আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর—১
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। প্রতিটি সংগ্রহশালায় ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের ভাষা; রঙ, আলো আর তুলির আঁচড়ে অনুভব করেছেন শিল্পীদের জীবন, সময় ও সৃষ্টির গল্প। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর’। এর প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন প্রতি রোববার বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
তৌহিন হাসান

গম্ভীর চেহারায় ভ্যান গঘ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। তাঁর নীলাভ চোখের মণি দুটো ছিল স্থির এবং ভাবলেশহীন মুখ। গঘের সেই নীল চোখের দিকে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত হচ্ছিলাম বারবার। মনে হচ্ছিল, তিনি আমার ওপর (সকল মানুষের ওপর) বিরক্ত। কিছু একটা বলতে গিয়েও বলছেন না, হয়তো বলতে চাইছেন না।
ক্যানভাসে কখনো ঢেউ খেলানো তুলির আঁচড়, কখনো ঘন ঘন ছোট স্ট্রোক, কখনো নীল রঙের ক্যানভাস, কখনো ধূসর, সবুজ, আবার কখনো জলপাই রঙের ক্যানভাসে শিল্পী নিজের যত আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন, সবখানেই একই অভিব্যক্তি। বিরক্ত নাকি বিষণ্ন, বুঝে উঠতে পারলাম না। জানতাম, শিল্পীর সারাটা জীবন ছিল দুর্বিষহ এবং অশান্তিতে ভরপুর।
এই পোর্টের্ট পেইন্টিং, এই অভিব্যক্তি আমি কতবার দেখেছি বইয়ের পাতায়, ছাপার কালিতে কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের ইমেজে—এত বিষণ্ন লাগেনি কখনো। কিন্তু গঘের সত্যিকার আত্মপ্রতিকৃতির ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হচ্ছিলাম এই ভেবে, ছাপা হওয়া অথবা স্ক্রিন ইমেজের চেয়ে সামনা-সামনি ক্যানভাসের গঘ আরও বেশি জীবন্ত, কিন্তু রঙে উজ্জ্বল। একটি ক্যানভাস থেকে আরেকটি ক্যানভাস শুধু আলাদা, কিন্তু প্রতিটি আত্মপ্রতিকৃতি আঙ্গিক, রঙ বিন্যাস ও তুলির আঁচড়ে বৈচিত্র্যময়। শুধু আত্মপ্রতিকৃতি নয়, ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত গঘের দুইশরও বেশি চিত্রকর্ম সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল আমার একই রকম।
জীবদ্দশায় ভ্যান গঘ ৩৫টি (মতান্তরে ৪০টি) আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, তাঁর ১৭টি সংরক্ষিত আছে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টার্ডামে অবস্থিত ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে। এছাড়াও মিউজিয়ামে আছে গঘের চারশরও বেশি ড্রয়িং এবং তাঁর ভাই থিওডোরাস ভ্যান গঘকে (থিও নামেই বেশি পরিচিত) লেখা সাতশরও বেশি চিঠিপত্র। যে চিঠিপত্র মৃত্যুর পর ভ্যান গঘকে পৃথিবীব্যাপী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
আমস্টার্ডাম সেন্ট্রাল স্টেশন মূলত রাজধানী শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরীন ও সারা ইউরোপের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রেল যোগাযোগ। সেন্ট্রাল স্টেশনের নিচভাগে রেল স্টেশন, উপরিভাগে ট্রাম লাইন। ট্রামগুলো পুরো রাজধানীজুড়ে কয়েকটি বৃত্তাকার লাইনে চলাচল করে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে যেতে হলে সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রাম-২ বা ১২-তে চড়ে (অন্যান্য পথ থাকলেও, ট্রামই বেশি জনপ্রিয় ও আরামদায়ক) মিউজিয়ামপ্লেন স্টপেজে নামতে হয়। সময় লাগে মাত্র পনেরো মিনিট। মিউজিয়ামপ্লেন এলাকাটি মূলত মিউজিয়ামপাড়া। ভ্যান গঘ মিউজিয়াম ছাড়াও দেশের জাতীয় মিউজিয়াম ‘রিজক্সমিউজিয়াম’ এখানে অবস্থিত। এছাড়া রয়েছে স্টেডলিক মিউজিয়াম ও মোকো মিউজিয়াম। এর অল্প দূরে অবস্থিত আনা ফ্রাঙ্ক হাউস। তাঁর আশেপাশেই রয়েছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রেমব্রান্টের বাড়ি রেমব্রান্ট হাউস মিউজিয়াম।

সব মিউজিয়ামে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। টিকিট বুক করতে হয় অনলাইনে। শুধু ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের টিকিট বুক করে রাখতে হয় অন্তত পনেরো দিন আগে থেকে, না হলে বুকিং স্লট পাওয়া যায় না। কিছু অথরাইজড ট্যুরিস্ট এজেন্টও ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের টিকিট বিক্রি করে থাকে। তাতে বিভিন্ন প্যাকেজের ট্যুর গাইড থাকে। তার জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। এছাড়া মিউজিয়ামের কাউন্টার থেকেও ট্যুর গাইড প্যাকেজ নেওয়া যায়। এই ট্যুরে অভিজ্ঞ গাইডরা দর্শনার্থীদের সামনে শিল্পীর জীবন, তার মানসিক অবস্থা এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পেইন্টিংয়ের পেছনের গল্প তুলে ধরেন। এতে দর্শনার্থীরা একটি ছবিকে শুধু দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন। এছাড়াও মিউজিয়ামের ভেতরে রয়েছে অডিও গাইড ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা হেডফোন ব্যবহার করে ভ্যান গগের জীবনের গল্প, তার লেখা চিঠির অংশ এবং প্রতিটি চিত্রকর্মের ব্যাখ্যা শুনতে পারেন।
আমি মাস দেড়েক আগেই অনলাইনে টিকিট বুক করে রেখেছিলাম। টিকিট মূল্য ২৫ ইউরো। মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে ঢুকেই দেখলাম গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ আছে। তাছাড়া আঠারো বছরের নিচে যে কোনো শিশুর জন্য রয়েছে ফ্রি পাস। তার জন্য ওয়েবসাইটে আবেদন করতে হয়। আমি ফ্রি পাসের জন্য আবেদন করার তিন দিনের মাথায় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আমার আইডি কার্ডের স্ক্যান কপি, আমি যে পত্রিকায় কাজ করতাম তার ওয়েবসাইট লিঙ্ক এবং আমি কত তারিখ, কোন সময়ে মিউজিয়াম ভিজিট করতে চাই—জানতে চেয়ে মেইল পাঠালো। আমি মেইলের উত্তর পাঠানোর দুইদিন পর তারা আমার ইমেইলে ফ্রি পাস পাঠিয়ে দিলো, সঙ্গে একটা প্রেস কিট। প্রেস কিটে ভ্যান গঘ ও মিউজিয়াম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য ও ছবি।
সময়টা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস। শীতের সময়। ইউরোপে শীতকাল মানেই তীব্র ঠান্ডা। জুবুথুবু হয়ে চলাফেরা করতে হয়। তার ওপর হাড়-কাঁপানো কনকনে বাতাস আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমার ভিজিটিং স্লট ছিল দুপুর ২টায়। আমি যে এয়ার বিএনবিতে উঠেছিলাম, সেটা সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রামে চড়লে সাত-আট মিনিটের পথ। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে দুপুরের আগেই চলে এসেছিলাম সেন্ট্রাল স্টেশন চত্বরে। সেখান থেকে ১২ নম্বর ট্রামে চড়ে মিউজিয়ামপ্লেনে চলে এসেছি ঘন্টাখানেক আগেই। এটা মিউজিয়াম চত্ত্বর। চত্বরের ঠিক মাঝখানে ছোট ছোট তাঁবু টানিয়ে অনেক সুভ্যেনির শপ। অনেক ট্যুরিস্টের আনাগোনা এখানে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের কারণে অধিকাংশ শপে ভ্যান গগের বিখ্যাত পেইন্টিংগুলোর রেপ্লিকা প্রিন্ট চোখে পড়ল।

ভ্যান গগের মিউজিয়ামটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি। মিউজিয়ামটি তিনতলা এবং অর্ধেক অংশ স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ঘেরা। ফলে বাইরে থেকে মিউজিয়ামের ভেতরে দর্শনার্থীদের আনাগোনা স্পষ্ট চোখে পড়ে। কাচঘেরা ঘর পেরিয়ে গ্যালারি অংশে প্রবেশ করতে হয়। মিউজিয়ামের প্রবেশ মুখে যে ব্যানার ঝোলানো ছিল, তাতে গঘের আঁকা আত্মপ্রতিকৃতিসহ তাঁর একটা উক্তি চোখে পড়ল। তাতে লেখা ‘Find things beautiful as much as you can, most people find too little beautiful.’ কোনো এক চিঠিতে তিনি এটি লিখেছিলেন তাঁর ভাই থিওকে। মিউজিয়ামটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা ভ্যান গঘের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ধারাবাহিকভাবে অনুভব করতে পারেন। তার নেদারল্যান্ডস সময়কালের গাঢ় ও বিষণ্ণ রঙের কাজ থেকে শুরু করে প্যারিসে এসে রঙের পরিবর্তন, এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের আর্লসে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত চিত্রকর্ম—সবকিছুই এখানে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিউজিয়ামে ঢোকার পর প্রথম তলাতেই দেখেছিলাম শিল্পীর প্রথম জীবনের আঁকা (১৮৮১-১৮৮৫) শিল্পকর্মগুলো। মিউজিয়ামের এই তলাটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, কারণ এখানে শিল্পীর জীবনের ধারাবাহিক চিত্রকর্মগুলো সাজানো রয়েছে। তাঁর প্রাথমিক জীবনের (নেদারল্যান্ডস সময়কাল) গাঢ় চাপা রঙের কাজ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত চিত্রকর্মগুলোর একটি ক্রমধারা এখানে দেখা যায়। প্রতিটি চিত্রকর্মের পাশে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং তাঁর লেখা চিঠির অংশবিশেষ দেওয়া আছে। ফলে প্রতিটি চিত্রকর্মের পেছনের গল্প ও শিল্পীর তখনকার মানসিক অবস্থা আমি অনুভব করতে পারছিলাম। যার মধ্যে ‘দ্য পটাটো ইটার্স’ চিত্রকর্মটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পী এটি এঁকেছিলেন ১৮৮৫ সালে। যেখানে গরিব কৃষকদের একটি সাধারণ খাবার টেবিলে বসে আলু খাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও এই তলায় প্রদর্শন করা হয়েছে তাঁর প্রথম দিকের স্টিল লাইফ পেইন্টিং ও সেলফ-পোর্ট্রেট। স্টিল লাইফ পেইন্টিংগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘স্টিল লাইফ উইথ ক্যাবেজ অ্যান্ড ক্লগস’। তাছাড়া এই তলাতে গঘের এমন কিছু পেইন্টিং ছিল, যা তিনি তাঁর প্রথম জীবনে এঁকেছিলেন জাপানি শিল্পকলা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে।

যে চিত্রকর্মগুলো ভ্যান গঘকে দুনিয়াব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছিল, সেই বিখ্যাত পেইন্টিংয়ের বেশ কিছু দেখেছিলাম মিউজিয়ামের দ্বিতীয় তলায়। বলা চলে, তাঁর এই উজ্জ্বল রঙের পেইন্টিংগুলো দেখার জন্যই বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্পরসিকরা ছুটে আসেন এই মিউজিয়ামে। এই ফ্লোরের অধিকাংশ কাজ শিল্পী প্যারিস ও আর্লসে থাকাকালীন এঁকেছিলেন। প্যারিসে থাকার সময় ভ্যান গঘ তাঁর কাজে রঙ ও স্টাইলে পরিবর্তন আনেন এবং আর্লসে বসে আঁকা ছবিগুলোতে দেখা যায় রঙের উজ্জ্বলতা। এই পেইন্টিংগুলোই দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ করে।
ভ্যান গঘ যখন ফ্রান্সের আর্লসে থাকতেন, তখন তিনি তার শিল্পীবন্ধু পল গগ্যাঁর (প্রখ্যাত ফরাসি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী) জন্য একটি ঘর সাজাতে চেয়েছিলেন। সেই ঘর সাজানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এঁকেছিলেন বিখ্যাত ‘সানফ্লাওয়ার্স’ সিরিজ। এই সিরিজটি আমি আগে বহুবার দেখেছি নানা বইয়ের পাতায়। এই পেইন্টিং শুধু ফুলের ছবি নয়—সিরিজটি তার বন্ধুত্ব, স্বপ্ন এবং নতুন শিল্পীজীবনের আশার প্রতীক হিসেবে শিল্পবোদ্ধারা বর্ননা করে থাকেন। এই সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
ভ্যান গঘের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ১৮৮৮ সালে আর্লসে তাঁর নিজের কান কেটে ফেলার ঘটনা। সে সময় তিনি শিল্পী পল গগ্যার সঙ্গে থাকতেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে শিল্প বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় গঘ নিজেই নিজের কান কেটে ফেলেন। জানা যায়, সেসময় তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এই ঘটনার পর তিনি আঁকেন বিখ্যাত পেইন্টিং ‘সেফল পোর্ট্রেট উইথ ব্যান্ডেজ ইয়ার।’
আর্লসে থাকার সময় অস্থিরচিত্তের ভ্যান গঘ মানসিক শান্তি খুঁজছিলেন। এই অনুভূতি থেকেই তিনি আঁকেন ‘বেডরুম ইন আর্লেস’। এই পেইন্টিংয়ে তাঁর নিজের ঘরকে সরলভাবে দেখানো হলেও, রঙের ব্যবহার ও বিন্যাসে এক ধরনের মানসিক ভারসাম্য ও স্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে। এটি তাঁর জীবনের এক শান্ত মুহূর্তের প্রতিফলন—যদিও বাস্তবে তাঁর জীবন তখনো অস্থিরতায় ভরা ছিল।

১৮৯০ সালে তাঁর ভাইয়ের ছেলে জন্মানোর খবর পেয়ে ভ্যান গঘ আঁকেন ‘আমন্ড ব্লুজম’। এই পেইন্টিংয়ে নীল আকাশের পটভূমিতে সাদা ফুলের ডাল নতুন জীবনের সূচনা ও আশার প্রতীক হিসেবে শিল্প আলোচকরা বর্ননা করে থাকেন। এটি তার জীবনের খুব কম আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর একটি স্মারক এবং এটি মিউজিয়ামের অন্যতম জনপ্রিয় কাজ।
ভ্যান গঘ খুব বড় বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি। ছোট ক্যানভাসে, মোটা করে রঙ নিয়ে ছোট ছোট আঁচড়ে তিনি ছবি আঁকতেন এবং ব্যবহার করতেন উজ্জ্বল রঙ। কল্পনা থেকে শিল্পী আঁকতে পছন্দ করতেন না বলে, ক্যানভাসের ঝোলা কাঁধে নিয়ে ছুটে বেড়াতেন গ্রামের রাস্তা ধরে, ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কখনো গ্রামের মেঠো রাস্তার পাশে, কখনো গম ক্ষেতের মাঝে, গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মধ্যে বসে তিনি ছবি আঁকতেন।
মিউজিয়ামের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখলাম, ভ্যান গগের শেষ জীবনে আঁকা চিত্রকর্মগুলো। পাশাপাশি শিল্পীর সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীদের কাজ। ভ্যান গগের কাজের সঙ্গে তুলনা ও তাঁর ওপর অন্য শিল্পীদের প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে সমসাময়িক ফরাসি ও ইউরোপীয় ইম্প্রেশনিস্ট এবং পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানার শিল্পীদের চিত্রকর্ম রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পল গগ্যাঁ, ক্লদ মনে, কামিল পিসারো, এডুয়ার্ড মানে, এমিল বার্নার্ড, জঁ রবার্ট লিগটে। তৃতীয় তলার এই অংশটি আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল, ভ্যান গঘ তাঁর সময়ের শিল্পধারার মধ্যে কোথায় অবস্থান করতেন এবং কীভাবে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন।
ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে শুধু শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শনই না, দেখলাম ফ্লোরের এক পাশে শিশুদের হট্টগোল (স্কুল শিক্ষার্থী)। তারা ওয়ার্কশপের মধ্য দিয়ে ভ্যান গঘের অনুকরণে ছবি আঁকছে। তাদের গাইড করছে মিউজিয়ামের একজন কর্মী। স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে এধরনের আয়োজন নিয়মিত। এছাড়াও বিশেষ লেকচার, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। এসব অনুষ্ঠানে শিল্পবিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন এবং ভ্যান গঘের শিল্প ও তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
মিউজিয়ামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অস্থায়ী প্রদর্শনী বা টেম্পোরারি এক্সিবিশন। এখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন থিমের ওপর ভিত্তি করে নতুন প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। কখনও ভ্যান গঘের সমসাময়িক শিল্পীদের কাজ, আবার কখনো আধুনিক শিল্পের সঙ্গে তার তুলনামূলক উপস্থাপনা করা হয়।

ভ্যান গঘ মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে।
১৮৯০ সালে ভ্যান গঘের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই থিও মাত্র ছয় মাস বেঁচে ছিলেন। থিও মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী জোহানা ভ্যান গঘ-বোঙ্গার (জো নামেও পরিচিত ছিলেন) নিজ উদ্যোগে ভ্যান গঘের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আয়োজন করেন এবং থিওকে লেখা শিল্পীর চিঠিগুলো প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন। জো-এর মৃত্যুর পর, তাঁর ছেলে ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গঘ (শিল্পীর ভাগ্নে) এই বিশাল সংগ্রহের দায়িত্ব নেন। তিনি অনেক বছর ধরে শিল্পকর্মগুলো আমস্টারডামের স্টেডলিক মিউজিয়ামে প্রদর্শনের জন্য ধার দেন।
এরপর ১৯৬২ সালে ডাচ সরকারের সহায়তায় তিনি ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ফাউন্ডেশন’ গঠন করেন। এই ফাউন্ডেশনটি তৈরির পর, ডাচ স্থপতি গেরিট রিয়েটভেল্ডের নকশায় একটি আলাদা জাদুঘর ভবনের কাজ শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৩ সালে আমস্টারডামের মিউজিয়ামপ্লেনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যান গঘ মিউজিয়াম চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালে স্থপতি কিশো কুরোকাওয়ার নকশায় জাদুঘরটিতে একটি নতুন প্রদর্শনী শাখা বা উইং যুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্যান গঘ সংগ্রহশালা।
পুরো মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখে যখন বেরিয়ে আসি, বাইরে তখন সন্ধ্যা (ঘড়ির কাঁটায় যদিও বিকেল) নেমে এসেছে, সঙ্গে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। ইউরোপে শীতকালে খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামে, সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। আমার সঙ্গে ছাতা ছিল না। মিউজিয়াম থেকে খানিক দূরে ট্রাম লাইন। ততটুকু পথ হেঁটে যেতে হবে। ইচ্ছে ছিল বেরিয়ে স্যুভেনির শপগুলোতে এক মগ কফি নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা আর ইচ্ছে করল না। ভাবলাম, সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে যাই।
সন্ধ্যার পর স্টেশন চত্বরে ট্যুরিস্টদের ভিড় জমে। যদিও বৃষ্টি হচ্ছিল গুড়ি গুড়ি, মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক (তিনিও সম্ভবত মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েছেন) আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তাঁর হাতে থাকা ছাতার একটা অংশ আমার মাথার ওপর ধরলেন। কোনো কথা না বলে (ধারণা করলাম, তিনি ইংরেজি জানেন না) একটু হেসে বোঝালেন, ‘শুধু শুধু ভিজছ কেন? ছাতার নিচে আসো’। আমিও হেসে বোঝালাম, ‘ধন্যবাদ’।
আমাকে ট্রাম লাইনের ওপর এগিয়ে দিয়ে তিনি অন্য দিকে চলে গেলেন। আমি পরের ট্রামের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বুঝলাম, আমার চোখের পর্দা থেকে তখনো ভ্যান গঘের আঁকা ছবির রঙগুলো মুছে যায়নি। চোখে মণিতে ক্যানভাসের উজ্জ্বল রঙগুলো ঢেউ খেলতে লাগল।

গম্ভীর চেহারায় ভ্যান গঘ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। তাঁর নীলাভ চোখের মণি দুটো ছিল স্থির এবং ভাবলেশহীন মুখ। গঘের সেই নীল চোখের দিকে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত হচ্ছিলাম বারবার। মনে হচ্ছিল, তিনি আমার ওপর (সকল মানুষের ওপর) বিরক্ত। কিছু একটা বলতে গিয়েও বলছেন না, হয়তো বলতে চাইছেন না।
ক্যানভাসে কখনো ঢেউ খেলানো তুলির আঁচড়, কখনো ঘন ঘন ছোট স্ট্রোক, কখনো নীল রঙের ক্যানভাস, কখনো ধূসর, সবুজ, আবার কখনো জলপাই রঙের ক্যানভাসে শিল্পী নিজের যত আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন, সবখানেই একই অভিব্যক্তি। বিরক্ত নাকি বিষণ্ন, বুঝে উঠতে পারলাম না। জানতাম, শিল্পীর সারাটা জীবন ছিল দুর্বিষহ এবং অশান্তিতে ভরপুর।
এই পোর্টের্ট পেইন্টিং, এই অভিব্যক্তি আমি কতবার দেখেছি বইয়ের পাতায়, ছাপার কালিতে কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের ইমেজে—এত বিষণ্ন লাগেনি কখনো। কিন্তু গঘের সত্যিকার আত্মপ্রতিকৃতির ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হচ্ছিলাম এই ভেবে, ছাপা হওয়া অথবা স্ক্রিন ইমেজের চেয়ে সামনা-সামনি ক্যানভাসের গঘ আরও বেশি জীবন্ত, কিন্তু রঙে উজ্জ্বল। একটি ক্যানভাস থেকে আরেকটি ক্যানভাস শুধু আলাদা, কিন্তু প্রতিটি আত্মপ্রতিকৃতি আঙ্গিক, রঙ বিন্যাস ও তুলির আঁচড়ে বৈচিত্র্যময়। শুধু আত্মপ্রতিকৃতি নয়, ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত গঘের দুইশরও বেশি চিত্রকর্ম সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল আমার একই রকম।
জীবদ্দশায় ভ্যান গঘ ৩৫টি (মতান্তরে ৪০টি) আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, তাঁর ১৭টি সংরক্ষিত আছে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টার্ডামে অবস্থিত ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে। এছাড়াও মিউজিয়ামে আছে গঘের চারশরও বেশি ড্রয়িং এবং তাঁর ভাই থিওডোরাস ভ্যান গঘকে (থিও নামেই বেশি পরিচিত) লেখা সাতশরও বেশি চিঠিপত্র। যে চিঠিপত্র মৃত্যুর পর ভ্যান গঘকে পৃথিবীব্যাপী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
আমস্টার্ডাম সেন্ট্রাল স্টেশন মূলত রাজধানী শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরীন ও সারা ইউরোপের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রেল যোগাযোগ। সেন্ট্রাল স্টেশনের নিচভাগে রেল স্টেশন, উপরিভাগে ট্রাম লাইন। ট্রামগুলো পুরো রাজধানীজুড়ে কয়েকটি বৃত্তাকার লাইনে চলাচল করে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে যেতে হলে সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রাম-২ বা ১২-তে চড়ে (অন্যান্য পথ থাকলেও, ট্রামই বেশি জনপ্রিয় ও আরামদায়ক) মিউজিয়ামপ্লেন স্টপেজে নামতে হয়। সময় লাগে মাত্র পনেরো মিনিট। মিউজিয়ামপ্লেন এলাকাটি মূলত মিউজিয়ামপাড়া। ভ্যান গঘ মিউজিয়াম ছাড়াও দেশের জাতীয় মিউজিয়াম ‘রিজক্সমিউজিয়াম’ এখানে অবস্থিত। এছাড়া রয়েছে স্টেডলিক মিউজিয়াম ও মোকো মিউজিয়াম। এর অল্প দূরে অবস্থিত আনা ফ্রাঙ্ক হাউস। তাঁর আশেপাশেই রয়েছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রেমব্রান্টের বাড়ি রেমব্রান্ট হাউস মিউজিয়াম।

সব মিউজিয়ামে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। টিকিট বুক করতে হয় অনলাইনে। শুধু ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের টিকিট বুক করে রাখতে হয় অন্তত পনেরো দিন আগে থেকে, না হলে বুকিং স্লট পাওয়া যায় না। কিছু অথরাইজড ট্যুরিস্ট এজেন্টও ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের টিকিট বিক্রি করে থাকে। তাতে বিভিন্ন প্যাকেজের ট্যুর গাইড থাকে। তার জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। এছাড়া মিউজিয়ামের কাউন্টার থেকেও ট্যুর গাইড প্যাকেজ নেওয়া যায়। এই ট্যুরে অভিজ্ঞ গাইডরা দর্শনার্থীদের সামনে শিল্পীর জীবন, তার মানসিক অবস্থা এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পেইন্টিংয়ের পেছনের গল্প তুলে ধরেন। এতে দর্শনার্থীরা একটি ছবিকে শুধু দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন। এছাড়াও মিউজিয়ামের ভেতরে রয়েছে অডিও গাইড ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা হেডফোন ব্যবহার করে ভ্যান গগের জীবনের গল্প, তার লেখা চিঠির অংশ এবং প্রতিটি চিত্রকর্মের ব্যাখ্যা শুনতে পারেন।
আমি মাস দেড়েক আগেই অনলাইনে টিকিট বুক করে রেখেছিলাম। টিকিট মূল্য ২৫ ইউরো। মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে ঢুকেই দেখলাম গবেষক ও সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ আছে। তাছাড়া আঠারো বছরের নিচে যে কোনো শিশুর জন্য রয়েছে ফ্রি পাস। তার জন্য ওয়েবসাইটে আবেদন করতে হয়। আমি ফ্রি পাসের জন্য আবেদন করার তিন দিনের মাথায় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আমার আইডি কার্ডের স্ক্যান কপি, আমি যে পত্রিকায় কাজ করতাম তার ওয়েবসাইট লিঙ্ক এবং আমি কত তারিখ, কোন সময়ে মিউজিয়াম ভিজিট করতে চাই—জানতে চেয়ে মেইল পাঠালো। আমি মেইলের উত্তর পাঠানোর দুইদিন পর তারা আমার ইমেইলে ফ্রি পাস পাঠিয়ে দিলো, সঙ্গে একটা প্রেস কিট। প্রেস কিটে ভ্যান গঘ ও মিউজিয়াম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য ও ছবি।
সময়টা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস। শীতের সময়। ইউরোপে শীতকাল মানেই তীব্র ঠান্ডা। জুবুথুবু হয়ে চলাফেরা করতে হয়। তার ওপর হাড়-কাঁপানো কনকনে বাতাস আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমার ভিজিটিং স্লট ছিল দুপুর ২টায়। আমি যে এয়ার বিএনবিতে উঠেছিলাম, সেটা সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রামে চড়লে সাত-আট মিনিটের পথ। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে দুপুরের আগেই চলে এসেছিলাম সেন্ট্রাল স্টেশন চত্বরে। সেখান থেকে ১২ নম্বর ট্রামে চড়ে মিউজিয়ামপ্লেনে চলে এসেছি ঘন্টাখানেক আগেই। এটা মিউজিয়াম চত্ত্বর। চত্বরের ঠিক মাঝখানে ছোট ছোট তাঁবু টানিয়ে অনেক সুভ্যেনির শপ। অনেক ট্যুরিস্টের আনাগোনা এখানে। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের কারণে অধিকাংশ শপে ভ্যান গগের বিখ্যাত পেইন্টিংগুলোর রেপ্লিকা প্রিন্ট চোখে পড়ল।

ভ্যান গগের মিউজিয়ামটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি। মিউজিয়ামটি তিনতলা এবং অর্ধেক অংশ স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ঘেরা। ফলে বাইরে থেকে মিউজিয়ামের ভেতরে দর্শনার্থীদের আনাগোনা স্পষ্ট চোখে পড়ে। কাচঘেরা ঘর পেরিয়ে গ্যালারি অংশে প্রবেশ করতে হয়। মিউজিয়ামের প্রবেশ মুখে যে ব্যানার ঝোলানো ছিল, তাতে গঘের আঁকা আত্মপ্রতিকৃতিসহ তাঁর একটা উক্তি চোখে পড়ল। তাতে লেখা ‘Find things beautiful as much as you can, most people find too little beautiful.’ কোনো এক চিঠিতে তিনি এটি লিখেছিলেন তাঁর ভাই থিওকে। মিউজিয়ামটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা ভ্যান গঘের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ধারাবাহিকভাবে অনুভব করতে পারেন। তার নেদারল্যান্ডস সময়কালের গাঢ় ও বিষণ্ণ রঙের কাজ থেকে শুরু করে প্যারিসে এসে রঙের পরিবর্তন, এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের আর্লসে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত চিত্রকর্ম—সবকিছুই এখানে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিউজিয়ামে ঢোকার পর প্রথম তলাতেই দেখেছিলাম শিল্পীর প্রথম জীবনের আঁকা (১৮৮১-১৮৮৫) শিল্পকর্মগুলো। মিউজিয়ামের এই তলাটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, কারণ এখানে শিল্পীর জীবনের ধারাবাহিক চিত্রকর্মগুলো সাজানো রয়েছে। তাঁর প্রাথমিক জীবনের (নেদারল্যান্ডস সময়কাল) গাঢ় চাপা রঙের কাজ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত চিত্রকর্মগুলোর একটি ক্রমধারা এখানে দেখা যায়। প্রতিটি চিত্রকর্মের পাশে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং তাঁর লেখা চিঠির অংশবিশেষ দেওয়া আছে। ফলে প্রতিটি চিত্রকর্মের পেছনের গল্প ও শিল্পীর তখনকার মানসিক অবস্থা আমি অনুভব করতে পারছিলাম। যার মধ্যে ‘দ্য পটাটো ইটার্স’ চিত্রকর্মটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পী এটি এঁকেছিলেন ১৮৮৫ সালে। যেখানে গরিব কৃষকদের একটি সাধারণ খাবার টেবিলে বসে আলু খাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও এই তলায় প্রদর্শন করা হয়েছে তাঁর প্রথম দিকের স্টিল লাইফ পেইন্টিং ও সেলফ-পোর্ট্রেট। স্টিল লাইফ পেইন্টিংগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘স্টিল লাইফ উইথ ক্যাবেজ অ্যান্ড ক্লগস’। তাছাড়া এই তলাতে গঘের এমন কিছু পেইন্টিং ছিল, যা তিনি তাঁর প্রথম জীবনে এঁকেছিলেন জাপানি শিল্পকলা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে।

যে চিত্রকর্মগুলো ভ্যান গঘকে দুনিয়াব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছিল, সেই বিখ্যাত পেইন্টিংয়ের বেশ কিছু দেখেছিলাম মিউজিয়ামের দ্বিতীয় তলায়। বলা চলে, তাঁর এই উজ্জ্বল রঙের পেইন্টিংগুলো দেখার জন্যই বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্পরসিকরা ছুটে আসেন এই মিউজিয়ামে। এই ফ্লোরের অধিকাংশ কাজ শিল্পী প্যারিস ও আর্লসে থাকাকালীন এঁকেছিলেন। প্যারিসে থাকার সময় ভ্যান গঘ তাঁর কাজে রঙ ও স্টাইলে পরিবর্তন আনেন এবং আর্লসে বসে আঁকা ছবিগুলোতে দেখা যায় রঙের উজ্জ্বলতা। এই পেইন্টিংগুলোই দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ করে।
ভ্যান গঘ যখন ফ্রান্সের আর্লসে থাকতেন, তখন তিনি তার শিল্পীবন্ধু পল গগ্যাঁর (প্রখ্যাত ফরাসি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী) জন্য একটি ঘর সাজাতে চেয়েছিলেন। সেই ঘর সাজানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এঁকেছিলেন বিখ্যাত ‘সানফ্লাওয়ার্স’ সিরিজ। এই সিরিজটি আমি আগে বহুবার দেখেছি নানা বইয়ের পাতায়। এই পেইন্টিং শুধু ফুলের ছবি নয়—সিরিজটি তার বন্ধুত্ব, স্বপ্ন এবং নতুন শিল্পীজীবনের আশার প্রতীক হিসেবে শিল্পবোদ্ধারা বর্ননা করে থাকেন। এই সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
ভ্যান গঘের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ১৮৮৮ সালে আর্লসে তাঁর নিজের কান কেটে ফেলার ঘটনা। সে সময় তিনি শিল্পী পল গগ্যার সঙ্গে থাকতেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে শিল্প বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় গঘ নিজেই নিজের কান কেটে ফেলেন। জানা যায়, সেসময় তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এই ঘটনার পর তিনি আঁকেন বিখ্যাত পেইন্টিং ‘সেফল পোর্ট্রেট উইথ ব্যান্ডেজ ইয়ার।’
আর্লসে থাকার সময় অস্থিরচিত্তের ভ্যান গঘ মানসিক শান্তি খুঁজছিলেন। এই অনুভূতি থেকেই তিনি আঁকেন ‘বেডরুম ইন আর্লেস’। এই পেইন্টিংয়ে তাঁর নিজের ঘরকে সরলভাবে দেখানো হলেও, রঙের ব্যবহার ও বিন্যাসে এক ধরনের মানসিক ভারসাম্য ও স্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে। এটি তাঁর জীবনের এক শান্ত মুহূর্তের প্রতিফলন—যদিও বাস্তবে তাঁর জীবন তখনো অস্থিরতায় ভরা ছিল।

১৮৯০ সালে তাঁর ভাইয়ের ছেলে জন্মানোর খবর পেয়ে ভ্যান গঘ আঁকেন ‘আমন্ড ব্লুজম’। এই পেইন্টিংয়ে নীল আকাশের পটভূমিতে সাদা ফুলের ডাল নতুন জীবনের সূচনা ও আশার প্রতীক হিসেবে শিল্প আলোচকরা বর্ননা করে থাকেন। এটি তার জীবনের খুব কম আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর একটি স্মারক এবং এটি মিউজিয়ামের অন্যতম জনপ্রিয় কাজ।
ভ্যান গঘ খুব বড় বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি। ছোট ক্যানভাসে, মোটা করে রঙ নিয়ে ছোট ছোট আঁচড়ে তিনি ছবি আঁকতেন এবং ব্যবহার করতেন উজ্জ্বল রঙ। কল্পনা থেকে শিল্পী আঁকতে পছন্দ করতেন না বলে, ক্যানভাসের ঝোলা কাঁধে নিয়ে ছুটে বেড়াতেন গ্রামের রাস্তা ধরে, ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কখনো গ্রামের মেঠো রাস্তার পাশে, কখনো গম ক্ষেতের মাঝে, গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মধ্যে বসে তিনি ছবি আঁকতেন।
মিউজিয়ামের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখলাম, ভ্যান গগের শেষ জীবনে আঁকা চিত্রকর্মগুলো। পাশাপাশি শিল্পীর সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীদের কাজ। ভ্যান গগের কাজের সঙ্গে তুলনা ও তাঁর ওপর অন্য শিল্পীদের প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে সমসাময়িক ফরাসি ও ইউরোপীয় ইম্প্রেশনিস্ট এবং পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানার শিল্পীদের চিত্রকর্ম রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পল গগ্যাঁ, ক্লদ মনে, কামিল পিসারো, এডুয়ার্ড মানে, এমিল বার্নার্ড, জঁ রবার্ট লিগটে। তৃতীয় তলার এই অংশটি আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছিল, ভ্যান গঘ তাঁর সময়ের শিল্পধারার মধ্যে কোথায় অবস্থান করতেন এবং কীভাবে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন।
ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে শুধু শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শনই না, দেখলাম ফ্লোরের এক পাশে শিশুদের হট্টগোল (স্কুল শিক্ষার্থী)। তারা ওয়ার্কশপের মধ্য দিয়ে ভ্যান গঘের অনুকরণে ছবি আঁকছে। তাদের গাইড করছে মিউজিয়ামের একজন কর্মী। স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে এধরনের আয়োজন নিয়মিত। এছাড়াও বিশেষ লেকচার, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। এসব অনুষ্ঠানে শিল্পবিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন এবং ভ্যান গঘের শিল্প ও তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
মিউজিয়ামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অস্থায়ী প্রদর্শনী বা টেম্পোরারি এক্সিবিশন। এখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন থিমের ওপর ভিত্তি করে নতুন প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। কখনও ভ্যান গঘের সমসাময়িক শিল্পীদের কাজ, আবার কখনো আধুনিক শিল্পের সঙ্গে তার তুলনামূলক উপস্থাপনা করা হয়।

ভ্যান গঘ মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে।
১৮৯০ সালে ভ্যান গঘের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই থিও মাত্র ছয় মাস বেঁচে ছিলেন। থিও মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী জোহানা ভ্যান গঘ-বোঙ্গার (জো নামেও পরিচিত ছিলেন) নিজ উদ্যোগে ভ্যান গঘের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আয়োজন করেন এবং থিওকে লেখা শিল্পীর চিঠিগুলো প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন। জো-এর মৃত্যুর পর, তাঁর ছেলে ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গঘ (শিল্পীর ভাগ্নে) এই বিশাল সংগ্রহের দায়িত্ব নেন। তিনি অনেক বছর ধরে শিল্পকর্মগুলো আমস্টারডামের স্টেডলিক মিউজিয়ামে প্রদর্শনের জন্য ধার দেন।
এরপর ১৯৬২ সালে ডাচ সরকারের সহায়তায় তিনি ‘ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ফাউন্ডেশন’ গঠন করেন। এই ফাউন্ডেশনটি তৈরির পর, ডাচ স্থপতি গেরিট রিয়েটভেল্ডের নকশায় একটি আলাদা জাদুঘর ভবনের কাজ শুরু হয়। অবশেষে ১৯৭৩ সালে আমস্টারডামের মিউজিয়ামপ্লেনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যান গঘ মিউজিয়াম চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালে স্থপতি কিশো কুরোকাওয়ার নকশায় জাদুঘরটিতে একটি নতুন প্রদর্শনী শাখা বা উইং যুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্যান গঘ সংগ্রহশালা।
পুরো মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখে যখন বেরিয়ে আসি, বাইরে তখন সন্ধ্যা (ঘড়ির কাঁটায় যদিও বিকেল) নেমে এসেছে, সঙ্গে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। ইউরোপে শীতকালে খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামে, সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। আমার সঙ্গে ছাতা ছিল না। মিউজিয়াম থেকে খানিক দূরে ট্রাম লাইন। ততটুকু পথ হেঁটে যেতে হবে। ইচ্ছে ছিল বেরিয়ে স্যুভেনির শপগুলোতে এক মগ কফি নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা আর ইচ্ছে করল না। ভাবলাম, সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে যাই।
সন্ধ্যার পর স্টেশন চত্বরে ট্যুরিস্টদের ভিড় জমে। যদিও বৃষ্টি হচ্ছিল গুড়ি গুড়ি, মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক (তিনিও সম্ভবত মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েছেন) আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তাঁর হাতে থাকা ছাতার একটা অংশ আমার মাথার ওপর ধরলেন। কোনো কথা না বলে (ধারণা করলাম, তিনি ইংরেজি জানেন না) একটু হেসে বোঝালেন, ‘শুধু শুধু ভিজছ কেন? ছাতার নিচে আসো’। আমিও হেসে বোঝালাম, ‘ধন্যবাদ’।
আমাকে ট্রাম লাইনের ওপর এগিয়ে দিয়ে তিনি অন্য দিকে চলে গেলেন। আমি পরের ট্রামের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বুঝলাম, আমার চোখের পর্দা থেকে তখনো ভ্যান গঘের আঁকা ছবির রঙগুলো মুছে যায়নি। চোখে মণিতে ক্যানভাসের উজ্জ্বল রঙগুলো ঢেউ খেলতে লাগল।
.png)

আবার আয়েশা ফয়েজের মৃত্যুর পরে রয়্যালটির একটা অংশ হুমায়ূনের ভাই-বোনেরাও পেতেন, কিন্তু লেখকের ভাই-বোনেরা সেই অংশ নেন না বলে জানিয়েছেন প্রকাশকেরা।
১৭ মিনিট আগে
আমার চোখে প্রায় পানি এসে যাবার মতো অবস্থা হলো। ইচ্ছে করল টিকিট এবং পাসপোর্ট ছুঁড়ে ফেলে তার হাত ধরে বলি—চলো, বাসায় যাই। অল্প কিছুদিন আমাদের আয়ু। এই অল্পদিনের জন্যে আমাদের মতো আয়োজন—পাস, ডিগ্রি, চাকরি, প্রমোশন, টাকা-পয়সা, বাড়িঘর-কোনো মানে হয়? কোনোই মানে হয় না।’
৩৯ মিনিট আগে
নব্বই দশক কিংবা দুই হাজার সালের শুরুর প্রজন্ম মানেই বলা হতো হুমায়ূন আহমেদের পাঠক। তখন হাতে হাতে ছিল না স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ছিল সীমিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ছিল না এতো মাতামাতি।
৭ ঘণ্টা আগে
হুমায়ূনকে আমি প্রথম দেখি একুশের বইমেলায়, সাতাশি সালের এক সন্ধ্যায়। যিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘‘ইনি হুমায়ূন আহমেদ। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি-নাটক লিখেছেন, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামের উপন্যাস লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান।’’
৯ ঘণ্টা আগে