জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

পদ্মার পাড়ে ২৩ মরদেহ উদ্ধার, পরিবারের কাছে হস্তান্তর

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজবাড়ী

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৯: ৫১
স্বজনের খোঁজে ফেরিঘাটে ভিড় করছেন স্বজনেরা। স্ট্রিম ছবি

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরি ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি উদ্ধার করা করেছে। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা, রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও মানিকগঞ্জের ডুবুরি দলসহ অন্যান্যরা উদ্ধারকাজ শেষ করেছে। নদীপাড়ে স্বজনদের আহাজারি বাড়ছে। সাড়ে ১২টার দিকে বাসটি উদ্ধার করা হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সকাল সাড়ে ৯টা) ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন—রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লাল মিয়া সড়কের মৃত ইসমাইল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুরের আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগবাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আব্দুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০), গোয়ালন্দ উপজেলার চর বাকরিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২) ও তাঁদের মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), কালুখালী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), বাসের চালক বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম গাড়াকোলা গ্রামের আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১), কালুখালীর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০), রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার নোয়াধা গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মথুয়ারাই গ্রামের মৃত নুর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকার আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার খন্দকার বাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান (৭ মাস), কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার আগমাড়াই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮) এবং রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর এলাকার ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫)।

এদের মধ্যে ২১ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে বাসচালক আরমান খান (৩১) ও দিনাজপুরের পার্বতীপুরের নাছিমার (৪০) মরদেহ রয়েছে। স্বজনরা এলে সেগুলো হস্তান্তর করা হবে।

বুধবার বিকেল ৫টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী শাহজাহান শেখ সম্রাট বলেন, ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ৫-৬ জন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অন্যদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। তবে ঝড় ও বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়।’

প্রত্যক্ষদর্শী, নৌ পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাসটিতে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি নদীতে পড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। স্বজনরা ফেরিঘাট এলাকায় আহাজারি করছেন।

ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। হামজা আসতে দেরি হওয়ায় নিখোঁজদের স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ওপর হামলারও চেষ্টা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। ঘটনাস্থলে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হারুন-অর-রশীদ, জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাসসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত আছেন।

বেঁচে যাওয়া যাত্রী আইন উদ্দিন বলেন, ‘কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে বাসটি ছাড়ে। আমি, আমার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে ঢাকার সাভার যাচ্ছিলাম। আমরা বেঁচে গেলেও মেয়ে বাসের মধ্যে রয়েছে।’

গোয়ালন্দ সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক আওয়াল আনোয়ার বলেন, ‘আমার ছোট বোন আর নেই। তাঁর লাশ গোয়ালন্দ হাসপাতালে। ভাগ্নে ও নাতি বাসের ভেতর নদীতে রয়েছে।’

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. সোহেল রানা বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও মানিকগঞ্জের ডুবুরি দল উদ্ধারকাজ শুরু করে। বাসটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তবে প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়।

গোয়ালন্দ হাসপাতালের আরএমও শরীফুল ইসলাম বলেন, রুপচাঁদ, মর্জিনা ও রেহেনা নামে তিনজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে মর্জিনা বেগম (৫৬) ও রেহেনা আক্তার (৬০) নিহত হয়েছেন।

গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটের বাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৭৩৩৩৩৬৪০৯।

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (এনডিসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বাসটি পানির প্রায় ৯০ ফুট নিচে ছিল। পানির চাপের কারণে ডুবুরিরা সমস্যায় পড়েন। রাত ২টা পর্যন্ত ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাসটিও উদ্ধার করা হয়েছে। ২১ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসে। ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি দুটি মরদেহ স্বজনরা এলে হস্তান্তর করা হবে।

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

বাস ডুবির ঘটনায় কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার। কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক, রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ইউনিটের উপসহকারী পরিচালক এবং গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

সম্পর্কিত