রংপুরে ডিজেল সংকটে বোরো চাষে বাড়ছে খরচ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রংপুর

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ০৬
রংপুরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে ডিজেলচালিত যন্ত্রে। সংগৃহীত ছবি

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষা এখন যেন স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায়। কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়া, সীমিত সরবরাহ এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের কারণে চাষাবাদে বাড়ছে খরচ। অনেক ক্ষেত্রে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধায়) এ বছর ৫ লাখ ৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে সেচের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ১ লাখ ৯১ হাজার ২৮৬টি নলকূপ। এর মধ্যে বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ ৩ হাজার ১৬৫টি, অগভীর নলকূপ ৯০ হাজার ২৭৮টি এবং এলএলপি ৪৮৫টি দিয়ে প্রায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজেলচালিত ৯৬ হাজার ৪১৯টি অগভীর নলকূপ ও ৬৬৬টি এলএলপি দিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমি।

মাঠপর্যায়ে অন্তত ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক একর জমিতে ১৫ থেকে ২০ বার সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল। এক হেক্টরে লাগে প্রায় ১৪৯ লিটার ডিজেল। সে হিসেবে প্রায় ১৫ হাজার টন ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

শুক্রবার রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের বালাবাড়ি এলাকায় হাড়িয়ারকুঠির কাশিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘তিনটা পাম্প ঘুরে দুই লিটার ডিজেল পেয়েছি। ২০০ টাকার তেল আনতে যাতায়াতে খরচ হয়েছে ১২০ টাকা। এই তেলে চার ঘণ্টাও মেশিন চলবে না।’

শুক্রবার রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে একই চিত্র দেখা গেছে। ২০ কিলোমিটার এলাকায় পাঁচটির মধ্যে চারটি স্টেশন বন্ধ পাওয়া গেছে। পাগলাপীর এলাকার একটি স্টেশনের ব্যবস্থাপক জানান, সকালে আনা ১ হাজার ৩০ লিটার ডিজেল প্রায় শেষ হয়ে গেছে। গ্রাহকদের দুই থেকে পাঁচ লিটার করে দেওয়া হচ্ছে।

রংপুর সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘দুই লিটারের বেশি ডিজেল দিচ্ছে না। প্রতি লিটার ১০০ টাকা হলেও আনতে অতিরিক্ত ৫০-১০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠানো কঠিন।’

কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এক একর জমিতে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার টাকা এবং প্রতি হেক্টরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ বাড়বে। এতে পুরো অঞ্চলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৯ কোটি ৬৯ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা।

হাজীরহাট এলাকার কৃষক সেকেন্দার আলী বলেন, ‘সময়মতো পানি না দিলে জমি ফেটে যাচ্ছে। আবার ডিজেল না থাকায় সেচও দেওয়া যাচ্ছে না। ফলন কমে যাওয়ার ভয় আছে।’

তবে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় যারা যুক্ত হয়েছেন, তারা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন। তারাগঞ্জের দোহাজারী গ্রামের কৃষক আবু তাহের বলেন, ‘দুই বছর ধরে সোলার সেচ দিচ্ছি। বিদ্যুৎ বা ডিজেলের চিন্তা নেই। খরচও কম।’

কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের কৃষিতে পড়েছে। এমনিতেই ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে ডিজেল সংকট উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্তমান আবহাওয়া বোরো চাষের জন্য অনুকূল রয়েছে। তাপমাত্রা ও মাটির আর্দ্রতা ভালো থাকায় সেচের প্রয়োজন কিছুটা কম। তিনি বলেন, ‘ডিজেল সংকট কিছুটা প্রভাব ফেললেও গুরুতর সমস্যা এখনো দেখা যায়নি।’

সম্পর্কিত