আন্তর্জাতিক দাবা দিবস

নিয়াজ-জিয়া-রানী হামিদ… যাঁদের হাত ধরে এগিয়েছে চৌষট্টি ঘরের গল্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

দাবাকে বলা হয় বুদ্ধির খেলা। অনেকে বলেন, বুদ্ধি বাড়াতে চাইলে দাবা খেলা উচিত, আবার কেউ বলেন কেবল ‘বুদ্ধিমানেরাই’ দাবা খেলায় ভালো করতে পারে। এই খেলায় কোনো কথা নেই, হইচই নেই, শুধু চিন্তা আর দুই পক্ষের নীরব বোঝাপড়া। কারও ঠোঁটে লেগে থাকে মিটিমিটি হাসি আবার কারও কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। চৌষট্টি ঘরের দাবার বোর্ডটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে নেই অস্ত্রের ঝনঝনানি, নেই হানাহানি। তবু প্রতিটি চালে থাকে উত্তেজনা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে লুকিয়ে থাকে জয়-পরাজয়ের ভাগ্য। ধৈর্য, দূরদৃষ্টি, কৌশল আর মেধার অপূর্ব সমন্বয়ই দাবাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা।

পৃথিবীতে দাবার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। তবে এই খেলা কবে আবিষ্কৃত হয়েছিল তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এটা খ্রিষ্টপূর্ব যুগের খেলা। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের ধারণা, দাবা এই উপমহাদেশেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। আজ থেকে ১ হাজার ৫০০ বছর আগে এই অঞ্চলে ‘চতুরঙ্গ বা শতরঞ্জি’ খেলা হয়েছে, যা দাবা খেলারই অন্য নাম।

বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে প্রথম স্বর্ণালি অধ্যায়ের সূচনা করেন নিয়াজ মোর্শেদ। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৮৭ সালে তিনি উপমহাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে মাত্র ১২ বছর ১১ মাস বয়সে প্রথমবার জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নন, দক্ষিণ এশিয়ারও প্রথম আন্তর্জাতিক ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’। ১৯৮৭ সালে তিনি এই খেতাব অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্য পুরো অঞ্চলের দাবা অঙ্গনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। দীর্ঘ সময় তিনি দেশের এক নম্বর দাবাড়ু ছিলেন। জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপেও বহুবার শিরোপা জিতেছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টেও দেখিয়েছেন দারুণ নৈপুণ্য।

নিয়াজ মোর্শেদের পর দীর্ঘ সময় নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার পায়নি দেশ। সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে ২০০২ সালে, যখন জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দাবা ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান।

১৯৮৮ সালে প্রথমবার জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় ১৪বার শিরোপা জেতার রেকর্ড তাঁর দখলে। আক্রমণাত্মক ও সৃজনশীল খেলার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও দেশের জন্য অসংখ্য সাফল্য এনে দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ জুলাই দাবা খেলতে খেলতেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এটা খ্রিষ্টপূর্ব যুগের খেলা। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের ধারণা, দাবা এই উপমহাদেশেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। আজ থেকে ১ হাজার ৫০০ বছর আগে এই অঞ্চলে ‘চতুরঙ্গ বা শতরঞ্জি’ খেলা হয়েছে, যা দাবা খেলারই অন্য নাম।

এরপর দেশের দাবা অঙ্গনে আসে নতুন জোয়ার। ২০০৬ সালে রিফাত বিন সাত্তার, ২০০৭ সালে আব্দুল্লাহ আল রাকিব এবং ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীব গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করে বাংলাদেশের দাবার সাফল্যের মুকুটকে আরও সমৃদ্ধ করেন। তিনিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার। এই অর্জনের মাধ্যমে দেশের দাবার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়। তিনি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত খেলেছেন। জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায়ও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। কঠিন পরিস্থিতিতেও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁর বড় শক্তি। তরুণ দাবাড়ুদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার আরেক নাম।

বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে ‘প্রথম নারী দাবাড়ু হিসেবে’ রানী হামিদের নাম সবার আগে আসবে। ক্যারিয়ারের মাঝপথে এসে নতুন করে জীবনের গতিপথ পাল্টে ফেলেন। ৩৪ বছর বয়সেই প্রথম পা রাখেন দাবার জগতে। ১৯৭৯ সালে জাতীয় নারী দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতে সবাইকে চমকে দেন। এরপর টানা ছয় বছর, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত ধরে রাখেন জাতীয় সেরার মুকুট। কিন্তু রানী হামিদ কখনো হারিয়ে যাননি। সব মিলিয়ে ২০ বার জাতীয় নারী দাবা চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। ২০১৯ সালে ৭৫ বছর বয়সেও জিতে নেন জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুট। দেশের গণ্ডি পেরিয়েও তাঁর সাফল্যের দীপ্তি সমান উজ্জ্বল। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে অর্জন করেন ‘মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার’ খেতাব।

বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা দাবাড়ু ফাহাদ রহমান। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত হ্যানয় গ্র্যান্ড মাস্টার্স দাবা হতে তিনি ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ খেতাব অর্জন করেছেন। মাত্র দশ বছর বয়সেই ‘ফিদে মাস্টার’ উপাধি জিতে দাবা খেলায় তাঁর প্রতিভার প্রমাণ দেন এই তরুণ।

বাংলাদেশের দাবার ইতিহাস গড়ে উঠেছে এসব কিংবদন্তি দাবাড়ুর হাত ধরে। তাঁদের প্রত্যেকের অর্জন দেশের জন্য গর্বের বিষয়। কেউ পথ দেখিয়েছেন, কেউ সেই পথকে আরও বিস্তৃত করেছেন। দেশের দাবা বিশ্বমঞ্চে আরও উজ্জ্বল হোক। সেই স্বপ্নই আজ কোটি মানুষের আশা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত