বেলুচিস্তান সংকট: আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৩৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। ভৌগোলিক বিস্তৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল শুধু পাকিস্তানের নয়; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই ভূখণ্ড বছরের পর বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, নিরাপত্তা সংকট, মানবাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো সমস্যার মুখোমুখি।

একদিকে পাকিস্তান সরকার উন্নয়ন প্রকল্প ও নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বেলুচ সংগঠন রাজনৈতিক অধিকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে আসছে। এর ফলে অঞ্চলটির পরিস্থিতি ক্রমে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

বর্তমান সময়ে বেলুচিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই বেলুচিস্তান পরিস্থিতি বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাবকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

চলতি মাস জুড়ে বেলুচিস্তানে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীর একাধিক সমন্বিত হামলায় বেলুচিস্থানের জিয়ারত ও লাসবেলা জেলায় পুলিশ স্টেশন, নিরাপত্তা চৌকি, সামরিক স্থাপনা ও জনবলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। সরকারি হিসাবেই এসব হামলায় অন্তত ৪২ জন সেনা ও পুলিশ সদস্য নিহত হন। সর্বশেষ মাস্তুঙের কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি গাড়িবহরে বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) অতর্কিত অ্যাম্বুশে পাকিস্তানের অন্তত ৪৫ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও বেলুচিস্তান পুলিশ যৌথভাবে ‘অপারেশন শাবান’ শুরু করে।

পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে এই অভিযান ও অন্যান্য গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযানে মোট ১২৯ জন বেলুচ সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত এই সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রকাশ করেনি।

বেলুচিস্তানে মূলত বড় তিন সশস্ত্র গ্রুপ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে। বিএলএর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এ ছাড়াও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ) ও বেলুচ ন্যাশনালিস্ট আর্মি (বিএনএ) নামক আরও দুটি সশস্ত্র গ্রুপ আছে। এর মধ্যে বিএলএ সবচেয়ে বড় ও সক্রিয়। তাদের লক্ষ্য একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি (বিশেষ করে চীনা) প্রকল্পকেও তারা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেলুচ সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অভিযান জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’-এর নামে ভাইরাল হওয়া একটি বিবৃতি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিবৃতিতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেছে বলা হয়েছে। দাবি করা হয়, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশের ৮৫ শতাংশেরও বেশি তারা ‘নিয়ন্ত্রণ করছে’। এতে বলা হয়, বেলুচিস্তান একটি জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক পদ্ধতি চালু করেছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, নতুন প্রশাসন অঞ্চলটির স্বর্ণ ও তামার খনি, গ্যাসক্ষেত্র ও কয়লাখনির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিবৃতির কথা ভারতভিত্তিক সংবাদ চ্যানেল সিএনএন-নিউজ এইটিন সর্বপ্রথম প্রচার করে। তারা অবশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ওই বিবৃতির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বলেও জানায়।

পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান ভৌগোলিক দিক থেকে দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে এটি তুলনামূলকভাবে ছোট। প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, স্বর্ণ, কয়লা এবং গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদরের কারণে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত; এর পশ্চিমে ইরান, উত্তরে আফগানিস্তান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। প্রদেশটিতে অবস্থিত গোয়াদর বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর একে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।

বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির শিকড় ইতিহাসের গভীরে নিহিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি ‘কালাত’ নামের একটি দেশীয় রাজ্য ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর কালাত নিজেদের স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ঘোষণা দিলেও তার স্থায়ীত্ব স্বল্প সময়ের জন্য ছিল। পরে ১৯৪৮ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে কালাত পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তান সরকার এই অন্তর্ভুক্তিকে বৈধ বলে মনে করলেও বেলুচিস্তানের অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা দাবি করেন, রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ দিয়ে তাদের চুক্তিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই ভিন্ন ব্যাখ্যাই পরে কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিকভাবে বেলুচিস্তানের মূল বিরোধ আবর্তিত হয় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সম্পদের মালিকানা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন ঘিরে। বেলুচ জাতীয়তাবাদী দলগুলোর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করলেও স্থানীয় জনসাধারণ তার ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার দাবি করে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। রেকো ডিকের তামা ও স্বর্ণখনি, সাইন্দাক খনি এবং আরব সাগরের তীরে গোয়াদর বন্দর পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ায় বেলুচিস্তান ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল সমানভাবে ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এসব ইস্যু নিয়ে তাদের ভেতর দিন দিন ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ধাপে ধাপে এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে।

