীনতার চর্চারই অংশ মনে করতেন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও দাসমালিক জন সি. ক্যালহুন যুক্তি দেন, ‘Slavery was necessary for freedom’। এই ফ্রিডম কার ফ্রিডম: মনিবের স্বাধীনতা, freedom of the master।
ফ্রিডমের একটি অ্যাম্বিভ্যালেন্ট লিগাসি আছে। আঙ্কার এই দ্বিমুখিতা স্বীকার ও উন্মোচন করেন—একদিকে যেমন ফ্রিডমের নামে আধিপত্য চলে, অন্যদিকে তেমনি তিনি এই ধারণার ভেতরেই একটা দ্বিতীয়, উলটো সম্ভাবনাও খুঁজে পান: যেসব চর্চাকে তুচ্ছ, নিষ্ফল বা লজ্জাজনক মনে করা হয়, সেখানেও তিনি মুক্তির সম্ভাবনা দেখেন। স্বাধীনতার যে চর্চাগুলো আমরা উদ্যাপন করি, যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণ, শাসনে অংশীদারিত্ব, আধিপত্যহীনতা, এগুলো স্বাধীনতা নামক ধারণার জটিলতা ও সম্ভাবনা বুঝতে সহায়ক।
আঙ্কারের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দাবি হলো, ফ্রিডমকে ডমিনেশন হিসেবেও চর্চা করা যায়। অর্থাৎ তিনি দেখাতে চান, স্বাধীনতাকে আধিপত্যের বিপরীত হিসেবে দেখালে ‘স্বাধীনতা’র নিজের ভেতরে থাকা ‘আধিপত্যের’ ধারণা অলক্ষ্যে পড়ে রয়। খেয়াল করার বিষয়, স্বাধীনতার ভেতরে মুক্তির প্রকল্পকে তিনি অস্বীকার করছেন না, কিন্তু স্বাধীনতার ধারণা কীভাবে আমেরিকান ইতিহাসে আধিপত্য ও নিষ্পেষণকে জায়েজ করেছে, তার দিকে নজর দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।
স্বাধীনতার এই পরাধীন-স্বভাব উন্মোচন করাকে আঙ্কারের ক্রিটিকের একটা পদ্ধতি ধরতে পারি। অর্থাৎ কোনো ধারণাকে বাইরে থেকে আক্রমণ না করে, তার নিজের ভেতরেই যে স্ববিরোধ লুকানো আছে, সেটা উন্মোচন করা।
৩. এসেনশালাইজেশন চিহ্নিত করা
ক্রিটিকের আরেকটা সাধারণ পদ্ধতি হলো, কোনো টেক্সট বা তত্ত্ব কোথায় ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল একটা বিষয়কে স্থির, সমরূপ ‘সার’ (essence) হিসেবে হাজির করছে, সেটা চিহ্নিত করা।
সিরীয় মার্কসবাদী দার্শনিক সাদিক জালাল আল-আজম সাঈদের ‘Orientalism’-কে এই এসেনশিয়ালিজমের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন তাঁর ‘Orientalism and Orientalism in Reverse’ রচনায়। তিনি এইভাবে ক্রিটিক করেন যে, ‘প্রাচ্য’কে অরিয়েন্টালিস্টরা একরকম অখণ্ড, বদলহীন বস্তু হিসেবে হাজির করেন, সাইদ সেই ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমকেও একইভাবে একমুখী, অনড়, স্থিরসত্তা হিসেবে দেখান, পশ্চিমের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও জটিলতাকে উপেক্ষা করে। যাকে সমালোচনা করা হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, বিবেক চিবরের ক্রিটিকও একই সমস্যায় পড়তে পারে উল্টো দিক থেকে—যখন তিনি ‘পশ্চিম’কে একরকম অভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে ধরে নেন, ভেতরের বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে। এসেনশিয়ালাইজেশন-ক্রিটিক তাই শুধু মূল টেক্সটে না, ক্রিটিকের ভেতরেও প্রয়োগ করা যায়—এই বোধ একে একাডেমিক লেখায় বেশ ঘন ঘন ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটা করে তুলেছে।
৪. পাওয়ার স্ট্রাকচারের হায়ারার্কি দেখানো
চতুর্থ পদ্ধতিটা জিনিওলজিকাল ও ফুকোডিয়ান ঐতিহ্যের কাছাকাছি। কোনো জ্ঞানকাঠামোর ভেতরে কোনটা সেন্টার আর কোনটা পেরিফেরি হিসেবে বসানো হয়েছে সেটা দেখানো, এবং এই বিন্যাসটা কীভাবে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ বা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে (normalization), সেই প্রক্রিয়াটা উন্মোচন করা। ইরফান আহমদ যেভাবে দেখিয়েছেন, ফুকোর কাছে ইউরোপই ক্রিটিকের একমাত্র জন্মস্থান আর অপশ্চিমা সমাজের ক্রিটিক করবার সক্ষমতা যেভাবে নির্দ্বিধায় বাদ পড়ে যায়, সেটা এই পদ্ধতির একটা প্রয়োগ। একইভাবে ভারতীয় নৃবিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসেও তিনি দেখান কীভাবে একটা জাতীয়তাবাদী কেন্দ্র ইসলামকে ক্রমাগত পরিধিতে ঠেলে দিয়েছে, আর এই ঠেলে দেওয়াটাই এক পর্যায়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গিয়ে ‘স্বাভাবিক’ শৃঙ্খলা হয়ে উঠেছে। একাডেমিক লেখায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে দুটো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে হয়: কোন অবস্থানটাকে টেক্সট অলিখিতভাবে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সার্বজনীন’ ধরে নিচ্ছে, আর কোন অবস্থানটাকে ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘বিশেষ’ বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
এই চার পদ্ধতি—উলটো দাবি হাজির করা, স্ববিরোধ উন্মোচন করা, এসেনশালাইজেশন চিহ্নিত করা, আর কেন্দ্র-পরিধির হায়ারার্কি দেখানো—একে অন্যের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। একটা ভালো একাডেমিক ক্রিটিকে সাধারণত এই চারটার এক বা একাধিকটা একসাথে কাজ করে।
ক্রিটিকের আরও বিচিত্র একাডেমিক ধরন নিয়ে আমরা বিভিন্ন পর্বে আলোচনা করবো, যেমন অনেক লেখায় সংকোচনবাদ বা রিডাকশনিজম দেখানো হয়, যেখানে জটিল কোনো বিষয়কে একটামাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আবার কোনো লেখায় মিরর-ইমেজ দেখানো যায়, অর্থাৎ যাকে ক্রিটিক করা হচ্ছে তারই উলটা ভার্সন হয়ে ওঠা, জিনিওলোজিকাল বা কুলুজি ক্রিটিক, বিনির্মাণবাদী ইত্যাদি।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

(প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে)
একাডেমিক লেখালেখির প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা কাজের উপর, যাকে বলে ‘ক্রিটিক করা’। কিন্তু ‘ক্রিটিক’ (Critique) শব্দটা একরৈখিক কোনো অর্থ বহন করে না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন চিন্তা-ঐতিহ্যে ক্রিটিকের ধারণা বিভিন্নভাবে পরিগঠিত হয়েছে। ক্রিটিকের ধারণাগত ইতিহাসটা না জানলে একাডেমিক লেখায় ‘ক্রিটিক’-এর যেসব রূপ পরিলক্ষিত হয় তা স্পষ্ট হবে না। আজকে এই দ্বিতীয় পর্বে প্রথমে সেই ধারণাগত ইতিহাসটা আমরা দেখব, তারপর দেখব এখনকার একাডেমিক লেখায় এই ইতিহাসের বিভিন্ন স্তর কীভাবে বাস্তবে কাজ করে।
সাধারণত ‘ক্রিটিক’ ধারণাটিকে ভালো-মন্দ বা ভুল-ত্রুটি নির্দেশ (fault-finding) অর্থে ব্যবহার করা হয়। ক্রিটিক নামক ধারণার এই অর্থ-সংকোচন নিয়ে রেমন্ড উইলিয়ামস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘Key Words’-এ। থিয়োডর এডোর্নো ক্রিটিক বলতে যেকোনো চিন্তা ও চর্চার ভেতরে যে ‘Constellation of power’ থাকে সেটির উন্মোচনকে বুঝিয়েছেন। হেবারমাস ক্রিটিক বলতে যেকোনো চিন্তার ভিত্তিমূলকে প্রশ্ন করা বুঝিয়েছেন। ক্রিটিকাল এটিচুডকে ফুকো একটা ভার্চু বা গুণ হিসেবে বর্ণনা করতে চান। ফুকোর মতে, ক্রিটিক শুরুই হয় নিরঙ্কুশ আনুগত্যের দাবিকে প্রশ্ন করে এবং প্রশাসনিক সমস্ত বাধ্যবাধকতাকে একটা যুক্তিমূলক ও চিন্তাশীল মূল্যায়নের অধীন করার মধ্য দিয়ে। ক্রিটিক ফুকোর কাছে ‘Desubjugation of the subject’ বা কর্তার বন্ধনমুক্তি।
ক্রিটিসিজম শব্দের উৎপত্তি গ্রীক ক্রিয়াপদ ‘krino’ থেকে, যার অর্থ আলাদা করা, যাচাই করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ইত্যাদি। প্রথম শব্দটি ব্যবহৃত হয় আইনি পরিসরে অভিযুক্ত করা ও রায় দেওয়া দুটো অর্থই বোঝাতে। রাইনহার্ট কোজেলেক তাঁর ‘Critique and Crisis’ গ্রন্থ অনুসরণে বলা যায়, ‘ক্রিটিক’ ব্যাপারটার আদি অর্থের ভেতরে সার্বজনীন কোনো সত্য জয়ের দাবি ছিল না, বরঞ্চ বিশেষ কোনো সংকটকে যথার্থভাবে খোলাসা করা অর্থে এবং একটা বিশেষ জীবনপ্রণালির ভেতরে বিশেষ বিশেষ গুণের শোধন বোঝাতে এই ‘ক্রিটিক’ পদ ব্যবহৃত হতো।
‘ক্রিটিক’ বা বিচার-এর ধারণা ইতিহাসের সব পর্বে এক ছিল না। পশ্চিমে ক্রিটিক বলতে বর্তমানে যে ক্রিটিকাল এটিচুডকে বোঝায়, তার সাথে এনলাইটেনমেন্ট পিরিয়ডের যোগ আছে। আলোকিত হওয়া মানেই একটা ক্রিটিকাল এটিচুড অবলম্বন করা। তালাল আসাদ মিশেল ফুকোর ‘ক্রিটিক কী’ প্রবন্ধের সূত্র ধরে বলেন, ক্রিটিক কি পশ্চিমেরই একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাকি অন্যান্য চিন্তা-ঐতিহ্যেও ক্রিটিক ব্যাপারটা আছে, সে ব্যাপারে ফুকোর প্রবন্ধটি সুস্পষ্ট দিশা দেয় না। ফুকো নিজে চিন্তার ক্ষেত্রে জিনিওলোজিস্ট হলেও এই প্রবন্ধে জিনিয়োলজিকাল পদ্ধতিতে ‘ক্রিটিক’ ধারণার বিবর্তন আলোচনা করেননি বলে তালাল আসাদ যুক্তি দেন। ইরফান আহমদ অবশ্য প্রবন্ধটি পাঠ করেছেন এইভাবে যে, ফুকোর কাছে ‘ক্রিটিক’ ব্যাপারটা মূলত আধুনিক পশ্চিমেরই বৈশিষ্ট্য। অপশ্চিমা সমাজ যে ক্রিটিক করতে সক্ষম, এই প্রসঙ্গ ঘুণাক্ষরেও তোলেননি ফুকো। ফুকোর মতে, প্রোটেস্ট্যান্ট মুভমেন্ট হচ্ছে প্রথম ক্রিটিকাল মুভমেন্ট।
খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ক্রিটিক বলতে বোঝানো হতো ফ্রি স্পিচকে, যাকে বলে পারেশিয়া। পলিটির পরিসরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সত্যকে সরাসরি, অলংকারবিহীনভাবে প্রকাশ করাকেই পারেশিয়া বলা হতো।
লেইট মেডিয়েভল পিরিয়ডে কীভাবে জীবনযাপন করতে হয়, এটা শেখানোও ক্রিটিকের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মূলত ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন ছিল এই সময়ের ক্রিটিক।
সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত সন্দেহবাদী পিয়ের বেইলি মনে করেন, ক্রিটিক হচ্ছে যুক্তিকে ওয়াহি থেকে আলাদা করার কাজ। এই সময় হিস্টোরিকাল ক্রিটিসিজম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রিক ক্লাসিকাল টেক্সট ও স্ক্রিপচারগুলো নিয়ে ব্যস্ততা এই সময়ে বেড়ে যায় বেশ। বেইলি সমস্ত তত্ত্বের ব্যাখ্যায় যুক্তি দাবি করেন এবং মনে করেন যে, যা কিছু যুক্তিশীল বলে ইতোমধ্যেই গৃহীত তাকে ক্রিটিকাল রিজনিং-এর মাধ্যমে নস্যাত করা যেতে পারে।
কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে নত হওয়া ছাড়াই সবাই সমতার ভিত্তিতে একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারে। বেইলি একটা ‘Republic of Letters’-এ আস্থা রাখতেন। এই সতেরো শতকীয় জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতিতে বিচার ও সাক্ষ্যের ভিত্তি ছিল সামাজিক আস্থা আর ভদ্রোচিত কোনো কর্তৃপক্ষ।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকটা কান্টীয় আধিপত্যই প্রধান হয়ে ওঠে। ‘রিপাবলিক অব লেটার্স’ প্রতিস্থাপিত হয় ‘কোর্ট অব রিজন’ দ্বারা। কান্ট প্রচার করেন, রাজনৈতিক ও গির্জার বাঁধা-নিষেধ থেকে স্বাধীনতাই শুধু স্বাধীনতা নয়, প্রকৃতপক্ষে দরকার বিজ্ঞান ও যুক্তির অগ্রগতি। কান্টের পূর্বের এনলাইটেনমেন্ট ফিলোসফারদের কাছে হিউম্যান রিজন ছিল একধরনের সেকুলারাইজড মেটাফিজিক্স, যেটা তাঁরা রাষ্ট্র ও গির্জার ভানভনিতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতো। কান্টের কাছে ক্রিটিক হয়ে ওঠে এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া, যেখানে প্রাইভেট ফেইথ ও পাবলিক রিজনের ডোমেইনকে আলাদা ঘোষণা করা হয়। কান্টীয় ফর্মুলা ক্রিটিককে বৈজ্ঞানিক সত্য অনুসন্ধানের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখে এবং নিজেকে আলাদা করে ফেলে রাজনীতি, এমনকি বিশ্বাস থেকেও। কান্টের ক্রিটিক-ভাবনা প্রাত্যহিক জীবনের চেয়ে ব্যাপৃত থাকে জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে।
হেগেলীয় দর্শন কান্টের এই বিচ্ছিন্নকরণকে প্রশ্নবোধক করে, কান্টের জ্ঞানতত্ত্বকে সরিয়ে রাখে পাশে। হেগেল বলেন, হাজির থাকা এই জগত দ্বন্দ্বে ভরা। চিন্তা ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব আমাদের সত্তাকে বিকশিত করে, ‘হয়ে ওঠার’ উচ্চতর জগতের দ্বন্দ্বমূলক গাঠনিক উপাদান এরা। মার্ক্স হেগেলের দ্বন্দ্বের ধারণা নিলেও বাস্তব দুনিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রাথমিকতার কথা বলেন। দ্রুত শিল্পায়িত বিশ্বে মার্ক্সের কাছে ক্রিটিক ও বিপ্লবী সহিংসতা আবির্ভুত হয় শ্রেণী সংগ্রামের পরিপূরক হিসেবে। এক ফাঁকে বলে রাখি, ‘ইজ ক্রিটিক সেক্যুলার’ বইয়ের ভূমিকায় ওয়েন্ডি ব্রাউন দেখান, মার্ক্স ক্রিটিসিজম ও ক্রিটিকের মধ্যে পার্থক্য করেন। ফয়েরবাখ যখন ধর্মকে illusionary consciousness বলেন, তখন এটা ক্রিটিসিজম, কিন্তু যখন কনক্রিট ম্যাটেরিয়াল কন্ডিশন, অর্থাৎ যে মূর্ত-বস্তুগত শর্তের প্রতিষেধক হিসেবে ধর্ম হাজির হয় তাঁর পর্যালোচনা, মার্ক্সের কাছে, ক্রিটিক। তবে, আসাদ, হেবারমাস, সাইদ ও অন্যান্যরা আলোচনার সুবিধার্থে ক্রিটিসিজম ও ক্রিটিককে অভিন্ন অর্থ ধরেই আগান, ক্রিটিসিজম পদটির সাহিত্য সম্পৃক্ততা মনে রেখেও।
উল্লেখ্য, ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর ‘রিস্টেটিং অরিয়েন্টালিজমঃ আ ক্রিটিক অব মডার্ন নলেজ’ বইতে ক্রিটিক ও ক্রিটিসিজমের মধ্যে চমৎকার করে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্রিটিসিজমের কাজ কোনো বিশেষ ডিসিপ্লিন নিয়ে; আর, ক্রিটিক মূলত কাজ করে সিস্টেম নিয়ে। যেকোনো সিস্টেমের যে ভিত্তিমূলক অনুমান বা ফাউন্ডেশনাল এসাম্পসান সেটিকে ক্রিটিক প্রশ্ন করে, সেটা নিয়ে ‘খেলে’; অন্যদিকে, ক্রিটিসিজম কোনো ডিসিপ্লিনের ভেতর থেকে ডিসিপ্লিনের প্রোটোকল মেনে ডিসিপ্লিনকে শক্তিশালী করে ও ডিসিপ্লিনটির বিভিন্ন অনুষঙ্গের ভাষ্য বা বিশ্লেষণ হাজির করে। ক্রিটিসিজম যেকোনো প্রফেশনালের রুটিন কাজ।
অপরপক্ষে, ক্রিটিক একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্ম, যা পুরো সিস্টেমটার ভেতরকার অনুমানকে সমস্যায়িত করে,প্যাটার্ন উদ্ঘাটন করে ও কোনো কিছুর হয়ে উঠাকে ‘আবিস্কার’ করে। ক্রিটিসিজম একটু রক্ষণাত্মক ব্যাপার, আর ক্রিটিক, বলা যেতে পারে বেশ আক্রমণাত্মক। ক্রিটিক সাধারণত সংকটকালে ভালো কাজে দেয়, অন্যদিকে ক্রিটিসিজম স্বাভাবিক সময়ে কাজ করতেই স্বচ্ছন্দ। ক্রিটিসিজম বিদ্যমান নলেজ সিস্টেমকে মান্য করে আগায়; আর, ক্রিটিক পুরো কাঠামো ও ভিত্তিকে উদ্ঘাটন করে বা ধ্বসায়, বা প্রশ্ন করে।
বিংশ শতাব্দীতে নব্য-কান্টীয়রা হেগেলবাদ ও মার্ক্সবাদের বিরোধিতার নিয়তে আবার ক্রিটিকের ধারণাকে জ্ঞানতত্ত্বে সীমায়িত করে ফেলেন। ক্রিটিকের নীতি হয়ে ওঠে ইউনিভারসাল রিজন। বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয় এমন ব্যাপার হিসেবে যাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করা যায়। যেহেতু, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিশ্বাসভিত্তিক হওয়ায় এগুলোকে ক্রিটিক করা যায়না, তাই এগুলো সায়েন্টিফিক ফ্যাক্টের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে না। কার্ল পপার সহ অন্যান্য মিথ্যাপ্রতিপাদনবাদীরা (ফলসিফিকেশনিস্টরা) জ্ঞানতত্ত্বকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করে ফেলে। তাঁরা বলতে থাকেন, জগৎ সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সীমিত, তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজকে সে অনুযায়ী রূপান্তর করাই যুক্তিসঙ্গত।
এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন, ক্রিটিক হচ্ছে একটা সেক্যুলার এক্সারসাইজ। তাঁর দ্য ‘The World, text and the critic’ বইয়ে তিনি সেক্যুলার ক্রিটিসিজম আর রিলিজিয়াস ক্রিটিসিজমকে আলাদা করেছেন। ক্রিটিক মাত্রই তাঁর কাছে সেক্যুলার, নন-সেক্যুলার সমাজেও যে যুক্তির ব্যবহার আছে সেদিকে তিনি নজর দেননি। হিউম্যানিজমের খুঁত সম্পর্কে সাইদ সজাগ সত্ত্বেও হিউম্যানিজমের সংকট দূর করতে, তাঁর মতে, দরকার আরো বেশি হিউম্যানিজম। যেমন গণতন্ত্রের সংকট দূরীকরণে দরকার আরো বেশি গণতন্ত্র।
সাইদের সেক্যুলার ক্রিটিসিজমের ধারণা পর্যালোচনা করেছেন তালাল আসাদ। সাইদের আইডিয়াসমূহের শক্তি ও সংকট নিয়ে বিশদ আলোচনা পাওয়া যাবে ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘Restating orientalism: A Critique of modern knowledge’ এবং হামিদ দাভাশি'র ‘Post-Orientalism: Knowledge and Power in a time of terror’ বইদ্বয়ে। ‘Is Critique secular: Blasphemy, Injury and free speech’ সংকলনে তালালের প্রবন্ধটিতে অথবা The Immanent frame পত্রিকায় ‘Historical notes on the idea of secular criticism’ পত্রিকায় তালাল আসাদ এডওয়ার্ড সাইদের সেক্যুলার ক্রিটিসিজমের ধারণা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়েছেন, এবং ক্রিটিক ধারণার বিবর্তনও আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধটির শেষাংশে এসে তালাল দেখান, সেক্যুলার ক্রিটিক একটা মডার্ন থিয়োলজি। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানিটি অলরেডি র্যাশনাল, সেইটার সাপেক্ষেই অন্যান্য ধর্মকে পশ্চিম বিচার করেছে। র্যাশনালিটির সঙ্গে বোঝাপড়া করে খ্রিস্টানিটিকে আগাতে হয়েছে। বাইবেলীয় বিশ্বাস গ্রীক দার্শনিক অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে খ্রীস্টানিটির অবয়ব গঠন করেছে, তা শুধু ইউরোপের জন্যে না, বিশ্ব ইতিহাসেই বিরল বলে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট মনে করেন, তালাল জানান। তাছাড়াও, সেক্যুলার ক্রিটিসিজম, যার সঙ্গে যুক্তি ও স্বাধীনতার ধারণা যুক্ত বলে প্রচার করা হয়, তা হয়ে উঠেছে আধুনিক মানুষের সত্যান্বেষণের ক্রমাগত প্রচেষ্টার স্মারক, এবং অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব! এই অর্থেও সেক্যুলার ক্রিটিককে তালাল আসাদ মডার্ন থিয়োলজি বলেছেন।
ফুকোর ‘What Is Critique?’ প্রবন্ধের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছেন জুডিথ বাটলার। জুডিথ বাটলার বলেন, যা বা যেটিকে ক্রিটিক করা হচ্ছে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে বিমূর্ত ও জেনারালাইজড প্র্যাকটিস হিসেবে ক্রিটিককে বিবেচনা করলে ক্রিটিক তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। ক্রিটিক সবসময়ই ডিল করে বিশেষ কোনো চর্চা, প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠিত চিন্তা বা ব্যবস্থা কিংবা বিশেষ কোনো জ্ঞানখণ্ডকে। জুডিথ বাটলার ফুকোর ক্রিটিকের ধারণার কেন্দ্রীয় প্রণোদনাকে চিহ্নিত করেন ‘How Not to Be Governed?’ এই প্রশ্নের মধ্যে। ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে এই প্রশ্নটিই আরো সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করে এই প্রশ্নে যে, ‘What Are the Limits of the Right to Govern?’ ফুকোর সূত্র ধরে জুডিথ বাটলার বলেন, ক্রিটিকের দুটো কাজ। এক. কীভাবে জ্ঞান ও ক্ষমতা মিলে জগতের শৃঙ্খলা গঠন করে এবং সেটি নিজের শর্তেই কী করে গ্রহণীয় হয়ে ওঠে সেটি দেখানো। দুই. সেই ব্রেকিং পয়েন্টও নির্দেশ করা যেটি এই ব্যবস্থার অভ্যুদয় ঘটায় এবং বিলয়ও ঘটাতে পারে।
ক্রিটিকের কোনো একক সংজ্ঞা সম্ভব নয়। এটি একটি ফ্যামিলি কনসেপ্ট। রিলিজিয়াস ক্রিটিক আর সেক্যুলার ক্রিটিক এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে ক্রিটিকের ইতিহাস প্রবাহিত নয়। ক্রিটিক নিজেকে হাজির করতে পারে নানা ফর্মে, নানা সুরত ও হালে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক লেখালেখির অন্যতম কাজ ক্রিটিক করা। এই ক্রিটিকও করা হয় একাডেমিক ও প্রফেশনাল নানাবিধ শর্তাবলি মেনে নিয়েই। ক্রিটিকের একক কোনো অধিক্ষেত্র নেই।
ক্রিটিক নিয়ে আলোচনায় কান্ট অত্যাবশ্যকীয় দার্শনিক। কান্ট ক্রিটিক বলতে বুদ্ধির সীমা-সরহদ্দ, সম্ভাবনা, বৈধতা, শর্ত ও আত্মবিচার বোঝান। কোনো কিছুকে যুক্তি ও বুদ্ধির নির্ণয় হিসেবে হাজির করা। কান্ট তাঁর ‘ক্রিটিক অব পিউর রিজন’-এ অভিজ্ঞতা ছাড়াই (a priori) বা অভিজ্ঞতার পূর্বেই কী জানা সম্ভব, মেটাফিজিক্স আদৌ সম্ভব কিনা, এটা দেখান। এখানে ক্রিটিকের কাজ একধরনের সীমারেখা টানা। এই বইটি প্রথম ক্রিটিক নামে পরিচিত। কান্টের প্রথম ক্রিটিক যদি আলোচনা করে ‘আমরা কী জানতে পারি?’, তাহলে তাঁর দ্বিতীয় ক্রিটিক, অর্থাৎ ‘ক্রিটিক অব পিউর রিজন’ জিজ্ঞেস করে ‘আমাদের কী করা উচিত?’ এই প্রশ্নের উত্তর, অর্থাৎ আমাদের নৈতিক কর্মের নীতি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ থেকে আসবে না, বরং যুক্তির অটোনমি থেকেই আসবে। এই বইয়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত ক্যাটেগরিকাল ইম্পারেটিভ ধারণাটি, অর্থাৎ শর্তহীন আদেশ ও নৈতিকতার সার্বজনীন ‘যৌক্তিক’ নিয়ম এনেছেন।
কোন জিনিসকে কেন আমরা সুন্দর বলি অথচ এর কোনো উপযোগিতা নেই, আমাদের কোনো স্বার্থও নেই, এবং এই নান্দনিক বোধের সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক কী, প্রকৃতিজগতকে কেন আমাদের উদ্দেশ্যময় মনে হয় এইসব বিচারই হচ্ছে কান্টের তৃতীয় ক্রিটিক, অর্থাৎ ‘ক্রিটিক অব জাজমেন্ট’-বইয়ের সারকথা। কান্টের এই তিন ক্রিটিক নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করতে হবে। যাইহোক, কান্ট আদালতের রূপকে তাঁর ক্রিটিক ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করেছেন। বুদ্ধি বা বিচারশক্তি অন্য কোনো কিছুকে বিচার করবার আগে যেন নিজের যোগ্যতাকে যাচাই ও বিচার করে নিচ্ছে। কান্টের ‘ক্রিটিক’-কে ট্রান্সেন্ডেন্টাল ক্রিটিক বলা হয়। এটির কাজ হচ্ছে, কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান অর্জনের পেছনে মনের ভেতরে আগে থেকেই কী শর্ত কাজ করছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা।
কান্টের ট্রান্সেন্ডেন্টাল ক্রিটিক মনের ভেতরকার অপরিবর্তনীয় শর্ত ও উপাদান খোঁজে, আর হেগেলের ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক’ খোঁজে কোনো জ্ঞান বা ব্যবস্থার ভেতরকার দ্বন্দ্ব, স্ববিরোধ ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তাই হেগেলের এই ইমানেন্ট ক্রিটিক বা অভ্যন্তরীণ বিচার বা পর্যালোচনার ধারণাটিও বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এটির অর্থ হচ্ছে, কোনো কিছুকে তার নিজের শর্তেই বিবেচনা করা, কোনো বহিস্থ মানদণ্ড ব্যতিরেকেই। একটা টেক্সট বা কোনো আইডিয়া যে দাবি, প্রতিশ্রুতি ও সঙ্গতি প্রস্তাব করে, তার ভিত্তিতেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করাকে বলা হবে ইমানেন্ট ক্রিটিক। হেগেল কান্টের যে সমালোচনা করেছেন, কেউ কেউ তাকে ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক অব কান্ট’ বলেন।
হেগেলের ‘Aufhebung’ ধারণাটিও বোঝা জরুরি। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ সাব্লেশন। তিনটি অর্থ এটির সঙ্গে যুক্ত—বাতিল করা, সংরক্ষণ করা ও উত্তরণ ঘটানো। আউফহেবং অনুযায়ী বললে একটা ক্রিটিক তিনটি কাজ করে: পূর্ববর্তী কারও বা কোনো অবস্থানকে নাকচ বা অতিক্রম করে, তার ভেতরকার প্রাসঙ্গিক অন্তর্দৃষ্টি ধরে রাখে বা সংরক্ষণ করে এবং একটি অধিকতর সমৃদ্ধ তাত্ত্বিক অবস্থানে উত্তোরিত হয়। কার্ল মার্কস হেগেলের এই ‘ইমানেন্ট ক্রিটিক’ ও ‘আউফহেবং’ (Aufhebung)-এর ধারণাকে বস্তুগত জগতে প্রয়োগ করেছিলেন। উল্লেখ্য, হেগেলের নামে ‘থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিন্থেসিস’ বলে যে সরলীকৃত ধারণা প্রচার করা হয়, তা হেগেলকে কিছুটা বুঝতে সহায়তা করলেও হেগেল এইভাবে একরৈখিক বর্ণনা দেননি। এই ত্রয়ী মূলত গটলিব ফিখটে ব্যবহার করেছিলেন এবং হাইন্রিশ মরিৎস-এর মাধ্যমে এই ত্রি-বিভাগ জনপ্রিয় হয়। তিনি একে বাতিল করেননি, তবে তাঁর ‘দ্য ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট’ বইয়ে একে ‘লাইফলেস স্কিমা’, ‘মনোটোনাস ফরমালিজম’ বলে অভিহিত করেছেন। এর দ্বারা তিনি শেলিং ও তাঁর অনুসারীদের ইঙ্গিত করেন।
তাই তো মার্কসকে হেগেলের উত্তরসূরি বলা হয়। ইমানেন্ট ক্রিটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কার্ল মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ কীভাবে নিজেই নিজের ধ্বংসের বীজ বহন করে এবং ‘আউফহেবং’ ধারণা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদকে যেমন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাতিল করলেও পুঁজিবাদের যে ভালো দিকগুলো, সেগুলো বিলুপ্ত হবে না, বরং সংরক্ষিত ও রূপান্তরিত হয়ে উচ্চতর ও শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপরে আমরা তত্ত্বীয়ভাবে ক্রিটিকের নানা অর্থ-পরম্পরা আলোচনা ও কিছুটা ঠিকুজি অনুসন্ধান করলাম। এইখানে আমরা ক্রিটিক করবার চারটি পদ্ধতি বা বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
এক। উল্টা দাবি হাজির করা
ক্রিটিক বা ক্রিটিকাল থিংকিং-এর একটা পদ্ধতি হলো, কোনো একটি আইডিয়ার উলটো আইডিয়া হাজির করা, বা যা দাবি করা হচ্ছে, সেটির উলটোটা দাবি করা। প্রথম দাবিটা কোন স্ট্যান্ডপয়েন্ট বা অনুমান (assumption) বা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদগত সেটিকে বুঝে নেওয়া ও প্রশ্ন করা। দরকার হলে, দেখবার নতুন প্রিজম বা মাপকাঠি উপস্থিত করা। তারপর, প্রথম দাবিটা কী কী অগ্রাহ্য করেছে সেটি নজরে আনা। আর অন্য কী কী দিয়ে বা কীভাবে দেখলে দেখাটা পূর্ণ হয় সেটিকেও তুলে ধরা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ক্রিটিক করা ছাড়া, ক্রিটিকালিটি বা ক্রিটিকাল এটিচুড ছাড়া জ্ঞানের কোনো বিকাশ অসম্ভব!
ক্রিটিক কী করে করতে হয় তার নজির বিবেক চিবরের (Vivek Chibber) ‘Edward Said’s Orientalism and its afterlives’ প্রবন্ধসূত্রে এডওয়ার্ড সাইদের দাবির ক্রিটিক থেকে বুঝে নিতে পারি। যেমন, এডওয়ার্ড সাইদ দাবি করলেন ‘Colonialism is justified in advance by orientalism’। অর্থাৎ, প্রাচ্যবাদী জ্ঞান উপনিবেশবাদকে আগেভাগেই ন্যায্য প্রমাণ করে রাখে। তারমানে, প্রাচ্যবাদী বয়ান ও উপনিবেশবাদ একটা কার্যকারণ সম্পর্কে আবদ্ধ, যেখানে উপনিবেশবাদকে বিবেচনা করা হলো ফলাফল হিসেবে। তো, বিবেক চিবর কারণের যে তীর (Causal arrow), সেটিকে উল্টে দিলেন; বললেন, উপনিবেশবাদ ফলাফল না, বরঞ্চ অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সের কারণ। বললেন, অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সকেই জন্ম দিয়েছে কলোনিয়াল প্রজেক্ট বা ঔপনিবেশিক প্রকল্প, উল্টোটা নয়। আবার, যেখানে সাইদ তাঁর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন কালচারাল এনালিসিসের পরিপ্রেক্ষিতে, চিবর নজর দিতে বললেন উপনিবেশবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। বিবেক দাবি করলেন, উপনিবেশবাদের গোড়া ইউরোপীয় সংস্কৃতির ভেতরে নাই, আছে তার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে। অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্স না থাকলেও আধুনিক উপনিবেশবাদ অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্স তৈরি করে নিত নিজের বস্তুগত স্বার্থে। তারপর তিনি উল্লেখ করলেন, সাইদ তাঁর ব্যাখ্যায় কী কী মিস করেছেন। সাইদ মিস করেছেন পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ, শ্রেণীস্বার্থ প্রসঙ্গ, রাষ্ট্রের ভূমিকা ইত্যাদি বস্তুবাদী বর্গসমূহ বা materialist categories। কলোনিয়ালিজম নিয়ে কোনো আলোচনায় পুঁজিবাদ আসবে না, এটা হতেই পারে না। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও তার নৃশংসতার উদ্ভব হয়েছে তাদের বস্তুগত স্বার্থ এবং বিশেষ সামাজিক পরিগঠন থেকে।
তাহলে, চিবর ক্রিটিকটা কীভাবে করলেন? সাইদের দাবিকে প্রথমে তিনি প্রবলেমেটাইজ (Problematize) করলেন, পদ্ধতিগত প্রশ্ন তুললেন, সাইদ কী কী জিনিস মিস করে গেছেন সেটি উল্লেখপূর্বক কীভাবে উপনিবেশবাদকে ব্যাখ্যা করতে হবে সেটিরও একটা কাঠামো উল্লেখ করলেন। উপনিবেশবাদের সাথে প্রাচ্যবাদী জ্ঞানতত্ত্বের সম্পর্ককে তিনি বাতিল করলেন না, কিন্তু সম্পর্কসূত্রটিকে উলটে দিলেন এবং নতুন একটি কাঠামোয়, যার নাম পলিটিকাল ইকোনমি, অধিক কার্যকরীভাবে উপনিবেশবাদের গতিধারা বোঝা যাবে বলে দাবি করলেন। বিবেক চিবর আর্গুমেন্ট দিলেন, সাইদ যে ‘পশ্চিম’কে ক্রিটিক করলেন সেই পশ্চিম আসলে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের পশ্চিম। এই পশ্চিমই একমাত্র পশ্চিম নয়, আরও পশ্চিম আছে।
এটিকে সাইদের দাবির মার্ক্সবাদী ক্রিটিক বা বিচার বলতে পারব আমরা। তো, বিবেককেও কিন্তু ক্রিটিক করা যাবে! এখানে খেয়াল করবার বিষয়, যেমনটি আমরা হেগেলের আউফহেবং-এর ধারণায় বলেছি যে, এখানে তিনি সাইদের অবদানকে ক্যান্সেল করছেন না, বরং সাইদের অন্তর্দৃষ্টি ও বক্তব্যকে “প্রিজার্ভ” বা সংরক্ষণ করে আরেকটা মাত্রা যোগ করে তত্ত্বটিকে “এলিভেইট” বা উত্তরণ ঘটাচ্ছেন, যে তিনটি বিষয় হেগেলের এই আউফহেবং বা সাব্লেশন ধারণার ভেতর ক্রিয়াশীল।
২। স্ববিরোধ উন্মোচন
বিভিন্ন জ্ঞানগত দাবিকে ক্রিটিক করা ছাড়াও বিভিন্ন ধারণাকেও ক্রিটিকাল এক্সামিনেশন বা বিচারমূলক বিশ্লেষণের আওতায় আনা যায়। এর একটা পদ্ধতি হলো, প্রশ্ন করা এবং স্ববিরোধ উন্মোচন করা। ধরা যাক, স্বাধীনতার ধারণাটি। লিবারেল তত্ত্বের এটি কেন্দ্রীয় ধারণা ও বহুল প্রশংসনীয় রাজনৈতিক বর্গ।
স্বাধীনতার ধারণাকে ক্রিটিক করতে হলে দুটো কাজ করা যায়। প্রথমত: প্রশ্ন করা যে, কার স্বাধীনতা? দ্বিতীয়ত: স্বাধীনতার ধারণার ভেতরে যে পরাধীনতার স্বভাব আছে বা পরাধীন করার বাসনা আছে, সেটা উন্মোচন করা। যেমন, দাস মালিকদের স্বাধীনতা, পুঁজিবাদের স্বাধীনতা, দখলদার উপনিবেশকদের স্বাধীনতা ইত্যাদি।
এলিজাবেথ আঙ্কার তাঁর Ugly Freedoms বইয়ে ঠিক এই পদ্ধতিতেই আমেরিকান ‘ফ্রিডম’-ধারণাকে ক্রিটিক করেন। বইটি মূলত ‘স্বাধীনতা’র লিবারেল ধারণার ক্রিটিক বা পশ্চিমা লিবারেলিজমের বিচার আকারেও বইটি পড়া যায়। এলিজাবেথ আঙ্কার প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ওয়েন্ডি ব্রাউনের অধীনে পিএইচডি গবেষণা করেছেন।
আঙ্কার বলেন, ‘Torture is a practice of American freedom.’ বইটিতে তিনি দেখান, দাসপ্রথা-পরবর্তী মুক্তির নামে প্রতারণা, নয়া-উদারনৈতিক শোষণ, আর জলবায়ু-ধ্বংস—প্রতিটাই ‘ফ্রিডম’-এর নামে ঘটেছে, ব্যতিক্রম হিসেবে নয়। উপনিবেশকদের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটেছে। নতুন ভূখণ্ড দখল করার এবং আদিবাসীদের ভূমি-সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার স্বাধীনতাকেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার অংশ বলে বুঝেছে, রাজতন্ত্র থেকে মুক্তির প্রকল্প হিসেবে।
দাসপ্রথাকে দাসমালিকেরা স্বাধীনতার বিপরীত ব্যাপার বলে ব্যাখ্যা করতেন না, বরঞ্চ দাস রাখাকে তাদের স্বাধীনতার চর্চারই অংশ মনে করতেন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও দাসমালিক জন সি. ক্যালহুন যুক্তি দেন, ‘Slavery was necessary for freedom’। এই ফ্রিডম কার ফ্রিডম: মনিবের স্বাধীনতা, freedom of the master।
ফ্রিডমের একটি অ্যাম্বিভ্যালেন্ট লিগাসি আছে। আঙ্কার এই দ্বিমুখিতা স্বীকার ও উন্মোচন করেন—একদিকে যেমন ফ্রিডমের নামে আধিপত্য চলে, অন্যদিকে তেমনি তিনি এই ধারণার ভেতরেই একটা দ্বিতীয়, উলটো সম্ভাবনাও খুঁজে পান: যেসব চর্চাকে তুচ্ছ, নিষ্ফল বা লজ্জাজনক মনে করা হয়, সেখানেও তিনি মুক্তির সম্ভাবনা দেখেন। স্বাধীনতার যে চর্চাগুলো আমরা উদ্যাপন করি, যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণ, শাসনে অংশীদারিত্ব, আধিপত্যহীনতা, এগুলো স্বাধীনতা নামক ধারণার জটিলতা ও সম্ভাবনা বুঝতে সহায়ক।
আঙ্কারের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দাবি হলো, ফ্রিডমকে ডমিনেশন হিসেবেও চর্চা করা যায়। অর্থাৎ তিনি দেখাতে চান, স্বাধীনতাকে আধিপত্যের বিপরীত হিসেবে দেখালে ‘স্বাধীনতা’র নিজের ভেতরে থাকা ‘আধিপত্যের’ ধারণা অলক্ষ্যে পড়ে রয়। খেয়াল করার বিষয়, স্বাধীনতার ভেতরে মুক্তির প্রকল্পকে তিনি অস্বীকার করছেন না, কিন্তু স্বাধীনতার ধারণা কীভাবে আমেরিকান ইতিহাসে আধিপত্য ও নিষ্পেষণকে জায়েজ করেছে, তার দিকে নজর দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।
স্বাধীনতার এই পরাধীন-স্বভাব উন্মোচন করাকে আঙ্কারের ক্রিটিকের একটা পদ্ধতি ধরতে পারি। অর্থাৎ কোনো ধারণাকে বাইরে থেকে আক্রমণ না করে, তার নিজের ভেতরেই যে স্ববিরোধ লুকানো আছে, সেটা উন্মোচন করা।
৩. এসেনশালাইজেশন চিহ্নিত করা
ক্রিটিকের আরেকটা সাধারণ পদ্ধতি হলো, কোনো টেক্সট বা তত্ত্ব কোথায় ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল একটা বিষয়কে স্থির, সমরূপ ‘সার’ (essence) হিসেবে হাজির করছে, সেটা চিহ্নিত করা।
সিরীয় মার্কসবাদী দার্শনিক সাদিক জালাল আল-আজম সাঈদের ‘Orientalism’-কে এই এসেনশিয়ালিজমের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন তাঁর ‘Orientalism and Orientalism in Reverse’ রচনায়। তিনি এইভাবে ক্রিটিক করেন যে, ‘প্রাচ্য’কে অরিয়েন্টালিস্টরা একরকম অখণ্ড, বদলহীন বস্তু হিসেবে হাজির করেন, সাইদ সেই ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমকেও একইভাবে একমুখী, অনড়, স্থিরসত্তা হিসেবে দেখান, পশ্চিমের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও জটিলতাকে উপেক্ষা করে। যাকে সমালোচনা করা হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, বিবেক চিবরের ক্রিটিকও একই সমস্যায় পড়তে পারে উল্টো দিক থেকে—যখন তিনি ‘পশ্চিম’কে একরকম অভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে ধরে নেন, ভেতরের বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে। এসেনশিয়ালাইজেশন-ক্রিটিক তাই শুধু মূল টেক্সটে না, ক্রিটিকের ভেতরেও প্রয়োগ করা যায়—এই বোধ একে একাডেমিক লেখায় বেশ ঘন ঘন ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটা করে তুলেছে।
৪. পাওয়ার স্ট্রাকচারের হায়ারার্কি দেখানো
চতুর্থ পদ্ধতিটা জিনিওলজিকাল ও ফুকোডিয়ান ঐতিহ্যের কাছাকাছি। কোনো জ্ঞানকাঠামোর ভেতরে কোনটা সেন্টার আর কোনটা পেরিফেরি হিসেবে বসানো হয়েছে সেটা দেখানো, এবং এই বিন্যাসটা কীভাবে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ বা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে (normalization), সেই প্রক্রিয়াটা উন্মোচন করা। ইরফান আহমদ যেভাবে দেখিয়েছেন, ফুকোর কাছে ইউরোপই ক্রিটিকের একমাত্র জন্মস্থান আর অপশ্চিমা সমাজের ক্রিটিক করবার সক্ষমতা যেভাবে নির্দ্বিধায় বাদ পড়ে যায়, সেটা এই পদ্ধতির একটা প্রয়োগ। একইভাবে ভারতীয় নৃবিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসেও তিনি দেখান কীভাবে একটা জাতীয়তাবাদী কেন্দ্র ইসলামকে ক্রমাগত পরিধিতে ঠেলে দিয়েছে, আর এই ঠেলে দেওয়াটাই এক পর্যায়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গিয়ে ‘স্বাভাবিক’ শৃঙ্খলা হয়ে উঠেছে। একাডেমিক লেখায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে দুটো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে হয়: কোন অবস্থানটাকে টেক্সট অলিখিতভাবে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সার্বজনীন’ ধরে নিচ্ছে, আর কোন অবস্থানটাকে ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘বিশেষ’ বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
এই চার পদ্ধতি—উলটো দাবি হাজির করা, স্ববিরোধ উন্মোচন করা, এসেনশালাইজেশন চিহ্নিত করা, আর কেন্দ্র-পরিধির হায়ারার্কি দেখানো—একে অন্যের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। একটা ভালো একাডেমিক ক্রিটিকে সাধারণত এই চারটার এক বা একাধিকটা একসাথে কাজ করে।
ক্রিটিকের আরও বিচিত্র একাডেমিক ধরন নিয়ে আমরা বিভিন্ন পর্বে আলোচনা করবো, যেমন অনেক লেখায় সংকোচনবাদ বা রিডাকশনিজম দেখানো হয়, যেখানে জটিল কোনো বিষয়কে একটামাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আবার কোনো লেখায় মিরর-ইমেজ দেখানো যায়, অর্থাৎ যাকে ক্রিটিক করা হচ্ছে তারই উলটা ভার্সন হয়ে ওঠা, জিনিওলোজিকাল বা কুলুজি ক্রিটিক, বিনির্মাণবাদী ইত্যাদি।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক
.png)
-537618-256x144.webp)
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যেটে এমন এক নাম, যাকে শুধু কবি বা নাট্যকার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কঠিন। আজ তাঁর ২৭৭তম জন্মদিন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক। কিন্তু এত পরিচয়ের মধ্যেও গ্যেটের সবচ
২ ঘণ্টা আগে-06f111-256x144.webp)
অবশ্য সেই সব মধ্যবিত্তিয় রুচির শিক্ষিত শিল্পীরা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন না যে কে এই মাতাল রাজ্জাক। প্রায়শই দেখা যায় তাঁর গান আংশিক কিংবা বিকৃত করে গাইছেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও তাঁকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। আর আমাদের একাডেমিগুলো তো আছেই দূরে ঠেলে দেবার জন্য।
২৭ আগস্ট ২০২৬
আজ যে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। আমরা তাঁকে পাঠ করি কবি, সংগীতস্রষ্টা কিংবা সাম্যবাদ ও মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে
২৭ আগস্ট ২০২৬-c94340-256x144.webp)
৭১ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তোলেননি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনেই বদলে দিয়েছিলেন কিছু দৃশ্য। কেন ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কীভাবে অর্থসংকটের মধ্যেও ছবিটি বানিয়েছিলেন, এস
২৬ আগস্ট ২০২৬-06f111-256x144.webp)