পাকিস্তান সরকার দাবি করে আসছে, ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং কখনও কখনও অন্যান্য জঙ্গি নেটওয়ার্ককে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে। পাকিস্তান ইতিপূর্বে তাদের অভিযোগের সমর্থনে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন নথি, গোয়েন্দা তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ছবি, যোগাযোগের রেকর্ড ও বিশ্লেষণ একত্র করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দিয়েছে। এমনকি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (‘র’)-এর হয়ে কাজ করা কুলভূষণ যাদব নামক ভারতীয় নাগরিককে ইরান সীমান্ত সংলগ্ন বেলুচিস্তানের মাশকেল থেকে আটক করেছে বলে পাকিস্তান সরকার দাবি করে। তাদের অভিযোগ, কুলভূষণ ভুয়া পরিচয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে বেলুচিস্তান ও করাচিতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। তাকে ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার করা হয়।

পাকিস্তানের অভিযোগ অস্বীকার করে ভারত দাবি করে, কুলভূষণ ভারতের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে সক্রিয় দায়িত্ব থেকে অবসর নেন এবং পরে ইরানের চাবাহার বন্দরে ব্যবসা শুরু করেন। ভারতের দাবি, তাকে ইরানের ভূখণ্ড থেকে অপহরণ করা এবং পরে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিস্তান ভারতের দাবি অস্বীকার করে জানায়, তিনি অবসরের পরও ‘র’-এর হয়ে কাজ করছিলেন। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগাতেন ও সমন্বয় করতেন। পাকিস্তান তাদের দাবির সপক্ষে একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে কুলভূষণকে নিজের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড স্বীকার করতে দেখা যায়। পাকিস্তান এটিকে তার ‘স্বীকারোক্তি’ হিসেবে তুলে ধরে।

২০১৭ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালত কুলভূষণ যাদবকে গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ভারত এই রায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দ্বারস্থ হয়। ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এক রায় দেয়। আদালত কুলভূষণ গুপ্তচর ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। আদালত কেবল ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কনস্যুলার অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নটি বিবেচনা করে তার মামলার আইনি প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে এবং ভারতকে কনস্যুলার প্রবেশাধিকার দিতে পাকিস্তানকে জানায়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের পর পাকিস্তান ভারতীয় কূটনীতিকদের কুলভূষণ যাদবের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয় এবং মামলা পুনর্বিবেচনার জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানায়। যাদবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ভারত তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত বলে দাবি করলে পাকিস্তান জানিয়ে দেয়, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বহাল এবং দেশের আইন অনুযায়ী বিচার চলছে।

বেলুচিস্তানের চলমান সংঘাত শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। গোয়াদর বন্দর, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, ইরান-আফগানিস্তান সীমান্ত এবং আরব সাগরে প্রবেশাধিকার– সব মিলিয়ে অঞ্চলটি বিশ্ব শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বেলুচিস্তান চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের মূল কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে চীনা প্রকৌশলী, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়বে। এতে চীন পাকিস্তানের ওপর নিরাপত্তা জোরদারের জন্য আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তায় দুই দেশের সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।

আগেই উল্লেখ করেছি, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে– ভারত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে; যদিও ভারত এটা অস্বীকার করে। অন্যদিকে সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ভারতের অভিযোগ আছে। ফলে বেলুচিস্তানের সংঘাত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।

বেলুচ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের পাশাপাশি ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশেও বসবাস করে। পাকিস্তানে অস্থিরতা আরও বেড়ে গেলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ইরানেও পড়তে পারে। এ অবস্থায় ইরান সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

গোয়াদর বন্দর, রেকো ডিক খনি এবং অন্যান্য বড় প্রকল্পে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে। এতে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব বা অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং বেসামরিক হতাহত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বৃদ্ধি পায়, তবে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পাকিস্তানের ওপর আরও রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নও গুরুত্ব পাবে।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত; এর পশ্চিমে ইরান, উত্তরে আফগানিস্তান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। প্রদেশটিতে অবস্থিত গোয়াদর বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর একে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।

বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ শুধু পাকিস্তানের রাজনীতির বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য, চীনের আঞ্চলিক কৌশল, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, ইরানের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য আনা না যায়, তবে বেলুচিস্তান ভবিষ্যতেও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম অস্থিতিশীল কেন্দ্র হিসেবে থেকে যেতে পারে।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত